ওষুধের বাজারে নজরদারি না থাকায় বিভিন্ন সময় বেড়েছে দাম। ফলে চিকিৎসাব্যয় বাড়ছে রোগীর। ছবি: ম্যাগনিফিক

তিন দশক পেছনে ওষুধনীতি: রোগীর ওপর বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ

তানজিল রিমন
প্রিয় নিউজ
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩১
আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩১

সম্প্রতি ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ বাতিল করার সিদ্ধান্তে দেশের ওষুধ খাতের মূল্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রায় তিন দশক পেছনে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের নীতিমালায় ফিরে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে সরকারের এই সিদ্ধান্ত উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কাঠামোগত এই পরিবর্তনের ফলে দেশের সাধারণ মানুষ ও রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এখন সেই প্রশ্ন উঠেছে।

চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নতুন তালিকা ও নীতিমালা প্রণয়ন করে। এতে ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধ থেকে বাড়িয়ে ২৯৭টিতে উন্নীত করা হয়। তবে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি এই নীতিমালার বিরোধিতা করে আসছিল। শিল্প মালিকদের দাবি ছিল, অংশীজনদের সাথে যথাযথ আলোচনা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্তটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কেন বাতিল হলো নতুন নীতিমালা?

গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ২০২৬ সালের নীতিমালায় পদ্ধতিগত ও আইনি ত্রুটি ছিল।

‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী, দেশের যেকোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন বা ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চূড়ান্ত করার আগে ‘জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ’-এর পরামর্শ ও অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু নতুন নীতিমালায় তা করা হয়নি। ওই সময় বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

বিবৃতিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আরও জানায়, চলতি বছরের ২৯ জুন আইন অনুযায়ী নতুন করে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে এবং এই পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি বৈধ ও কার্যকর উপদেষ্টা পরিষদ থাকা অবস্থায় পূর্ববর্তী ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রণীত নীতিমালা বলবৎ রাখা প্রশাসনিকভাবে যৌক্তিক নয় বলেই তা বাতিল করা হয়েছে।

যদিও চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে, যা সকল অংশীজনের সাথে পরামর্শ করে। টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকা এবং নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে এবং এই ওষুধ বিক্রেতা সংস্থাগুলোকে নির্ধারিত দর মেনে চলতে হবে। 

কোম্পানিগুলোকে দাম সমন্বয় করার জন্য চার বছর সময়ও দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান।

কী ছিল ২০২৬ সালের বাতিল হওয়া নীতিমালায়?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বৈশ্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হলো সেসব চিকিৎসাসামগ্রী, যা কোনো দেশের অধিকাংশ মানুষের অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক চাহিদা পূরণ করে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সহজলভ্য থাকে। এর ওপর ভিত্তি করে ২০১৬ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির আলোকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২৯৭টি ওষুধের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বর্ধিত গেজেট প্রকাশ করেছিল।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে চিকিৎসাব্যয় আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ছবি: ম্যাগনিফিক

জনস্বার্থ রক্ষায় এই নীতিমালায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল। সেগুলো হলো- প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের মোট বার্ষিক বিক্রির অন্তত ২৫ শতাংশ আর্থিক মূল্যের সমপরিমাণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ২৫ শতাংশের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো ওষুধের অনুমোদনের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করার যোগ্যতা হারাবে। অত্যাবশ্যকীয় তালিকার বাইরের ওষুধের ক্ষেত্রে একই জেনেরিকের ওষুধের দামে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি পার্থক্য থাকতে পারবে না।

তিন দশক পুরোনো নীতিতে ফেরা: শঙ্কা কোথায়?

২০২৬ সালের নীতিমালা বাতিলের ফলে দেশের ওষুধ খাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ফিরে গেছে, যেখানে ওষুধের সংখ্যা মাত্র ১১৭টি। ফলে এর বাইরে বাজারে থাকা অন্যান্য হাজারও ব্র্যান্ডের ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কার্যত এখন আবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই চলে গেল।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালের এই তালিকার উপযোগিতা নিয়ে বিশ্লেষকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেননা গত তিন দশকে মানুষের রোগব্যাধির ধরনে পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৯৪ সালে সংক্রামক রোগগুলো প্রধান হুমকি থাকলেও বর্তমানে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বেড়েছে। পুরোনো তালিকায় এই জীবনরক্ষাকারী নতুন প্রজন্মের ওষুধগুলো অন্তর্ভুক্ত নেই।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ওষুধ বর্তমানে বেশিরভাগ কোম্পানি উৎপাদনই করে না। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করে মুনাফা না পাওয়ায় তারা কৌশলে এগুলো তৈরি বন্ধ করে দিয়েছে বা সামান্য পরিবর্তন করে নতুন নামে বাজারজাত করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে।

রোগীর পকেট কাটছে ওষুধের দাম: জনস্বাস্থ্য নাকি শিল্পের স্বার্থ?

২০২৩ সালের শেষে ও ২০২৪ সালের শুরুতে একাধিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওষুধের দাম ১০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে জনপ্রতি ১০০ টাকা খরচের মধ্যে প্রায় ৪৪ টাকাই ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে, যা বৈশ্বিক গড় (১৫ শতাংশ)-এর চেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।

২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ স্বাস্থ্যব্যয়ের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. এম মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে ‘চিকিৎসার কারণে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, প্রাথমিক চিকিৎসা বিনা খরচে নিশ্চিত করার সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের অভাবে সাধারণ মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে যেখানে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা আরও বাড়ানো দরকার ছিল, সেখানে নতুন তালিকা বাদ দিয়ে একদম ১৯৮৪ সালের নীতিমালায় যাও অযৌক্তিক। কারণ ওই সময়ের অনেক ওষুধই এখন আর ব্যবহৃত হয় না। আবার আধুনিকায়নের কারণে ওষুধ তৈরির খরচও কমেছে।’

অবশ্য বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেন এই সিদ্ধান্তকে ‘ইতিবাচক’ দাবি করে বলেছেন, এর ফলে গত প্রায় দুই বছর ধরে ওষুধ শিল্পে যে স্থবিরতা বিরাজ করছিল, তা কেটে গিয়ে বাজারে স্বস্তি ফিরবে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, পুরো কাঠামোটি বাতিল না করে অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যেত।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের নীতি তুলে দিলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু গত ২৯ জুন নতুন জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছে, তাই কালক্ষেপণ না করে বর্তমান সময়ের রোগব্যাধি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ প্রণয়ন করা জরুরি।