ছবি সংগৃহীত

পর্যটনে অপার সম্ভাবনাময় সোনাদিয়া দ্বীপ

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০১৬, ০৭:৫০
আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০১৬, ০৭:৫০

ছবি: সংগৃহীত 

(এম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার) পর্যটকদের আকর্ষণ করার দিক দিয়ে সর্বপ্রথম হচ্ছে বাংলাদেশের কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। এ বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ নেই। শুধু বাংলাদেশি নয়, সারাবছরজুড়েই বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনায় পৃথিবীর এই বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতটি মুখরিত থাকে সারাক্ষণ। আর এই কক্সবাজার জেলারই একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান হলো মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ। 

কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে মহেশখালী না গেলে ভ্রমণটাই বৃথা। আর মহেশখালী যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো সোনাদিয়া দ্বীপ দর্শন। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সুবিধার্থে জেলার পর্যটনস্পট গুলোর বর্ণনা তুলে ধরা হচ্ছে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। আজ প্রথম পর্বটি সাজানো হয়েছে সম্ভাবনাময় সোনাদিয়া দ্বীপ নিয়ে।

ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার জেলা থেকে মহেশখালীর দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। কক্সবাজার থেকে উত্তর-পশ্চিমে এবং মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণে সোনাদিয়া দ্বীপটি অবস্থিত। মাঝখান দিয়ে একটি খাল বয়ে যাওয়ায় এটি মহেশখালি দ্বীপ থেকে বিছিন্ন হয়েছে। মহেশখালী থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সাগরের বুকে সোনাদিয়া দ্বীপটি অবস্থিত। মহেশখালী উপজেলার অর্ন্তগত হোয়ানক ইউনিয়নে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপটির আয়তন ৯ বর্গকিলোমিটার। ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনের সমন্বয়ে গঠিত এই দ্বীপটি। সাগরের গাঢ় নীল জল, লাল কাঁকড়া, কেয়াবন, সামুদ্রিক পাখি সবমিলিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চকর পরিবেশ সবসময় এই দ্বীপে বিরাজ করে।

মহেশখালী থেকে সোনাদিয়া দ্বীপ যেতে পথের সবকিছুই মনে হবে শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো এক অকৃত্রিম ছবি চোখের সামনে ভাসছে। এ দৃশ্য যেনো কোনোদিন ভোলার নয়। এখানকার খালের পানি এতোটাই স্বচ্ছ ও টলটলে, দেখে মনে হবে যেন কোনো কাঁচের ওপর দিয়ে নৌযানটি এগিয়ে চলেছে। যা দেখলে শত বছরের দু:খ-কষ্ট এক নিমেষেই ভুলে যেতে বাধ্য। সমুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়ে ভিতরের দিকে গিয়ে খালটি কয়েকটি শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। খালের দু-পাশে সবুজ বন। এসব বনে রয়েছে কেওড়া, হারগোজা, উড়িঘাস এবং কালো ও সাদা বাইন বৃক্ষ।

ছবি: সংগৃহীত  

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের মতো এই দ্বীপটি সমুদ্রের বুকে অবস্থিত হলেও সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো এখানে তেমন জনবসতি এখনো গড়ে উঠেনি। মূলত: এই দ্বীপের বেশিরভাগ লোকই জেলে এবং কিছু লবণ চাষী রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায় জীবনযাত্রার মান খুব ভালো নয় বিধায় এখানে জনবসতিগড়ে উঠছে না। কেননা এখানে কোনো হাট-বাজার নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাজার-সদাইয়ের জন্য একমাত্র ভরসা ছোট ছোট মুদির দোকানগুলো। এই দ্বীপের যে বিষয়টি পর্যটকদের মনে সারাজীবন স্থান করে নিতে সক্ষম সেটি হলো এখানকার চা। অত্যন্ত সাধারণ মানের হলেও এখানকার চায়ের স্বাদ কখনো ভোলার নয়।

দ্বীপটির পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্ত বেশ খোলামেলা। এই স্থানটিতে কোনো জনবসতি নেই। সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো খোলামাঠ, নির্জনতা ও অফুরন্ত বাতাস সব মিলিয়ে মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। এই দ্বীপের লা-মাঠে বসলে মনে হবে যেন অজানা-অচেনা কোনো দ্বীপে আপনি একা। আপনার পাশে কেউ বসে থাকলেও মনে হবে আপনি একা, চারপাশে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। সবকিছুই মনে হবে কল্প-দৃশ্যের মতো। অনেকের মতে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের চেয়ে সোনাদিয়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেক এগিয়ে। এই দ্বীপের কিছু অংশে তরমুজের চাষ করা হয়। তরমুজের মৌসুমে গেলে এখানকার তরমুজের স্বাদ বাড়তি পাওনা।

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটকরা আরও দেখতে পাবেন সোনাদিয়া দ্বীপে একটি বেসরকারি সামুদ্রিক কচ্ছপের হ্যাচারি রয়েছে। দ্বীপ থেকে কচ্ছপের ডিম সংগ্রহ করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়। তারপর সেসব ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়।

যাতায়াত ব্যবস্থা:

ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, কল্যাণপুর ও দেশের যে কোনো স্থান থেকে বাস, ট্রেন বা অন্য কোনো বাহনে করে প্রথমে যেতে হবে কক্সবাজার। কক্সবাজার শহরের কস্তুরা ঘাট থেকে স্পিডবোট বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে তারপর যেতে হবে মহেশখালী। মহেশখালী গোরকঘাটা থেকে ঘটিভাঙা পর্যন্ত পথটুকু যেতে হবে বেবি ট্যাক্সিতে করে। মহেশখালীর গোরকঘাটা থেকে ঘটিভাঙার দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। সেখান থেকে আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সোনাদিয়া দ্বীপে যেতে হয়। ঘটিভাঙা নেমে খেয়া নৌকায় সোনাদিয়া চ্যানেল পার হলেই সোনাদিয়া।

ছবি: সংগৃহীত

ভাটার সময় খালে খুব বেশি পানি থাকে না। সোনাদিয়া যাওয়ার দুটো উপায় আছে। হেঁটে যাওয়া অথবা জোয়ার এলে নৌকা। প্রতিদিন জোয়ারের সময় পশ্চিম সোনাদিয়া থেকে ঘটিভাঙা পর্যন্ত মাত্র একবার একটি ট্রলার ছেড়ে আসে। এই ট্রলারটিই কিছুক্ষণের মধ্যে যাত্রীদের তুলে নিয়ে আবার ফিরতি যাত্রা করে।

উল্লেখ্য, কক্সবাজার থেকেও সরাসরি স্পিডবোট রিজার্ভ করে সোনাদিয়া দ্বীপে যাওযার ব্যবস্থা রয়েছে। সেজন্য নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা গুণতে হয়। যারা ভ্রমণকে অ্যাডভেঞ্চারময় করতে ভালোবাসেন তারা কিছু বাড়তি খরচ করে কক্সবাজার থেকে সরাসরি স্পিডবোটে করে সোনাদিয়া দ্বীপে যেতে পারেন।

থাকা-খাওয়া:

সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য কোনো আবাসিক হোটেল নেই। খাওয়ারও তেমন কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় লোকজনকে টাকা দিলে তারা খাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। আর সোনাদিয়া দ্বীপে রাত্রি যাপনের ক্ষেত্রেও ভরসা সেই স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে রাতে থাকার কষ্টের কথা চিন্তা করে যারা সূর্যোদয়ের আগেই ফিরে আসবেন তারা সোনাদিয়াদ্বীপের আসল সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হবেন।

ছবি: সংগৃহীত  

এখানকার সূর্যাস্ত আরও অসাধারণ।সন্ধ্যায় সাদা পালক দুলিয়ে সারি সারি বক উড়ে যায় আপন ঠিকানায়। নীল আকাশের কপালে কে যেন দেয় লাল টিপ। আস্তে আস্তে যখন সূর্য হারিয়ে যায় সাগরের বুকে তখন তৈরি হয় এক মোহনীয় পরিবেশ। আর সোনাদিয়া দ্বীপে রাত্রিযাপন হতে পারে আপনার জীবনের সেরা রাতের একটি।