ছবি সংগৃহীত
সংসার চালাতে আইসক্রিম বিক্রি করেছি: সুকুমার বড়ুয়া
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪:১৫
সুকুমার বড়ুয়া। ছবি: রিয়াজ আহমেদ, প্রিয়.কম
(প্রিয়.কম) সুকুমার বড়ুয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত ছড়াকার। আজ পহেলা বসন্ত। ৭৯ বছরে পা দিয়েছেন কবি। টিএসসি থেকে কবির বাসায় যাচ্ছিলাম রিকশায় করে। কবিকে ফোন দিতেই, বাসায় কীভাবে যেতে হবে তা বলে দিলেন। প্রথমবার কবির বাসায় যাওয়ার কারণে একটু ঝামেলা হয়। রাস্তায় এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, চামেলি হাউস কোথায়? তিনি বললেন, ‘কোথায় যাবেন?’ বললাম, কবি সুকুমার বড়ুয়ার বাসায় যাবো। তিনি বললেন, ‘আসেন আমার সাথে।’ কিছু দূর যাওয়ার পর বললাম, ভাই আর কতো দূর? তিনি বললেন, ‘ঐ মিয়া এত কথা বলেন কেন? আসেন আমার সাথে।’ কিছু দূর হাঁটার পর একটি বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। সে লোকটি ভেতরে চলে গেল। সামনে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। তাকে বললাম ভাই আমরা সুকুমার বড়ুয়ার বাসায় যাবো। লোকটি বললেন, ‘ঐ যে সুকুমার বড়ুয়া।’ কবি লাঠিতে ভর করে হাঁটেন। বাসায় ঢুকতেই তার দুই মেয়ে বলে উঠলেন, ‘আপনারাই সকালে ফোন দিয়েছিলেন?’ বললাম হ্যাঁ। তাঁর মেয়ে বললো দেখুন হাঁটতে পারে না অথচ সকালে একা একা গেটের সামনে গিয়ে বসে আছে, আপনারা আসবেন বলে। ‘আসুন, বসুন।’ আমরা কবির ঘরে গিয়ে বসি। শুরু হয় কবির সাহিত্য জীবন এবং একুশে পদক প্রাপ্তি নিয়ে নানান কথা…
প্রিয়.কম: আপনার জীবনে ৭৯তম বসন্ত আজ। কেমন লাগছে সকালবেলার এই বসন্ত?
সুকুমার বড়ুয়া: খুব ভালো লাগছে। তোমাদের মতো তরুণ দেখলে আরো ভালো লাগে। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। আজ তেমন মনে নেই। তোমরা যখন এসে বুকে জড়িয়ে ধরো তখন কষ্ট আর কষ্ট থাকে না। জানো তোমাদের মতো বয়সে আমি যখন ছিলাম তখন পৃথিবীটা যে এতো সুন্দর জানতাম না। এখন তোমাদের মধ্যে নিজেকে খুঁজি।
প্রিয়.কম: ‘ডাবুয়া স্কুল’ এর কথা মনে আছে?
সুকুমার বড়ুয়া: হ্যাঁ, কেন থাকবে না। আমি এই স্কুলে তিনবার গিয়েছিলাম। আমার এক ভাগনে ছিল, আমার বয়সে বড়। সে স্কুলে যেত। তাকে বললাম আমি স্কুলে যাবো। সে আমাকে নিজের হাতে বই তৈরি করে দিয়েছিল। সেই বই নিয়ে আমি স্কুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু পারিবারিক ঝামেলার কারণে আর ঠিক মতো স্কুলে যেতে পারলাম না। মামা এসে নিয়ে গেল তার বাসায়। কাজ করার জন্য তার একজন লোক দরকার। তার বাসায় কাজ করতে দেবে এবং আমাকে বললো তোকে স্কুলেও যেতে দেবো। আমি তো মহা খুশি। গেলাম মামার বাসায় কিন্তু মামির অত্যাচারে আর সেখানে টিকতে পারলাম না। সেখান থেকে চলে গেলাম এক মন্দিরে। মন্দিরে থাকা খাওয়া ফ্রি ছিল। কিন্তু বদরাগী এক পুরোহিত আমাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। এই তো তারপরে আর পড়াশোনাটা হলো না।

সুকুমার বড়ুয়া। ছবি: রিয়াজ আহমেদ।
প্রিয়.কম: কেন মারলেন, পড়া না পারার কারণে?
সুকুমার বড়ুয়া: না না। সে এমনি সবাইকে মারধর করতো। আমি পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। একবার স্কুল পরিদর্শনের জন্য সরকারি লোক আসলো। দেখলাম সকল শিক্ষকরা ভয়ে ভিতু হয়ে গেল। ক্লাস নবম দশম শ্রেণির ছাত্রদের সাথে আমাকে দাঁড় করালেন। আমাকে প্রশ্ন করা হলো অংক থেকে। আমি উত্তর দিয়ে গেলাম। শিক্ষরা দারুণ খুশি। কিন্তু ঝামেলা বাধলো এক জায়গায়। আমাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ক্লাস কোনটি? আমি আমার ক্লাস আঙ্গুলে ইশারা করে দেখিয়ে দিলাম। তখন তারা বললো, ‘তুমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ো।’ বললাম হ্যাঁ। তারা আর কাউকে কোনো প্রশ্ন করলেন না। প্রধান শিক্ষককে ধরলেন এবং তাকে অপমান করলেন। কেন আমাকে নবম দশম শ্রেণির ছাত্রদের সাথে দাঁড় করালেন।
প্রিয়.কম: লেখালেখিতে কীভাবে আসলেন?
সুকুমার বড়ুয়া: তখন তো ব্রিটিশ আমল। আমার এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হলো। সে বললো, আমাকে একটা চাকরি দেবে। বেতন দেওয়ার কথা সাত টাকা। আমি তার বাসায় গেলাম। দেখলাম তার বাসায় অনেক বই। বই দেখে আমার খুব লোভ হলো। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানেই কাজ করবো। কাজ করতাম আর ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পড়তাম। দু’বছর হয়ে গেল কিন্তু কখনো সাত টাকা বেতন পেতাম না, সে আমাকে তিন টাকা বেতন দিত। তাতেও এখানে থেকে গেলাম। সুনির্মল বসুর ‘হুলুস্তুল’ নামের একটা কবিতার বই পেলাম। বইটা পুরোটাই মুখস্ত করে ফেললাম। বাসাটা আমার খুব ভালো লাগতো। এদিকে সংসার চালাতে হতো। তাই সংসার চালাতে আইসক্রিম বিক্রি করেছি। বাদাম, বুট বিক্রি করেছি।
প্রিয়.কম: তখনকার সময়ে আপনার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় কীভাবে?
সুকুমার বড়ুয়া: দৈনিক সংবাদ-এ আমার প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। আমি তখনকার সময়ে সবগুলো পত্রিকা দৈনিক পড়তাম। পত্রিকাগুলোতে যে ছড়া প্রকাশিত হতো সেগুলো আমি মুখস্ত করতাম। একদিন দেখলাম পত্রিকায় লেখা চায়। একদিন একটি ছড়া সাহস করে পাঠিয়ে দিলাম। দেখলাম দু’দিন পর আমার লেখাটা ছাপা হল। সালটা ছিল ১৯৫৭। এরপর থেকে নিয়মিত লিখতাম।
প্রিয়.কম: আপনি যে বিখ্যাত ছড়াকার হবেন, এমন কখনো ভেবেছেন?
সুকুমার বড়ুয়া: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি ভাবতাম আমি চলচ্চিত্রের হিরো হবো। একবার তো আমি চিঠি পাঠিয়েছি। এক পত্রিকা অফিসে। তারা পত্রিকায় হিরো-হিরোইন চেয়ে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল হা হা হা…
প্রিয়.কম: ‘ননীবালা’ আপনার লেখালেখিতে কোনো অবদানে রেখেছে?
সুকুমার বড়ুয়া: হ্যাঁ। সে আমাকে বলতো তোমার লেখা সবার চেয়ে আলাদা।
প্রিয়.কম: কাকে দেখে হিরো হতে ইচ্ছে হয়েছিল?
সুকুমার বড়ুয়া: আমাদের সময়তো তেমন বিখ্যাত হিরো ছিলো না। রাজা-রানিদের গল্প শুনে মনে হতো আমাকে রাজপুত্র হতে হবে। গরিব হলেও ইচ্ছে ছিল আকাশ ছোঁয়া।
প্রিয়.কম: কালতো বাংলাদেশ সরকার ‘একুশে পদক’ ঘোষণা করেছেন। আপনিও এই তালিকায় আছেন, কেমন লাগছে আপনার?
সুকুমার বড়ুয়া: ভালো লাগছে। এই পুরস্কার আরো ১৫ বছর আগে পাওয়া উচিত ছিল।
প্রিয়.কম: দেরিতে দেওয়ার কারণ কী?
সুকুমার বড়ুয়া: হয়তো তদবির চেষ্টা করা হয় নাই।
প্রিয়.কম: তদবিরের বিষয়টা বুঝলাম না?
সুকুমার বড়ুয়া: ঐ উপরের লোক জনদের রাজি খুশি করতে হয়।
প্রিয়.কম: সরকার যোগ্যতা দেখে পুরস্কৃত করবে! না হলে…
সুকুমার বড়ুয়া: কী সব লিংক না কী যেন করতে হয়। খালেদার আমলে এমন অনেকেই এই পদক পেয়েছে যাদের ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন আছে। দল করে বলে দিয়েছে। এগুলো তো ভেতরের ব্যাপার আপনারাই ভালো জানেন।
প্রিয়.কম: আপনার সাথে আসলে কী হয়েছিল বলেন। না বললে মানুষ জানবে কী করে?
সুকুমার বড়ুয়া: আমার ছেলে বলল একজন মন্ত্রী-মিনিস্টারদের ১৮টা সাইন নিয়েছে পদক পাওয়ার জন্য। তো সেখানে তো আমার মতো সাধারণ মানুষের কিছু করার থাকে না।

সুকুমার বড়ুয়া। ছবি: রিয়াজ আহমেদ।
প্রিয়.কম: আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বাংলা বিভাগের ছাত্রী। এক্ষেত্রে তাকে কিছু বলতে চান?
সুকুমার বড়ুয়া: উনিতো অনেক কাজ করছেন। এখন এগুলো নিয়ে উনি যদি ভলো কিছু করতে চান তাহলে সবার জন্যই ভালো। যেহেতু তিনি বাংলার ছাত্রী সাহিত্যের জন্য তার আলাদা টান আছে।
প্রিয়.কম: এখন সময় কাটে কীভাবে?
সুকুমার বড়ুয়া: আমি তো বাড়ি থেকে বের হতে পারি না। দেয়াল ধরে হাঁটতে হয়। ইচ্ছে করে গাছপালা ঘেরা কোনো একটা জায়গায় যাই। আমার ছেলেতো আমাকে বাইরে নিয়ে যায়। আমার ইচ্ছা করে ছুটে বেড়াতে। জীবনে অনেক পেয়েছি। ২০ বছর আগেই আমার জীবনের সব প্রাপ্তি শেষ।
প্রিয়.কম: বইমেলায় যেতে ইচ্ছে করে?
সুকুমার বড়ুয়া: খুব ইচ্ছে করে। বইমেলাইতো একজন কবির জন্য সব।
প্রিয়.কম: তরুণ লেখকদের জন্য আপনি কী বলবেন?
সুকুমার বড়ুয়া: ল্যাপটপ-ই তো সব খেয়ে ফেলছে। তবে তাদের জন্য একটা কথা বলতে চাই- দেখবে বেশি, বলবে কম, লিখতে হবে আরো কম।
প্রিয়.কম: আপনাকে ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
সুকুমার বড়ুয়া: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
সম্পাদনা: গোরা / ফারজানা রিংকী