
খাদ্য নিরাপত্তার খুঁটিনাটি
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আমরা বুঝি সব সময়ে সব মানুষের স্বাস্থ্যসম্মত এবং উৎপাদনশীল জীবনের জন্য যথেষ্ট খাবারের লভ্যতা। খাদ্য নিরাপত্তার একটি দরকারি উপাদান হচ্ছে জাতীয় এবং খানা স্তরে পর্যাপ্ত খাদ্যের সরবরাহ। অন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হলো জাতীয় এবং খানা স্তরে এই পর্যাপ্ত খাবারে প্রবেশগম্যতা বা অ্যাকসেস—অমর্ত্য সেনের ভাষায় ‘এনটাইটেলমেন্ট’। তবে প্রাপ্যতা এবং প্রবেশগম্যতা একটি স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য দরকারি, কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়।
সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তার নিরিখে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে খাদ্যের কার্যকর ব্যবহার, যা কিনা অনেক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল; যেমন—চিকিৎস, পয়োনিষ্কাশন, পরিবেশ এবং সমাজের ঝুঁকিগ্রস্ত শ্রেণির পরিচর্যায় খানা বা সরকারের সামর্থ্য।
জাতীয় পর্যায়ে খাবার আসে তিনটি উৎস থেকে; যথা—অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সরকারি ও বেসরকারি খাদ্য মজুদ, খাদ্য আমদানিসহ খাদ্য সাহায্য এবং খাদ্য রপ্তানি। বাণিজ্য উদারীকরণের যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের প্রবাহ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ামক হয়ে ওঠে। খানা পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে নিজস্ব উৎপাদন, খানার খাদ্য মজুদ এবং স্থানীয় বাজারে খাদ্যের জোগান, যার অনুঘটক হিসেবে আছে বাজার ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে মৌসুমি ওঠানামা ইত্যাদি বিষয়।
বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি দেশের ফুড অ্যাকসেস বা ফুড এনটাইটেলমেন্ট নির্ভর করে রপ্তানি আয়, বিশ্ববাজারে দাম এবং ঋণ-সেবার ওপর। খানার অ্যাকসেস আসে খাদ্যের দাম, খানার আয় এবং সম্পদ-ভিতের ওপর। বর্ধিত আয় খানার অ্যাকসেস বৃদ্ধি করে এবং সম্পদ-ভিত যদি শক্ত থাকে, তখন স্বল্পকালীন ধাক্কায় খানার খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় না। কারণ সম্পদের একটি অংশ বিক্রি করে খাদ্যপ্রবাহ অটুট রাখা যায়।
দারিদ্র্য হচ্ছে চরম খাদ্য নিরাপত্তার অভাবের নমুনা। কারণ দরিদ্র তার আয় দিয়ে খাদ্যে অ্যাকসেস পায় না, এমনকি যখন স্থানীয় বাজারে চালের অভাব থাকে না, তখনো। তা ছাড়া দরিদ্র সব সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শস্যহানির আঘাতে ঝুঁকিগ্রস্ত হয়ে সাময়িক খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হয়। এবং সব শেষে খাদ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম প্রকৃত আয় হ্রাস করে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘটায়। শরীরে খাদ্যের ভূমিকা খাদ্য নিরাপত্তার অন্য এক অঙ্গ।
এর সঙ্গে পুষ্টির গভীর সম্পর্ক আছে। খাদ্যের জোগান এবং খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা উন্নত হলে বুভুক্ষা বা ক্ষুধা কমতে পারে, কিন্তু অপুষ্টি না-ও কমতে পারে। কারণ এই দুটি উপাদান উন্নীত হলেও পুষ্টির উন্নয়নে বাধা হতে পারে খাদ্যবহির্ভূত কিছু অনুঘটকের কারণে। যেমন—স্বাস্থ্য পরিচর্যা সুযোগের মান, বিশেষত মায়ের শিক্ষা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি প্রভৃতি।
এবার খাদ্য নিরাপত্তার ওই তিন স্তম্ভের ভিত্তিতে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জনিত কৃতিত্ব যাচাই করা যেতে পারে। প্রথমত, কৃষিজমির নিম্নমুখিতার মুখেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মারফত খাদ্য জোগানে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে রয়েছে। সার্বিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে অধিকতর হওয়ার সুবাদে সময়ের আবর্তনে মাথাপিছু খাদ্যলভ্যতা উঁচুতে অবস্থান করছে। উদাহরণস্বরূপ, সত্তরের দশকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। এখন ১৭ কোটি মানুষ নিয়ে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতার কাছাকাছি বাংলাদেশ—গেল পাঁচ দশকে চার গুণ বৃদ্ধি। মূলত ‘সবুজ বিপ্লবের’ কল্যাণে ‘অঘটনঘটনপটীয়সী’ বাংলাদেশ। তবে সরকারি নীতিমালার ইতিবাচক পরিবর্তন প্রশংসার দাবি রাখে। যা হোক, মোট কৃষি উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ অবদান আসে চাল উৎপাদন থেকে। এখন চাল উৎপাদন প্রায় চার কোটি টন। তবে ঘাটতি আছে গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, ডাল, তেলবীজ উৎপাদনে যা আমদানি করে মেটানো হয়। মাঝেমধ্যে চালও আমদানি করা হয়, বৈরী বছর হলে। নিয়মিত এবং প্রচুর আমদানি করতে হয় সয়াবিন ও পাম তেল এবং গুঁড়া দুধ।
খাদ্যলভ্যতার উন্নতি ছাড়াও খাদ্যে প্রবেশগম্যতা বা অ্যাকসেসের ক্ষেত্রে উন্নতি লক্ষণীয়। বিশেষত ২০১৫-১৬ ও ২০২১-২২ নাগাদ প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি সাড়ে ছয় শতাংশ, দারিদ্র্য হ্রাস ২৪ থেকে ১৯ শতাংশ এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ১ শতাংশের বিপরীতে মাথাপিছু আয় প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি এনটাইটেলমেন্ট/অ্যাকসেস বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে, যেমন রেখেছে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি। তবে করোনা এবং পরবর্তী সময়ে উঁচু মূল্যস্ফীতি স্বস্তি ছিনিয়ে নিলে খাদ্যে অ্যাকসেস বড় ধাক্কা খায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের খানায়। তার পরও শত সীমাবদ্ধতা নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাঁচোয়া।
- ট্যাগ:
- মতামত
- খাদ্য নিরাপত্তা