নির্বাচন ও জোটের খেলা: এনসিপির পরিণতি, নতুন বন্দোবস্তের ‘অপমৃত্যু’
মুক্তিযুদ্ধ শেষে প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয় ১৪-১৫ মাস পর। ১৯৯০–এর গণ–অভ্যুত্থান শেষে আরও কম সময়ের ভেতর নির্বাচন হয়। উভয় নির্বাচনে ভোটের আবহ আচ্ছন্ন ছিল যুদ্ধ ও সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রামের স্মৃতি ও প্রত্যয়ে।
এবার নির্বাচন হচ্ছে গণ–অভ্যুত্থানের প্রায় ১৮ মাস পর। সময়ের হিসাবে ব্যবধান অনেক বেশি নয়, কিন্তু নির্বাচনী আলাপ-আলোচনা-মতবিনিময়ে ‘৩৬ জুলাই’য়ের রক্তস্নাত প্রত্যাশাগুলোর উপস্থিতি ও প্রভাব বেশ কম। তবে নির্বাচনের আয়োজনে যুক্ত আছে গণভোটের অধ্যায়, সেটুকু যা ব্যতিক্রম।
মনোনয়ন বরাদ্দে তৃণমূলের কিছু বলার থাকল না
ভোট-উৎসবের অভিমুখে মনোনয়নপত্র জমাদানপর্ব ইতিমধ্যে পার হলো। কেবল এটুকুর জন্যও বাংলাদেশের মানুষ অনেক নম্বর পেতে পারে। দেশকে নির্বাচনী রোডম্যাপে টেনে আনতে মুখোশ পরা অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে বহু পরিশ্রম গেছে গত কয়েক মাসে।
নির্বাচন পেছাতে নিত্যনতুন অঘটন ঘটানো হয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার পাশের কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণস্থল থেকে পাওয়া আলামত জানাচ্ছে আরও কী কী ভয়ানক বাধা আসতে পারত নির্বাচনের পথে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য প্রার্থীরা জনতার দরবারে হাজির হতে পারলেন। তবে এবারও মনোনয়ন সংস্কৃতি পুরোনো ধাঁচেরই দেখা গেল। প্রত্যেক দলের কেন্দ্রীয় দু–একজন নেতা করপোরেট বসদের মতো নির্ধারণ করলেন কারা এমপি হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
বহুকাল ধরে দাবি ছিল, দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূল শাখা ও সেখানকার কর্মীদের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত গণ্য করা হোক। মনোনয়ন প্রক্রিয়াটা পদ্ধতিগতভাবে নিচ থেকে ওপরের দিকে আসুক। নির্বাচনী বিধিতেও এ রকম কথা আছে। কিন্তু সেসব বিধি কতটা অনুসরণ করা হলো? নাকি একধরনের পরোক্ষ প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতিতেই রয়ে গেল বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি?
কেবল মনোনয়ন নয়, জোট গঠন-ভাঙন-পুনর্গঠনেও দলগুলোর গুটিকয় নেতা ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো করে সিদ্ধান্ত নিলেন। ‘নতুন বন্দোবস্তে’র স্বপ্ন দেখানো এনসিপির বেলায় নাগরিক সমাজ দেখল খোদ তাদের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা বললেন, দল যে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীর ভিন্ন জোটে গেল, সেটা তাঁরা অবহিত ছিলেন না। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় পর্যায়েও অংশগ্রহণমূলক নয়, মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্তি দূরের বিষয়।
এ ক্ষেত্রে নতুন দলটি বিএনপি-আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের বাইরে যেতে পারেনি। এই দলের রাজনীতিতে যাঁরা নতুন ‘রিপাবলিকে’র বীজ দেখেছিলেন, দলটির জোট অদলবদলের খেলায় তাঁরা হয়তো আশাহত হয়ে থাকবেন। জোট থেকে জোটে আসা-যাওয়ার মাঝে ভাঙনের মুখেও পড়ল এই দল।
প্রচারণায় এনসিপিকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রকল্পের পক্ষেও বলতে হবে!
অনেক ভাষ্যকার বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে যাওয়া এনসিপির জন্য ছিল অনিবার্য পরিণতি। শুরু থেকে এনসিপির সংগঠকদের বড় একাংশের আদর্শিক পক্ষপাতে দক্ষিণপন্থী অভিমুখ স্পষ্ট ছিল। আবার জাতীয় জরুরি বিষয়গুলোতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতার দায়ভার পরোক্ষে তাদেরও ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
গত ১৭ মাসে সংস্কারের রাজনীতি এগিয়ে নিতে সরকারকে চাপে ফেলতে পারেনি এই দল। শ্রীলঙ্কা বা নেপালে গণ–অভ্যুত্থানকারীরা প্রতিনিয়ত জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠছে। এনসিপির বেলায় ঘটেছে উল্টো। নির্বাচন যত ঘনিয়েছে, তত দিশাহারা অবস্থায় পড়েছে তারা। ফলে দলটির নানা পরিসরের বন্ধু-পরামর্শকেরা শেষমেশ চেয়েছে এনসিপি নির্বাচন–পরবর্তী বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে অন্তত প্রাসঙ্গিক থাকুক।
অর্থাৎ রূঢ় এক বাস্তবতায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়াই নবীন দলটির জন্য ‘তুলনামূলকভাবে ভালো’ বিকল্প ছিল। যদিও এর নৈতিক সুবিধাভোগী হবে নিশ্চিতভাবে জামায়াত এবং এ নিয়ে এনসিপিতে যে দীর্ঘমেয়াদি কলহ চলবে, তা ‘লাল জুলাইয়ের’ শক্তি, গৌরব ও দাপট খাটো করতে থাকবে।
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এনসিপির জামায়াতভুক্তি নির্বাচনী প্রচারণা থেকে জুলাইকেন্দ্রিক নীতিগত প্রসঙ্গগুলো বাড়তি দ্রুততায় উধাও করে দিল। এখন থেকে প্রচারকালে আমরা কেবল বিএনপি বনাম জামায়াতের পুরোনো দিনের নানা কাজিয়া ও ব্যক্তিগত ইমেজের বড়াই ও বিসম্বাদ দেখব।
জোটের শর্ত হিসেবে, নিজেদের কোটার ৩০ আসনের বাইরে জোটের অন্য বাকি ২৭০ আসনে এনসিপির কর্মী-সমর্থকদের ধর্মতান্ত্রিক এক রাষ্ট্রপ্রকল্পের পক্ষে দাঁড়াতে হবে পুরো নির্বাচন মৌসুমে। কিন্তু তাদের এতদিনকার মধ্যপন্থী ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে’র লক্ষ্যের সঙ্গে মাওলানা মওদুদির রাষ্ট্রকল্পনা কি আদৌ মিলবে?