বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন বহুমুখী অনিশ্চয়তার এক গুরুতর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, জোট গঠনের সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং ডিপ স্টেট বা অভ্যন্তরীণ শক্তির কৌশল মিলিয়ে যে পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত জটিল এবং উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন স্তরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আগামী জাতীয় নির্বাচন। কোন দল কতটা প্রভাবশালী হবে, কোন শক্তি জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে এবং নির্বাচনি অঙ্কে কোন কৌশল কাজে লাগবে—এসবই এখন আলোচনার মূল প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সাধারণ ভোটার এবং দেশি-বিদেশি নানান গোষ্ঠী ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিত্র নিয়ে বহুবিধ পূর্বানুমান তুলে ধরছে।
চলমান রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান ফোকাস হয়ে উঠেছে তিনটি রাজনৈতিক দল—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। বিশেষত নিরপেক্ষ নির্বাচনে কোন দল কতটা লাভবান হতে পারে এবং প্রতিযোগিতাহীন বা কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে কারা সুবিধা পেতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষণের ভিন্নতা থাকলেও আলোচনা আরও তীব্র হচ্ছে। এনসিপি তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় তাদের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক সম্পর্কে এখনো সুসংহত বা বিস্তৃত বিশ্লেষণের পর্যাপ্ত ভিত্তি তৈরি হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে ধারণা করা হয় যে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে তাদের দীর্ঘদিনের সংগঠন এবং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাবের কারণে নিরপেক্ষ পরিবেশে তারা প্রায় কিছু আসন পেতে পারে। যদিও পূর্বাভাস নিয়ে দ্বিধা ও বিতর্ক বিদ্যমান।
আসলে জামায়াতে ইসলামীর সার্বিক জনসমর্থন কতটা বিস্তৃত অথবা তাদের পক্ষে ভোট প্রবাহ কতটা স্থিতিশীল, ওই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। তাছাড়া জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক মহলে তাদের ভাবমূর্তি এবং দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচনি বিশ্লেষণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ফল শুধু ভোটের ওপর নির্ভর করে না; বরং জোট গঠন, প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার কৌশল, মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং দলের মধ্যে সমন্বয়ের মতো নানা উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জামায়াত বা অন্য কোনো দল ঠিক কয়টি আসন পেতে পারে তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। প্রতিযোগিতাহীন বা অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কিত নির্বাচন হলে এই হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় সম্প্রতি একটি ভিন্ন মাত্রার আলোচনাও গুরুত্ব পেয়েছে, যা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে যে, কিছু বিদেশি শক্তি নাকি ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের ক্ষমতার বিন্যাসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। একটি রাজনৈতিক দলের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জড়িত কিছু সূত্রের দাবি, কিছু আন্তর্জাতিক পক্ষ বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি অংশকে তুলনামূলক সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যতে তাদের ক্ষমতায় দেখার আগ্রহও প্রকাশ করছে। অনেকেই এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। যদিও এসব দাবির পক্ষে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। দায়িত্বশীল বর্ণনার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ এবং নির্ধারক প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক আগ্রহের বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনার প্রবাহে এসব গুজব পুরোপুরি নাকচ করার সুযোগও থাকে না। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে বিদেশি স্বার্থ ও প্রভাব নিয়ে নানা জল্পনা সৃষ্টি হয়। যদি সত্যিই কোনো বিদেশি শক্তি তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণের জন্য বাংলাদেশের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রবাহকে সমর্থন করে, তবে তা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে, বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শক্তি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, যদিও প্রতিটি দেশের প্রেক্ষাপট আলাদা।
এই প্রসঙ্গে মূল প্রশ্ন হলো, যদি জামায়াতে ইসলামী কোনোভাবে, সে হোক নিরপেক্ষ বা বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে, সরকার গঠন করতে পারে অথবা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রভাব বিস্তার করার অবস্থানে পৌঁছায়, তাহলে দেশের সামগ্রিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ঠিক কোন দিকে রূপান্তরিত হতে পারে? এক্ষেত্রে যেসব বিদেশি শক্তি ইসলামপন্থী রাজনীতিকে সম্মান বা সমীহের সঙ্গে বিবেচনা করে এগোতে পারে, তারাই পরবর্তীকালে ধর্মীয় উগ্রবাদের সম্ভাব্য উত্থানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী যে সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক মনোভাব অনুসরণ করে, তা থেকে ধারণা করা হয় যে দলটি ক্ষমতায় এলে শাসনব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদী ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতা দেখা দিতে পারে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের অনেকে মনে করেন, এতে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার পরিসর সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ওই অস্থিরতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে যদি সম্ভাব্য স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তাহলে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েমের কারণে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দ্রুত রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের কিছু নেতা তাদের বক্তব্যে কখনো নমনীয় আবার কখনো উগ্র স্বর তুলে ধরায় মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যে দোদুল্যমানতা তৈরি হয়েছে। বিশেষত চট্টগ্রামের শাহজাহান চৌধুরীসহ বেশ কিছু নেতার ধারাবাহিক মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে, যেখানে ধর্মীয় আবেগ, আগ্রাসী ভঙ্গি এবং তীব্র রাজনৈতিক ভাষা একইসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং বিদেশি প্রভাব নিয়ে যে জটিল রাজনৈতিক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিএনপির অবস্থানও নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষত যখন সম্ভাব্য নির্বাচনি প্রেক্ষাপট অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ, বিদেশি শক্তির ভূমিকাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তীব্র এবং কোনো একটি দলের কৃত্রিম উত্থান বা প্রভাবশালী ভূমিকার সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে তখন বিএনপির ভবিষ্যৎ কৌশল জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপি একটি জটিল দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও কৌশলগত বাধা, অন্যদিকে বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা ও নজরদারি দলটির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দলটিকে প্রতিপক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নানাবিধ অনানুষ্ঠানিক প্রভাবের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। তবুও দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী এখনো বিএনপিকে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর, সক্ষম এবং বাস্তবসম্মত বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখে, যা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বর্তমান জটিল বাস্তবতায় বিএনপির প্রধান প্রয়োজন হলো দলকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠিত ও সক্রিয় রাখা। সাংগঠনিক সমন্বয়, নেতৃত্ব পুনর্গঠন, তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন–এসব বিষয় এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যদি নির্বাচনি পরিবেশ অনিশ্চিত থাকে বা কোনো দলকে কৌশলগতভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা হয়, তাহলে বিএনপিকে আরও সুসংহত ও দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোটের প্রশ্ন। বর্তমান পরিস্থিতিতে একক শক্তির পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে একই সময়ে বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে যে বিতর্ক, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে, তার কারণে বিএনপির উচিত হবে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা যাতে দলটির স্বকীয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং মধ্যপন্থী ভোটারদের আস্থা অক্ষুণ্ণ থাকে।