পথচারী বিশ্বজিৎ দাসকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ফাইল ছবি
বিশ্বজিৎ হত্যার সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০১৭, ১৯:০৩
(প্রিয়.কম) দেশের বহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষক কিংবা অভিজিতের পরিবারও ওই দুটি বিষয় নিয়ে ‘হতাশ প্রতিক্রিয়া’ ব্যক্ত করেছেন।
পুরান ঢাকায় দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আসামির মধ্যে রায়ে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আদালত। বিশ্বজিৎ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পাওয়া ৬ জনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ৬ আগস্ট দেওয়া রায়ে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে ঘটনা ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের অসামঞ্জস্য আছে কিনা, তা তদন্ত করে স্বাস্থ্য ও পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়।
এই দুই প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্বজিতের বাবা অনন্ত দাসও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন ২০১৩ সালে ঢাকায় করা এক সংবাদ সম্মেলনে। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের কারণে হত্যাকারীরা ছাড় পেতে পারেন এমন অভিযোগে সেসময় ওই দুই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ঘটনার ছবি ও ভিডিওচিত্রে ৮ থেকে ১০ জন লোক বিশ্বজিৎ দাসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছেন। কিন্তু সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে একটি আঘাতের কথা বলা হয়েছে। অথচ আদালতের কাছে সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান হয়েছে যে একাধিক ব্যক্তির একাধিক আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মী। এর ফলে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা অসদাচরণ কাজ করেছে কি না, তা খুবই জরুরি প্রশ্ন।
প্রতিবেদনে গাফিলতি থাকলে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের শাস্তি দাবি করে সাবেক আইজিপি ড. এম এনামুল হক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে ঘটনা, পুলিশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের সাথে ঘটনা ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের অসামঞ্জস্য উঠে এসেছে। এমন প্রতিবেদনে যদি ইচ্ছাকৃত ভুল করে থাকেন তাহলে অপকর্মের বিচার হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ভিডিওতে বিশ্বজিতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একটি আঘাতের কথা বলা হয়েছে। আবার পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনেও ত্রুটি রয়েছে। এমন অভিযোগ বিশ্বজিতের বাবাও করেছিলেন। তখনই উচিত ছিল দায়ী পুলিশ কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পরীক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে রায় দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের এই বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এমন মামলার ক্ষেত্রে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ক্রটিপূর্ণ হলে সেক্ষেত্রে হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের জন্য ন্যায়বিচার করা কঠিন হয়। এই ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ডিভিশনের অভিজিতের সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, স্বাক্ষ্য ও আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিচার প্রার্থীরা বিচার না পান, ন্যায় বিচার যদি নিশ্চিত না হয়; তাহলে বিচার প্রার্থীরা যেমন হতাশ তেমনি বিচার বিভাগের ওপরও মানুষের আস্থা কমবে।’
প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন এনামুল হকও। তিনি বলেন, ‘এই দুটি প্রতিবেদনের দুর্বলতার কারণে যদি কোনা অপরাধী পার পেয়ে যান তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ শুধু বিশ্বজিতের পরিবার নয়; সাধারণ মানুষও। তাদের বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানা হয়েছে এর মাধ্যমে। এরপর থেকে পুলিশ ও চিকিৎসকের প্রতি তাদের আস্থা কমে যাবে।’
শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘তবে একটা শেষ সুযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ যদি এই মামলাকে আপিল বিভাগে নিয়ে যায় তাহলে আপিল বিভাগ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই ন্যায় বিচারের প্রতিক্ষায় রইলাম।’
বিশ্বজিতের রায় ঘোষণার পর আইনজীবী মনজিল মোরশেদ একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় সর্বশেষ রায় নয়। তবে তদন্তে গাফিলতির কারণে বিচারে প্রভাব পড়েনি বলে মনে করেছেন আদালত, তাই আদালত রায় দিয়েছেন। যদি আদালত মনে করতেন গাফিলতি বা অবহেলার কারণে বিচারে প্রভাব পড়বে, তাহলে আদালত পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিতেন।’
উল্লেখ্য, বিএনপির-নেতৃত্বাধীন ১৮-দলের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন বিশ্বজিৎ দাস। তাকে নির্মমভাবে হত্যার দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
প্রিয় সংবাদ/রিমন