‘উন্নতি করিয়া কি হইবে যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে’
অর্থনৈতিক সুবিধার্থে অভ্যন্তরীণ অভিপ্রয়াণ (Internal Migration) অতি পুরনো এক পদ্ধতি। কত পুরনো তা হয়তো বলা যাবে না তবে প্রায় একশ বছর আগে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত 'পথের পাঁচালী উপন্যাস - যা সত্যজিৎ রায় কর্তৃক ১৯৫৫ সালে চিত্রায়িত - কিঞ্চিত ধারণা দেয় বলে বিশ্বাস।
অধিক উপার্জনের আশায়, তথা একটা ভালো জীবনের স্বপ্ন সাধনে, পুরোহিত হরিহর রায় গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়। পেছনে পড়ে থাকে সহধর্মিণী সর্বজয়া, মেয়ে দুর্গা আর ছেলে অপুকে নিয়ে তার প্রাণপ্রিয় পরিবার। বাড়ি ছাড়ার আগে কথা দেয় হরিহর, ফিরে এসে জীর্ণ ঘর মেরামত করবে। একদিন সে এসেছিল বটে, তবে শহর থেকে সংগে আনা সখের জিনিস দেখাতে গিয়ে শুনতে পায় যে তাদের মেয়ে দুর্গা প্রচণ্ড জরে মারা গেছে । এবার কন্যা হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে অর্থনৈতিক দইন্যতা দূর করতে পৈতৃক ভিটা ফেলে পরিবার সহ গোরুর গাড়িতে করে শহরমুখী হয় হরিহর।
আচ্ছা, ওই সময়ে নিসছিন্দ্রপুর গ্রামে যদি খামার- বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বর্ধনশীল উপার্জনের ব্যবস্থা থাকতো , তা হলে কি হরিহর গ্রাম ছেড়ে শহরে যেত?
দুই.
এমন একটা প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়াস নিয়েছেন বাংলাদেশে ইন্সিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) -এর কাজী ইকবাল, নাহিদ ফেরদউস পাবন, রেজয়ানুল হক এবং নাহিয়ান আজাদ সসি। সম্প্রতি তাঁরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অভিপ্রায়ণের (এখন থেকে অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেসন) উপর চিন্তাউদ্দীপক নীতি -সংক্রান্ত এক প্রবন্ধ পেশ করে ওই প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন । মহাপরিচালক বিনায়ক সেনের সঞ্চালনায় পরিচালিত সেমিনারের শিরোনাম ছিল “স্থানীয় খামার -বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং অভিপ্রয়াণ সিদ্ধান্ত : বাংলাদেশের লক্ষণ।”
অন্যকথায়, স্থানীয়ভাবে সংগঠিত এসমস্ত কর্মকাণ্ডের বিস্তার ব্যক্তি এবং খানার অভ্যন্তরীণ- অভিপ্রয়াণ সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে কি না এবং করে থাকলে নীতিমালা সংক্রান্ত পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা আবর্তিত হয়েছে। অতীতে এধরনের আলোচনা যে একেবারে হয়নি তা বলা যাবে না তবে নিতান্তই এনেকডটাল বা কেস –স্টাডি ভিত্তিক পর্যালোচনা। রোবাস্ট ইকোনোমেট্রিক টুলস ব্যবহার করে চোখ ধাঁধানো (এবং চুল পাকানো ) কার্যকারণ সম্বন্ধীয় আলোচনা আলোতে তেমন একটা এসেছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না।
তিন.
সেই স্বাধীনতার শুরু থেকে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেসন যে বাড়ছে তার প্রমাণ দিতে বোধ করি পরিসংখ্যানের প্রয়োজন পড়ে না। শহরগুলুতে স্ফীত জনসংখ্যা, গিঞ্জি গলিতে মানুষের স্রোত, গ্রামে আধুনিক যন্ত্রে চাষবাস, ঈদ বা লকডাউনে জীবন বাজি রেখে বাড়ি ফেরার তাগিদ ইত্যাদি ইঙ্গিতবাহক বলে মনে করা যায়। তারপরও পরিশুদ্ধ অর্থনীতিবিদ পাঠকের পরিতৃপ্তির জন্য ২০০৩ সালে প্রকাশিত বিআইডিএস এর রীতা আফসারের প্রবন্ধ থেকে বলা যায়, মোট মাইগ্রেসনের দুই– তৃতীয়াংশ গ্রাম থেকে শহরে, এক- দশমাংশ গ্রাম থেকে গ্রামে এবং এক- চতুর্থাংশ দেশের বাইরে অভিবাসিত। আরও জানা যায়, ১৯৭৪ থেকে অদ্যাবধি লাইফটাইম মাইগ্রেসনের তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটেছে।
অন্যদিকে, পল্লীর অবকাঠামো উন্নয়ন সাপেক্ষে অ–কৃষি কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনে তার প্রভাব অপরিমেয়। বস্তুত এখন গ্রামীণ খানার সিংহভাগ আয় আসে অ-কৃষি তথা খামার– বহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে যা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, কৃষির চেয়ে অধিকতর উৎপাদনশীলতা ও আয় সঞ্চারক। যেমনটি আগে ভাবা হতো, এ ধরনের কাজ আর রেসিডুয়াল প্রকৃতির নয়, নয় পেশাগত শেষ আশ্রয়স্থল।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উপার্জন
- আর্থিক ব্যবস্থাপনা