ভাষারা মরে যায় কেন?
তুষারাবৃত এক দুপুরে আমাদের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক গেওর্গি পাভলোভিচ নেমেৎস উচ্চারন করেছিলেন দীর্ঘশ্বাসে ভরা একটি বাক্য। সেটা ছিল ১৯৮৮ সাল। সাইবেরিয়ার কোনো এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সম্পর্কে কথা বলছিলেন তিনি। বলছিলেন, মাত্র তিনজন ৯০ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষ এখন সেই ভাষায় কথা বলেন। আর কেউ নেই, যাঁরা ধরে রাখতে পারবেন ভাষাটি। ভাষাটি মৌখিক, তাই লিখিতভাবে এটাকে রেখে দেওয়া যাবে, এই ভাবনা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।
ভাষাপ্রেমী গেওর্গি পাভলোভিচের কথায় দীর্ঘশ্বাস ছিল। ভাষার মরে যাওয়া নিয়ে ভাবনা ছিল। কী করে ভাষা রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেন তিনি। পৃথিবীর সাত হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষা যে ঝুঁকির মধ্যে আছে এখন, সে কথা কে না জানে!
আমাদের এই ভূখণ্ডে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, সেটি ছিল নিজ ভাষার প্রতি অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। নিজ ভাষার অধিকার আদায় করতে গিয়ে অন্যকে ছোট করার কোনো ভাবনা সেই আন্দোলনে ছিল না। ভাষা প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সংস্কৃতি-ঐতিহ্যসহ জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে স্বচ্ছতা আনার একটা বড় সদিচ্ছা পরিলক্ষিত হয়েছিল পরবর্তী সময়ে। তাই, কোনো ভাষা যেন কোনো ভাষার কাঁধে চড়ে ছড়ি ঘোরাতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা দরকার ছিল। যে ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা পরিচর্যার অভাবে মরে যেতে পারে, তাদের ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু যখন ভাষা নিয়ে কথা বলা হয়, তখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের ভাষাকে অন্যের ভাষার চেয়ে বড় কিংবা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার একটা নিষ্ঠুর ও অবিবেচক পথে হাঁটতে দেখা যায় অনেককেই। ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পড়তে গিয়ে এই প্রশ্নটি নিয়ে একসময় নাড়াচাড়া করেছিলাম। কিছু ব্যাপার রয়েছে যেগুলো এখনো খুবই জরুরি। সে বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা কথা বলা হলে কোনো গবেষক কিংবা নীতিনির্ধারক আমাদের এখানে কীভাবে ভাষা বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা ঠিক করতে পারবেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলা ভাষা
- মাতৃভাষা
- ভাষা আন্দোলন