নিহত ফাগুন রেজা। ছবি: সংগৃহীত

হত্যাকাণ্ডের দু’মাস: ফাগুনের কাছে বাবার দ্বিতীয় চিঠি

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭
আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭

ফাগুন, ক্ষমা করিস বাবা। তোর কাছে ক্ষমা চেয়েই শুরু করছি। না বাবা হিসাবে, না একজন সাংবাদিক হিসাবে তোর জন্য কিছু করতে পেরেছি আমি। আজ দু’মাস হলো তুই নেই। তোকে আমার আর তোর মার বুক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুই চলে যাবার, তুই খুন হয়েছিস, তোকে হত্যা করা হয়েছে এ কথা বলতে মনে সায় দেয় নারে বাবা। কি করেছিলি তুই, আপোষ করিসনি অন্যায়ের সাথে, বাঁচতে চেয়েছিল সৎ ভাবে, মাথা উঁচু করে। কিন্তু সময়টা তো এমন বাঁচার জন্য নয়। এ সময়ে বাঁচতে হয় মাথা নিচু করে, আপোষ করে, অসৎ হয়ে।

সময়টাই এমন বাবা। এখন মৃত্যুর মহামারী। চারিদিকে হত্যাযজ্ঞ। প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন, গণপিটুনিতে মৃত্যু, কাটা মুন্ডু, মুন্ডুহীন লাশ, সব মিলিয়ে এক বীভৎস চিত্র চারিধার জুড়ে। যেন হরর ফিল্ম। তুই তো হরর ফিল্ম দেখে হাসতি। কিন্তু বাবা, একজন মা নিজের বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে যখন ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা যান, তখন আর বিষয়টি হাসির থাকে না। যখন ব্যাগের মধ্যে পাওয়া যায় নিষ্পাপ বাচ্চার কাটা মুন্ডু, তখনও বিষয়টি হাসিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাবা, সেলুলয়েডের পর্দায় চলা নয়, বাস্তবে দেখা রিয়েল ফিল্ম এসব। এখনকার জীবন চিত্র।

তুই যাবার দুই মাসের মাঝে সময় আরো বদলে গেছেরে বাবা। রিফাত নামে একটি ছেলেকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি। তোকেও তো কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। আমাদের দেশের মানুষগুলো বোধহয় ক্রমেই পশু হয়ে যাচ্ছে। হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। যেন মৃত্যু তাদের এক ধরনের বিকৃত আনন্দ দেয়। তা না হলে এমন মৃত্যুকে রুখে দেয় না কেন তারা। উল্টো দোষী করা হয় মৃতদেরই। যেমন রিফাত। সে কেন এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করলো তাইতো তাকে মরতে হলো। কি আজব কথা, তাই নারে। তুই থাকলেতো রেগে যেতি। লিখতে চাইতি হাত খুলে। আর তোর হাত খুললেতো কি হয়, সেটাতো প্রান্তর মৃত্যু নিয়ে করা তোর খবর দিয়েই বুঝে গিয়েছিল সবাই। অনেক বড় রিপোর্টারেরই ‘ইয়ে’ খুলে দিয়েছিলি তুই।

বাবা, প্রতিরাতে ভাবি। এই যে তুই নেই, এটা বোধহয় স্বপ্নদৃশ্য। ঘুম ভাঙলেই আবার সব ঠিক। আচ্ছা বাবা, মাত্র দু’মাসে পরিবেশ-পরিস্থিত এতটা বদলে যাবে তা কি তুই বুঝতে পেরেছিলি? তুই তো এমন একটা দেশ চাইতি, যেখানের মূল আদর্শই হবে সততা। যেখানে মানুষ অসৎ হবে না, দেশ পড়বে না দুষ্টচক্রের হাতে। অথচ তুই চলে যাবার পর থেকেই দ্রুত বদলাতে লাগলো সময়। এখন এই দেশ গুজবের দেশ। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা চায়। এমন গুজবে গণপিটুনিতে মারা যায় তরুণী থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়ে যায় হোয়াইট হাউসের সীমানায়।

সরল বিশ্বাসে কৃতকর্মের নামে দুর্নীতির আরেক প্রজাতির বৃক্ষ রোপিত হয়। সুইস ব্যাংকগুলোতে ক্রমেই টাকা বাড়ে দেশের কিছু মানুষের। অন্যদিকে প্রায় দু’কোটি লোক কষ্ট পায় খাবারের অভাবে, এমন পরিসংখ্যান উঠে আসে গণমাধ্যমের পাতায়। একদিকে বাড়ে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজের সংখ্যা, অন্যদিকে প্রতিদিন সড়কে প্রাণ যায় অসংখ্য আদম সন্তানের। রেলসড়কও এর বাইরে নয়। তোকে যে সড়কের পাশে পাওয়া গিয়েছিল, মৃত। এই দেশটাও বাবা ক্রমেই মৃতদের দেশে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবাদহীন, প্রতিরোধহীন মৃত মানুষের দেশে। উচ্চ আদালতও আশ্চর্য হয় প্রতিবাদহীনতায়।

ফাগুন বাবা, রাত জেগে লিখি। তুইতো নেই, আমার লেখার খেই ধরিয়ে দেবে কে! ভুল ধরবে, সমালোচনা করবে কে! চারিদিকে বুদ্ধিবৃত্তির নামে কি চলে তাতো তুই একুশ বছরেই বুঝে গিয়েছিলি। তাইতো সময়ে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে চাইতি। প্রতিবাদ তো তোর রক্তেই। বংশ পরম্পরাই বহন করেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করার সাহস। তোর নাম ফাগুন, তোর বয়সটাও হয়েছিল একুশ। বায়ান্ন’র সেই ফাগুনেই আর একুশেই তো আমাদের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। সেই ফাগুনে ভাষার আন্দোলনে তোর দাদুওতো ছিল রাজপথে। তোর দাদুমা তাইতো তোর নাম রেখেছিল ফাগুন। ফাগুন তো দ্রোহেরই রূপ, আন্দোলন, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের রূপ।

আজও লিখছি বাবা, তোকে লিখছি। যখন রাতের অন্ধকার ক্রমেই গাঢ় হয়ে আসছে। চারিদিকের পরিবেশ অনেকটাই হরর ফিল্মের মত। এখন বাবা রাত-দিন সব এক হয়ে গেছে। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিতে এখন আর রাত দিনের হিসাব করে না কেউ। ক্রমেই বাড়ছে মৃতের মিছিল। খুন, দুর্ঘটনা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, নিখোঁজ, ধর্ষণের পর হত্যা এমন সব খবর ক্রমেই সামাজিক মাধ্যমের সবটাই দখল করে নিচ্ছে। গণমাধ্যম রয়েছে সিদ্ধান্তহীনতায় কেউ বা আপোষের রাস্তায়।

তুই তো ঢুকেই বুঝে গিয়েছিলি, ধুঁকছে গণমাধ্যম। কোন রকমে তার প্রাণবায়ু টিকে রয়েছে, তুই-ই তো বলেছিলি আমাকে। আমি বলেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা। রাতের অন্ধকার শেষে দিনের আলো আসবেই। আমি জানি আসবে, শুধু সেই আলোতে তুই থাকবি না। অথবা থাকবি সেই আলোরই আলোকবর্তিকা হয়ে।

ফুটনোট : ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। যার পরিচিতি ছিল ফাগুন রেজা নামেই। তরুণ গণমাধ্যম কর্মী। কাজ করতেন প্রিয় ডটকমের ইংরেজি বিভাগের সাব এডিটর হিসাবে। যোগ দেয়ার কথা ছিল জাগো নিউজের ইংরেজি বিভাগে। কিন্তু গত ২১ মে ঢাকা থেকে শেরপুরে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে নিখোঁজ হন ফাগুন রেজা। পরে তার লাশ পাওয়া যায় জামালপুরের কাছাকাছি রানাগাছি নামক স্থানে রেললাইনের ধারে।

তার মৃত্যু নিয়ে দেশের বড় বড় মাধ্যমগুলো খবর করেছে। খবর হয়েছে বিদেশী গণমাধ্যমেও। প্রতিবাদ হয়েছে নিজ জেলা শহরসহ শেরপুরের পাঁচটি উপজেলাতেই।

মানববন্ধন হয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সমুখে। যে মানববন্ধনে লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা যোগ দিয়ে বিচার চেয়েছেন হত্যাকাণ্ডের। কিন্তু তারপরেও দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুটি মাস। আমরা, তার বাবা-মা-ভাই, স্বজন ও সহকর্মীরা প্রতিক্ষায় কবে খুনিরা আসবে বিচারের আওতায়। শান্তি পাবে ফাগুনের আত্মা, শান্ত হবে আমাদের হৃদয়।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।] 

আরো পড়ুন