
হামলার শিকার নুর: সংকুচিত গণতন্ত্র ও জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর সংঘটিত হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ এবং শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এই হামলায় গণঅধিকার পরিষদের আরও অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে দলটি দাবি করেছে। সংখ্যা যােই হোক, এটি শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যক্তি বা একটি দলের ওপর আঘাত নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক নির্লজ্জ আক্রমণ। ১৫ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, যাতে আওয়ামী লীগ ও তাদের মদদদাতা কয়েকটি দল ব্যতীত প্রায় সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে, সেখানে অনেক দাবির একটি ছিল ফ্রিডম অফ অ্যাসেম্বলি বা সমাবেশের স্বাধীনতার অধিকার। এই ঘটনাটি দেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিসরের ক্রমাগত সংকোচন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মাত্রা এবং আইনের শাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবমাননার স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় হামলার শিকার হন অনেকেই। ২৯ অগাস্ট সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে এই সংঘর্ষ ঘটে। গণঅধিকার পরিষদের অভিযোগ, তারা মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় জাতীয় পার্টির লোকেরাই ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে উসকানি দেয়। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির দাবি, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এরপরও বিজয়নগরে গণঅধিকার পরিষদের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদের ওপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করে, যার ফলে নুরুল হক নুর রক্তাক্ত হন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। সর্বশেষ খবর বলছে, যৌথবাহিনীর লাঠিপেটায় আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের জ্ঞান ফিরেছে। নুরের মাথায় আঘাত রয়েছে। তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে; যে কারণে অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছিল। তার রক্তক্ষরণ আগেই বন্ধ হয়েছে এবং জ্ঞানও ফিরে এসেছে। তবে নুর আশঙ্কামুক্ত হয়েছেন এমনটা এখনই বলা সম্ভব নয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে যে, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর্যুপরি আঘাতে নুর রক্তাক্ত হয়েছেন। অবশ্য ‘মব ভায়োলেন্স’ থামাতে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়েছে সেনাবাহিনী— এমনটাই বলছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর। তাদের দাবি, পুলিশ ‘সহযোগিতা’চাওয়ায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষের ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা সম্পৃক্ত হন এবং ‘শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা অগ্রাহ্য’ হওয়ার পর বলপ্রয়োগে বাধ্য হন।
সামরিক বাহিনী এখনো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে রাজপথে অবস্থান করছে, যার মাধ্যমে তারা সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার বৈধতা পেয়েছে। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের সমাবেশের অধিকার রক্ষার জন্য, নাকি দমন করার জন্য বাহিনী মোতায়েন করেছে? আন্তর্জাতিক আইন (জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (ICCPR), আর্টিকেল ২১) ও বাংলাদেশের সংবিধান দুটোই পরিষ্কারভাবে বলে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, দমন করা নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটিকে ‘জুলাই বিপ্লবের গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর আঘাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সরকার এই ঘটনার ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বলেছে যে, কোনো ব্যক্তি, পদ বা প্রভাব নির্বিশেষে জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে’। তবে যখন দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণে একের পর জনগণের কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে, তখন সরকারি বিবৃতি কেবল প্রথাগত দায়সারা প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হয়।
নুরের আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলটির (জাতীয় পার্টি) ভূমিকা বরাবরই বিতর্কিত। এরশাদের সামরিক শাসনকালে জন্মলগ্ন থেকে বিতর্ক জাতীয় পার্টি পিছু ছাড়েনি। সবশেষে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বরাবরই জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতাসীন দলের ‘সহযোগী’ বা ‘বি-টিম’ হিসেবে দেখা গেছে। কয়েক দশক ধরে তারা কখনো শাসকের দোসর, কখনো বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে আসলে কর্তৃত্ববাদী শাসনকেই টিকিয়ে রেখেছে। এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগের বছর ২০২৩ সালে ভারত সফর শেষে প্রকাশ্যে বলেন, “কী আলোচনা হয়েছে, ভারতের অনুমতি ছাড়া বলতে পারব না।” এটি কেবল জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই নয়, বরং বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনির্ভর রাজনীতিরও নগ্ন প্রকাশ।