ছবি সংগৃহীত
সতর্ক হলে ক্ষতিকর মোটাতাজা গরু ক্রয় এড়ানো সম্ভব
আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৯:০৮
(ইত্তেফাক) ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশের বাজারগুলোতে যতসংখ্যক গরু আসে তার ১০ শতাংশ গরুতে ক্ষতিকর স্টেরয়েড হরমোন ব্যবহার করা হয়। তাই গরু কেনার সময় যদি দেখেশুনে কেনা যায় তাহলে একটি সুস্থ পশু কেনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে গরু মোটাতাজা করলে গরুর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মাথা উঁচু, শরীর টানটান, তীক্ষ্ম থাকবে। তাই গরু কেনার সময় ওজনে ভারী, ফোলা ও চর্বিজাতীয় গরু না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশে প্রায় ৮০ লাখ পশুর চাহিদা আছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ গরু এবং ৬০ লাখ ছাগল। গরুর চাহিদার এক-চতুর্থাংশই আসে স্থানীয়ভাবে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প থেকে। বাংলাদেশে প্রায় ৫ লক্ষ খামারি মোটাতাজাকরণ করে থাকেন। স্থায়ীভাবে দেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, নোয়াখালী, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর জেলার খামারগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গরু মোটাতাজা করা হয়। এছাড়া প্রতি বছর ভারত থেকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ গরু বাংলাদেশে আসে। এর মধ্যে হালচাষসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয় না এমন গরুই বেশি। তবে এসব গরু বেশিরভাগই মাংসের জাত। দেশীয় ভালো জাত না থাকার কারণে ভারত থেকে আসা এসব গরুগুলোকে মোটাতাজাকরণের জন্য বেছে নেন দেশীয় খামারিরা। হরিয়ান, থারপাকার, অর্মিতমোহল, ক্যানক্রেজ ও শাহীওয়াল সিন্ধি নামক মাংসের জাতের গরুগুলোকে মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের আওতায় আনা হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঈদ উপলক্ষে ৩ থেকে ৪ মাস আগেই নিয়ে আসা গরুকে ইউরিয়া-চিটাগুড় খড়, কৃমিনাশক ওষুধ, ভিটামিন, মিনারেল ও প্রোটিন জাতীয় খাবার ব্যবহার করে মোটাতাজা করা হয়। তবে অতিরিক্ত লাভের আশায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত মোটাতাজাকরণের জন্য স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন ব্যবহার করে থাকে। ডেক্সামিথাসন, কোর্টিসল, বিটামিথাসন, হাইড্রোকর্টিসন, প্রেডনিসলন ইনজেকশন একটি বাড়ন্ত ষাঁড় গরুকে প্রয়োজনের ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি দেয়া হয়। আবার চোরাচালান হয়ে ডেক্সামিথাসন বা ডেকাসন বা ওরাডেক্সন স্টেরয়েড জাতীয় সস্তা ট্যাবলেট দেশে আসছে। পশু মালিকেরা প্রতিটি পশুকে এর যে কোন একটির পাঁচটি ট্যাবলেট প্রতিদিন খাইয়ে থাকেন। তবে ১০ শতাংশের কম গরু মোটাতাজাকরণে স্টেরয়েড বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে ৫ থেকে ৭ শতাংশ ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর বাজারগুলোতে আসে। আর স্টেরয়েডের ক্ষতিকর প্রভাব মাত্র তিনদিন থাকে। তবে এক্ষেত্রে বাজার থেকে গরু বাছাই করার জন্য ক্রেতাদের সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিম্যাল প্রোডাকশন এন্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, সারাদেশে যত গরু মোটাতাজাকরণ করা হয় তার ১০ শতাংশেরও কম গরুকে স্টেরয়েড জাতীয় ড্রাগ সেবন করানো হয়। তবে এ নিয়ে ক্রেতাদের আতঙ্কের কিছু নেই। ক্রয় করার সময় ক্রেতারা সতর্ক থাকলে এসব গরু ক্রয় এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, স্টেরয়েড সেবন করানো গরু অসুস্থতার কারণে সবসময় নীরব ও নির্জীব থাকে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। খাবারও খেতে চায় না। এসব গরুর পেছনের দিকে উরুর পেশীবহুল জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে তা উল্লেখযোগ্যভাবে দেবে যাবে। কারণ বাইরে থেকে মাংস মনে হলেও এখানে মাংসের সঙ্গে ব্যাপক পরিমাণে পানি থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটা করা এসব গরুরকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়। এসব দেখে কোরবানির গরু বাছাই করতে হবে। গরুকে যে কোন ধরনের হরমোন খাওয়ানো হোক না কেন ৭ দিন পরে এর কার্যকারিতা থাকে না। এক্ষেত্রে ক্রেতারা ঈদের ৭ দিন আগে গরু ক্রয় করতে পারেন। স্টেরয়েড সেবন করা গরু ৭ দিন পর বেশিরভাগ মারা যায়। ঈদের ৩ থেকে ৪ দিন আগে রাজধানীর বাজারগুলোতে এসব গরু বেশি আসে। গাভীকে হরমোন খাওয়ানো বা সেবন করা হয় না। কোরবানির জন্য গাভী বা বকনা বাছুর বাছাই করলেও স্টেরয়েড এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেছেন তিনি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, যেসব ড্রাগ যৌনপল্লীতে নারীরা ব্যবহার করেন সেইসব ওষুধ গরু মোটাতাজাকরণের জন্য ব্যবহার করা হয়। ফলে গরু দ্রুত বেড়ে যায়। এসব ড্রাগ বেশিরভাগই চোরাই পথে বাংলাদেশে আসে। চিফ ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ বলেন, বিদেশ থেকে আসা গরুগুলো অনেক রোগ বহন করে আনে– যার দ্বারা দেশি গরুতেও রোগ ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক উপায়ে গরু মোটাতাজা যারা করেন তারা অনেকাংশে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ডা. শহিদ উল্লাহ আরো বলেন, এনিম্যাল ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সংস্থা কর্তৃক হরমোন জাতীয় স্টেরয়েড (ডেক্সমিথাসন, পেন্টামেথাসন) ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশে প্রাণিদের ক্ষেত্রে এসব ঔষধ ব্যবহার নেই বললেই চলে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব ওষুধ বিভিন্ন উত্স থেকে সংগ্রহ করে ব্যবহার করে থাকতে পারেন সে পরিসংখ্যান সঠিকভাবে আমাদের কাছে না থাকলেও এরা শতকরা ৫ ভাগের বেশি হবেন না। অনেকেই ফ্যাটিনং ট্যাবলেট নামক এক প্রকার ট্যাবলেটের কথা উল্লেখ করে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে এসব ট্যাবলেটের অস্তিত নেই। সৌজন্যে: দৈনিক ইত্তেফাক
- ট্যাগ:
- বাংলাদেশ
- গরু মোটাতাজাকরণ
- রাজধানী