ছবি সংগৃহীত
জাপানের ধর্মীয় বৈচিত্র্য (পর্ব-৫)
আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৫, ০৪:৫৮
জাপানের তৃতীয় প্রধান ধর্ম খ্রিস্টধর্ম। খ্রিস্ট ধর্মীয় চিন্তাচেতনা জাপানকে আধুনিক করেছে নিঃসন্দেহে। নতুন ও নতুত্বের প্রতি অদম্য কৌতূহলী করেছে পাশ্চাত্যের এই ধর্মটি জাপানি জাতিকে। এদেশে প্রথম খ্রিস্টধর্ম নিয়ে আসেন জেসুইট পাদ্রী ফ্রান্সিস জেভিয়ার (Saint Francis of Xavier, ১৫০৬-৫২ খ্রি:) ১৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপ কাগোশিমা থেকে তিনি ক্যাথলিক ধর্মশিক্ষা প্রচার শুরু করেন। তবে বেশিদিন তিনি থাকেননি এদেশে, মাত্র দু’বছরের মতো কিন্তু এর মধ্যেই তাঁর শিষ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় জেসুইট সম্প্রদায়, তিনি ফিরে যান পর্তুগীজ অধ্যুষিত ভারতের গোয়া দ্বীপে ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর এই অভিযান সফল করতে প্রভূত সহযোগিতা করেন ‘আনজিরোও’ নামক স্থানীয় একজন জাপানি। জেভিয়ারের দোভাষীও ছিলেন তিনি। জানা যায় যে, ১৭ শতাব্দীর প্রথম দিকে জাপানব্যাপী ৭৫০,০০০ জন জাপানি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন! ক্রমশ এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে প্রবল বাধা-বিপত্তির মুখে পড়ে এই নতুন ধর্ম। তারপর এদো যুগে এসে ‘সাকোকু’ তথা ‘রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্নকরণ’ নীতি গ্রহণের কারণে চরম রাষ্ট্রীয় বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে বিদেশী মিশনারিগুলোকে জাপান থেকে বিতাড়িত করে তোকুগাওয়া সামুরাই সরকার। দারুণ অমানবিক অবস্থার মধ্যে খ্রিস্টানরা তাঁদের কর্মকর্ম পালন করতে থাকেন। ‘কাকুরে খ্রিস্টান’ তথা ‘আত্মগোপনকারী খ্রিস্টান’ হিসেবে পরিচিত খ্রিস্টান সমাজে সাধারণ নাগরিক ছাড়া প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণীর ব্যক্তিরাও এই ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন। ফলে খ্রিস্টধর্ম প্রভাবিত করতে থাকে দ্রুত গতিতেই জাপানি সমাজ, সংস্কৃতি এবং জীবনধারাকে। এদো যুগের শেষ দিকে বৃটেন, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, পর্তুগাল, ওলন্দাজ প্রভৃতি শ্বেতাঙ্গ দেশগুলোর ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, ভাষা শিক্ষক, সামরিক প্রশিক্ষক এবং রাষ্ট্রদূতদের খ্রিস্টধর্মীয় আচার-আচরণ-উপাসনা ইত্যাদি রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কর্মরত জাপানিদেরকে জোরালোভাবেই আন্দেলিত করেছিল একটা রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ এই ধর্মের ঝান্ডা নিয়ে জনসম্মুখে আবির্ভূত হতে সাহস করেননি প্রভূত শক্তিশালী সামুরাই শাসকের অত্যাচারের ভয়ে। তথাপি পুরো মধ্যযুগব্যাপী সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গুপ্ত খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন কৌশল এবং সাঙ্কেতিকভাবে যিশুখ্রিস্টের প্রতি ভক্তিভরে পবিত্র ক্রুশ তৈরি করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুদ্ধমূর্তির বুকে, মন্দিরের দেয়ালে ক্রুশ বোঝাতে ক্রসচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। মধ্যখানে বুদ্ধের পদ্মাসনমূর্তি খোদিত ক্রুশও সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত হয়েছে কয়েক স্থানে। মেইজি মহাসংস্কারের উষালগ্ন পর্যন্ত এই দুুঃসহ দুর্দিনের কালো মেঘ বেশ দ্রুতগতিতে সরে যেতে থাকে যখন মার্কিন নৌসেনা প্রধান কমোডর ম্যাথু প্যারি (১৭৯৪-১৮৫৮) ১৮৫৩ সালে জাপানের উরাগা সমুদ্রবন্দরে কালো জাহাজ নোঙর করে জাপানকে বহির্বিশ্ব তথা আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উন্মুক্ত হতে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন। আমরা জানি যে, ২০০ বছরের জন্য জাপান ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে বহির্বিশ্ব থেকে স্ববিচ্ছিন্ন একটি দেশ। কমোডর প্যারির এই হাঁক-ডাক, যুদ্ধের হুমকি প্রদর্শন এবং আধুনিক বিশ্বের প্রতি একদল প্রভাবশালী উচ্চবিলাসী জাপানি ব্যক্তির প্রবল আগ্রহ জাপানকে উন্মুক্ত এবং জাপানে খ্রিস্টধর্মের জোয়ার সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়। ১৮৫৯ সাল থেকেই জাপানে আমেরিকা থেকে প্রোটেস্টান্ট মিশনারি, ক্যাথলিক, রাশিয়ান অর্থডক্স খ্রিস্টান প্রচারকরা আসতে শুরু করেন এবং ধর্মপ্রচার করতে থাকেন সক্রিয়ভাবে। ১৮৬৮ সালে মেইজি সম্রাটকে কেন্দ্র করে যে মহাসংস্কার সংঘটিত হয় তাতে রাজকীয় ক্ষমতার পুনরুদ্ধার ঘটে এবং শিন্তোওধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। রাষ্ট্র কর্তৃক উন্মুক্ত এবং শিন্তোওধর্মের উদার নীতি বলবৎ থাকা সত্ত্বেও বিদেশী ধর্মপ্রচারকরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি দলনের শিকার হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায় মেইজি যুগেই (১৮৬৮-১৯১২)। বৌদ্ধধর্ম সাময়িককালের জন্য ম্লান হয়ে পড়ে, নিপীড়নের শিকার হন অনেক বৌদ্ধ পুরোহিত। কিন্তু ১৮৬৮ সালেই সরকার সচেতন হয়ে ‘শিনবুৎসু বুনরি’ নামে একটি পৃথিকীকরণ নীতি ঘোষণা করে ধর্মীয় স্বাধীনতার লক্ষ্যে। অবশ্য আধুনিক শিক্ষার আলোকেও ধর্মীয় বাধা-নিষেধ ক্রমশ দূরীভূত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন খ্রিস্টধর্মীয় সুশিক্ষিত পাশ্চাত্যবাসী যাঁরা এদেশে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে। তাঁদের কাছে শিক্ষালাভ করে অনেক জাপানি নাগরিক আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মান, নেদারল্যান্ডসে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং ফিরে এসে স্বদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। হঠাৎ করে আধুনিক সংস্কৃতি যেমন গ্রামীণ জাপানকে দ্রুত বদলে দিতে থাকে তেমনি পুরনো সামাজিক রীতি-নীতি, বিশ্বাস, কুসংস্কারেও বিবর্তনের আলো ফেলতে থাকে সমানভাবে। খ্রিস্ট ধর্মীয় গীর্জা যেমন স্থাপিত হতে থাকে সেইসঙ্গে গড়ে উঠতে থাকে উদারনৈতিক, মুক্তচিন্তাবলম্বী ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে আধুনিক নারীশিক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্মের অবদান আজও অনস্বীকার্য। জাপানের নারীশিক্ষার উন্নয়নে সর্বপ্রথম মহিলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন আমেরিকায় শিক্ষিত খ্রিস্টধর্মাবলম্বী শিক্ষাবিদ ড.নারুসেই জিনজোও (১৮৫৮-১৯১৯)। কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ১৯১৬ সালে জাপানে। নাগানো-প্রদেশে অবস্থিত ওই মহিলা মহাবিদ্যালয়ের শাখায় আমন্ত্রিত হয়ে কবিগুরু কিছুদিন আতিথ্যগ্রহণ করেছিলেন, বক্তৃতা দিয়েছিলেন ছাত্রী সমাবেশে। মেইজি যুগে পাশ্চাত্য শিক্ষার আমদানি এই যুগের জাপানি সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বলতেই হয়, যা থেকে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশ ভারতবর্ষ বরাবরই হয়েছিল উপেক্ষিত। ক্ষমতাসীন বৃটিশরা কিছু সংখ্যক ভারতীয়কে শিক্ষা দিয়েছিল মূলত তাঁদেরকে চিরকালের জন্য গোলাম করে রাখার লক্ষ্যে, সার্বিক উন্নয়নের জন্য নয়। বস্তুত জাপান খ্রিস্টানদের আধুনিক বিদ্যাশিক্ষাকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে কাজে লাগিয়েছিল পুরো মাত্রায়। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ জাপানের অতিরিক্ত পাশ্চাত্যকরণকে প্রসন্নদৃষ্টিতে দেখেননি, পাঁচবার জাপানে এসে প্রত্যেকবারই সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক যে, জাপান প্রাচীনকাল থেকেই বহির্বিশ্বের সম্ভাবনাময় সংস্কৃতি-সভ্যতাকে নিজের সংস্কৃতি-রীতি-নীতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে আত্মস্থ করেছে। নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ব্যাপ্ত থেকেছে। ধর্মের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আদির সঙ্গে নতুনের মৈত্রীবন্ধনের পৌরহিত্যে শতভাগ সফল হয়েছে ক্রমাগত সংস্কার---গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, বিশ্বের একাধিক প্রধান ধর্মের জন্মস্থান ভারতে আজও ধর্মীয় সহাবস্থান, সহিষ্ণুতা গড়ে ওঠেনি---সংবিধানে ‘ধর্মনিরেপেক্ষ’ নীতি বলবৎ করা সত্ত্বেও। জাতীয় পতাকায় বৌদ্ধধর্মীয় ‘ধর্মচক্র’কে রেখে বৌদ্ধধর্মকেই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে ভারতভূমি থেকে! এরকম ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। বিহার প্রদেশে অবস্থিত প্রাচীন পৃথিবীর অহঙ্কার বলে বিবেচিত বৌদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারত অভিযানকারী তুর্কি সেনাপতি ইকতিয়ারউদ্দিন-বিন-বখতিয়ার খিলজি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন---মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই মহাক্ষতি আজও আমাদেরকে বিস্ময়াহত করে! ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বের নামে দেশভাগ, জাতিভাগ যে কত বড় দুষ্কর্ম ঘটিয়েছে মহামানব সৃষ্টিকারী ভারতবর্ষে যার ফলাফলই আজকের রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মীয় বৈষম্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, পুরোহিতকে পুড়িয়ে মারার মতো অসভ্য, বর্বর ঘটনা। এসবের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হয়েছে ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি তৎপরতা। কোথায় সভ্যতা, কোথায় ধর্মীয় বৈচিত্র্য, কোথায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ভারতীয় উপমহাদেশে? যা দেখি আমরা এই জাপানে। কবি, দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ যে জাপানকে ‘অসভ্য’ বলে জানতেন, কোনো আগ্রহই ছিল না দেশটি সম্পর্কে সেদেশেরই আন্তর্জাতিকমনস্ক দার্শনিক ওকাকুরা তেনশিনকে (১৮৬৩-১৯১৩) কলকাতায় দেখে তাঁর মনোদৃষ্টির কুয়াশা কেটে গিয়েছিল। তিনি আগ্রহী হয়ে উঠলেন তেনশিনের বিদগ্ধ পান্ডিত্যে, উদার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সান্নিধ্যে এসে আগন্তুকের দেশ ও জাতি সম্পর্কে। ওকাকুরার সঙ্গে গিয়েছিলেন তখন হোরি শিতোকু নামে একজন তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষু সংস্কৃত ভাষা শেখার উদ্দেশ্যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে তাঁকে রেখে দিতে। ওকাকুরার অনুমতিক্রমে শিতোকু শান্তিনিকেতনের প্রথম বিদেশী ছাত্র হিসেবে থেকে যান। ১৯১৬ সালে জাপানে এসে রবীন্দ্রনাথের দিব্যদৃষ্টি খুলে যায়। প্রথম দর্শনেই জাপানকে ভালোবেসে ফেলেন। তারপর আমৃত্যু তিনি ছিলেন জাপানি সভ্যতা-সংস্কৃতি-শিল্পকলার গুণগ্রাহী। তৎকালীন বৌদ্ধ জাপানিরা ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথকে ঋষিকবি, ব্রহ্মজ্ঞ-দার্শনিক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অথচ একটি শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষই উপমহাদেশের কোনো কোনো দেশে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দুত্ববাদী কবি বলে অপপ্রচার, অপব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করে চলেছে। তাঁদের দৃষ্টি যায় না আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন জাপানিদের দিকে---অথচ আশ্চর্যের বিষয় যে, এই শ্রেণীর অনেকেই এদেশে এই দেশের সরকারেরই আর্থিক বৃত্তি নিয়ে উচ্চগবেষণা করছেন! অনেকে চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন কিন্তু সাম্প্রদায়িক মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারছেন না এটাই আশ্চর্যের বিষয়! এর মূল কারণ প্রকৃত শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধের অভাব এবং স্বধর্মের অপব্যাখ্যা ও অন্ধত্ব। এতেই বোঝা যায় যে, ধর্ম শুধু মানুষকে দিব্যজ্ঞানই দেয় না, অন্ধ-বধিরও করে ফেলে। আজ স্বীকার করতেই হবে যে, বর্ণাঢ্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মতো ধর্মীয় সহাবস্থান বা উদার মনোভাবসম্পন্ন ধারা যা জাপানে মেইজি যুগে সূচিত হয়েছিল এখন তা আরও উজ্জ্বল। এবং জাপানিরা এর জন্য অহঙ্কার করতেই পারেন। এদো যুগেও (১৬০৩-১৮৬৮) ধর্মের উর্ধ্বে প্রয়োজনীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিল যেমন ‘হানকোও’ বা ‘সামন্ত বিদ্যালয়’, ‘তেরাকোইয়া’ বা ‘বৌদ্ধমন্দির ভিত্তিক শিক্ষা বা চতুষ্পাঠি’, ‘শোওহেইকোও’ বা ‘সামরিক বিদ্যালয়’, ‘শিজুকু’ বা ‘গুরুগৃহ শিক্ষায়তন’ প্রভৃতি। তারপর বিগত দেড়শ বছরের মধ্যে এই দেশে বহু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, ফাউন্ডেশন স্থাপিত হয়েছে, এর মধ্যে ক্রিশ্চিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় একটি চমৎকার উদাহরণ। সোফিয়া বা টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়, রিক্কিয়োও বিশ্ববিদ্যালয়, সেইতোকু বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিন্তোওধর্মীয় কোকুগাকুইন স্কুল ও কোকুগাকুইন বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের অহঙ্কার। বৌদ্ধ ধর্মীয় ওওতানি বিশ্ববিদ্যালয়, রিউকোকু বিশ্ববিদ্যালয়, রিশ্শোও বিশ্ববিদ্যালয় পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরকম আরও বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান। অবশ্য এগুলোতে শুধু যে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয় তা কিন্তু নয়। সাধারণ এবং আধুনিক বিষয়াদির অনুষদও বর্তমান। যেমন ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, প্রকৃতি-পরিবেশ, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যবহারিক বিজ্ঞান প্রভৃতি। এগুলোতে রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। উল্লেখ্য যে, কিয়োতো শহরে অবস্থিত ৩৭০ বছরের প্রাচীন রিউকোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রয়েছে মধ্যএশিয়া, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া তথা চীন, ভারত, তিব্বত, বার্মা, শ্রীলংকার বহুমূল্যবান অসংখ্য প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মীয় পুঁথি, পান্ডুলিপি, প্রত্মসম্পদ যেগুলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হোনকানজি বৌদ্ধ মন্দিরের প্রাক্তন প্রধান পুরোহিত এবং প্রত্নগবেষক ওওতানি কোওজুই (১৮৭৬-১৯৪৮) স্বউদ্যোগে ১৯০২-১৪ সাল পর্যন্ত কয়েক দফা ব্যয়বহুল অভিযান চালিয়ে আবিষ্কার ও সংগ্রহ করেছিলেন। এগুলো গবেষণার জন্য ছুটে আসছেন আন্তর্জাতিক গবেষকরা। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে আধুনিক, উদারনৈতিক শিক্ষা নীতি দ্বারা, যে কারণে ক্যাম্পাসের অনুকূল পরিবেশ এবং বাস্তবতা জাপানি তরুণ প্রজন্মকে ধর্মীয় প্রতিযোগিতা, ধর্মকে পণ্যায়ণ করা, ধর্ম নিয়ে ব্যবসা, রাজনীতি বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করার মতো কলুষতা থেকে বিরত রেখেছে। এদো যুগে যেমন খ্রিস্টধর্মকে অবৈধ ঘোষণা করে বিদেশী ও জাপানি খ্রিস্টানদেরকে অত্যাচার করা হয়েছে বা সম্রাট বংশানুক্রমিক আদিধর্ম শিন্তোও বলে মেইজি যুগ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত শিন্তোও ছিল রাষ্ট্রধর্ম এবং জোরপূর্বক ঘরে ঘরে শিন্তোওধর্মীয় রক্ষাকবচ (Talisman) রাখার বিষয়ে কড়াকড়ি বিধি জারি করা হয়েছিল তেমনটি এখন আর নেই। ১৯৪৭ সালে সংবিধানের ২০ নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ধর্মীয় স্বাধীনতা সকলের জন্য নিশ্চিত। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন রাষ্ট্র থেকে কোনো প্রকার সুবিধা পাবে না তেমনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের চর্চা করতে পারবে না। (Freedom of religion is guaranteed to all. No religious organization shall receive any privileges from the State, nor exercise any political authority.) তবে এই বিধান লিখিত না হলেও মেইজি যুগেই হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, তাওবাদ, কনফুশিয়ান রীতি-নীতি ও দর্শনের প্রভাব পড়েছে গভীরভাবেই শিন্তোওধর্মের উপর ফলে উনিশ শতকের শেষ দিকে এটি উদারনৈতিক ধর্ম হিসেবে আদর্শায়িত হতে থাকে। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যে শান্তি ও সমন্বয় জরুরি এটা সুশিক্ষিত মেইজি রাষ্ট্রনায়ক এবং বুদ্ধিজীবীরা সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন। তারই বাস্তব এবং চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জীবনে। ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা জাপানের মতো আর কোনো দেশে এতখানি দেখা যায় না বলেই বিশ্বাস। আশ্চর্য যে, জীবিতকালে জাপানিদের মধ্যে চমৎকার এক ধর্মীয় সমন্বয় বা ঐক্যতান লক্ষ করা যায়। স্বধর্মীয় বিবাহ-অনুষ্ঠানাদি তো আছেই কিন্তু সচরাচর সাধারণ্যে যা দৃশ্যমান তা হল: বিয়ের মন্ত্রপাঠ শিন্তোওধর্ম অনুসারে, অতিথি আপ্যায়ন খ্রিস্টীয় রীতিতে আর মৃত্যুর পর শবদাহ হয় বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মানুসারে। এই যে ধর্মীয় সহাবস্থান, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এর চেয়ে শিক্ষামূলক আধুনিক সমাজব্যবস্থা মানুষের জীবনে আর কী হতে পারে? (চলবে)
- ট্যাগ:
- আন্তর্জাতিক
- জাপান
- ধর্মীয় উৎসব