রাজনৈতিক বাস্তবতা নিজেকে প্রমাণের সুযোগ এনে দিয়েছে তারেক রহমানকে
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ঘটনা। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার পর দেশের রাজনীতিতে তিনি এমন এক সময় ফিরে এসেছেন যখন দেশ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আস্থাহীনতা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংকট অতিক্রম করছে। এ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার ঘরে ফেরা নয়; দেশের রাজনৈতিক ধারায় নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ। ব্যক্তি তারেক রহমানের ঢালাও স্তুতি না করে তিনি কীভাবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে নিজেকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারেন—সে বিষয়ে আলাপ এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
নির্বাসিত রাজনীতিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আমাদের দেশে নতুন নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, নেতার প্রত্যাবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নিজের বা দেশের জন্য চূড়ান্ত সফলতা বয়ে আনে না। প্রত্যাবর্তনের পর নেতৃত্ব কীভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন, বা কোন পথে দেশকে এগিয়ে নিতে চান, সেটিই মূল বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করলে প্রত্যাশা, সে যত আকাশচুম্বীই হোক, খুব দ্রুতই হতাশায় রূপ নিতে বাধ্য। এর আগে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এবং পরে তার কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু, তাদের প্রত্যাবর্তন দেশ ও জাতির স্বার্থে শেষ বিচারে কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার অবকাশ রাখে।
পলাতক শেখ হাসিনার নিকট অতীতের শাসনামল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব তাকে আত্মতুষ্ট ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল। নির্বাচন ব্যবস্থাকে কার্যত অর্থহীন করে ফেলা, বিরোধী মত দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বিচার ব্যবহার, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাকে দলীয় স্বার্থে নিয়োজিত করা–এসব ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাকেই ভোগ করতে হয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে তিনি যে শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, তা জনগণের আস্থা নয়, বরং ভয় ও দমননীতির ওপর দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, জোরজবরদস্তিতে কিছুটা প্রলম্বিত করা গেলেও এ ধরনের শাসনব্যবস্থা টেকসই হয় না। এ বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই এখন নতুন নেতৃত্ব, তিনি যে দলেরই হন, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ক্ষমতা কখনোই নিজের বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতা জনগণের দেওয়া একটি অস্থায়ী দায়িত্ব–এ কথা ভুলে গেলেই শুরু হয় পতনের পথচলা।
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত–এ প্রশ্নে এখনই গভীর চিন্তাভাবনা শুরু করা জরুরি। আবেগনির্ভর বা একতরফা নির্ভরশীল সম্পর্ক কখনোই বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব জরুরি, কিন্তু সে বন্ধুত্ব হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। শক্তিশালী প্রতিবেশীর সমর্থনের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার ধারণা যে কতটা ভ্রান্ত, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক ইতিহাসেই স্পষ্ট। শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতের প্রতি নির্ভরশীলতা যে কিছুটা হলেও কমানো যায়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। আন্তরিকতা থাকলে একটি নির্বাচিত সরকার সে ধারা অব্যাহত রাখতে পারে।
রাজনীতিতে আস্থা পুনর্গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো অতীতের ভুল স্বীকার করা। অতীতে যেসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব বিষয়ে জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমা চাওয়া মানে নিজেকে ছোট করা নয়; বরং এটি জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি শক্তিশালী উপায়। যে নেতৃত্ব নিজের ভুল স্বীকার করতে জানে, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাকেই বিশ্বাস করতে শেখে। অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তারেক রহমান কোনপ্রকার ভুলভ্রান্তি করে থাকলে তা স্বীকার করে নিয়ে দেশের উন্নয়নে নিজেকে আরো আন্তরিকভাবে নিয়োজিত করার প্রত্যয়জ্ঞাপন করলে তা দেশের আপামর জনসাধারণ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই নেবেন বলে প্রতীয়মান হয়।
তারেক রহমানের যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা এ প্রেক্ষাপটে একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তার নির্বাসন কোন তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশে না হয়ে পৃথিবীর উন্নতদেশগুলোর একটিতে হওয়ায় তিনি যুক্তরাজ্যের মতো একটি উন্নতদেশের সমাজব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব প্রয়োগ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ; ক্ষমতার চেয়ে আইন বড়; জবাবদিহিতা রয়েছে সরকারের সর্বস্তরে; আর, সুশাসনের মূল ভিত্তিই হলো জবাবদিহিতা। এই অভিজ্ঞতা যদি তিনি কেবল বক্তৃতা বা রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রয়োগ করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালান, তবে তা দেশ পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। তবে এখানে অন্ধ অনুকরণের নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত প্রয়োগ–বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই প্রয়োগ নিয়ে ভাবতে হবে। যেমন, কেউ যদি টরন্টো শহরে কয়েকদিন কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে দাবি তোলে, ঢাকা শহরকে রাতারাতি টরন্টো বানিয়ে দিন, তবে তা হবে অলীক কল্পনা ও হাস্যকর। কারণ, এত বিশাল পরিবর্তন স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়।