গ্রীষ্মের প্রতীকী ছবিটি সংগৃহীত।
গ্রীষ্মের কাব্য
আপডেট: ১৬ মে ২০১৭, ১৫:০১
(প্রিয়.কম) গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুর। তাপদাহের ভোগান্তিতে ভুগেছেন বিভিন্ন সময়ের সাহিত্যিকরাও। হয়তো বিড়ম্বনায়, নয়তো দহন বন্দনায় যুগে যুগে তাঁরা লিখে গিয়েছেন গ্রীষ্ম নিয়ে কবিতা। আজ প্রিয় পাঠকদের জন্য থাকছে গ্রীষ্মকাল নিয়ে লেখা পঞ্চ কবির পঞ্চ কবিতা। কবিতা ও ছবিসমূহ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

‘গ্রীষ্মের দুপুরে’
-ফজলুর রহমান
ঘাম ঝরে
দরদর
গ্রীষ্মের দুপুরে
খাল বিল
চৌচির,
জল নেই পুকুরে।
মাঠে ঘাটে
লোক নেই,
খাঁ খাঁ করে রোদ্দুর।
পিপাসায়
পথিকের
ছাতি কাঁপে দুদ্দুর।
রোদ যেন
নয়, শুধু
গনগনে ফুলকি।
আগুনের
ঘোড়া যেন
ছুটে চলে দুলকি।
ঝাঁঝ মাখা
হাওয়া এসে
ডালে দেয় ঝাপটা!
পাতা নড়ে
ফুল পড়ে
বাপরে কি দাপটা!
বিল ধারে চিল বসে'
ঘন ঘন ডাকে রে।
মাঝি বসে ঢুল খায়
খেয়াঘাট বাঁকে রে।

‘ঐ এল বৈশাখ’
-সুকুমার রায়
ঐ এল বৈশাখ, ঐ নামে গ্রীষ্ম,
খাইখাই রবে যেন ভয়ে কাঁপে বিশ্ব !
চোখে যেন দেখি তার ধুলিময় অঙ্গ,
বিকট কুটিলজটে ভ্রুকুটির ভঙ্গ,
রোদে রাঙা দুই আঁখি শুকায়েছে কোটরে,
ক্ষুধার আগুন যেন জ্বলে তার জঠরে !
মনে হয় বুঝি তার নিঃশ্বাস মাত্রে
তেড়ে আসে পালাজ্বর পৃথিবীর গাত্রে !
ভয় লাগে হয় বুঝি ত্রিভুবন ভস্ম-
ওরে ভাই ভয় নাই পাকে ফল শস্য !
তপ্ত ভীষণ চুলা জ্বালি নিজ বক্ষে
পৃথিবী বসেছে পাকে, চেয়ে দেখ চক্ষে,-
আম পাকে, জাম পাকে, ফল পাকে কত যে,
বুদ্ধি যে পাকে কত ছেলেদের মগজে !

‘খেতে প্রান্তরে’
-জীবনানন্দ দাশ
ঢের সম্রাটের রাজ্যে বাস ক’রে জীব
অবশেষে একদিন দেখেছে দু-তিন ধনু দূরে
কোথাও সম্রাট নেই, তবুও বিপ্লব নেই, চাষা
বলদের নিঃশব্দতা খেতের দুপুরে।
বাংলার প্রান্তরের অপরাহ্ণ এসে
নদীর খাড়িতে মিশে ধীরে
বেবিলন লণ্ডনের জন্ম, মৃত্যু হ’লে—
তবুও রয়েছে পিছু ফিরে।
বিকেল এমন ব’লে একটি কামিন এইখানে
দেখা দিতে এলো তার কামিনীর কাছে;
মানবের মরণের পরে তার মমির গহ্বর
এক মাইল রৌদ্রে প’ড়ে আছে।
আবার বিকেল বেলা নিভে যায় নদীর খাড়িতে;
একটি কৃষক শুধু খেতের ভিতরে
তার বলদের সাথে সারাদিন কাজ ক’রে গেছে;
শতাব্দী তীক্ষ্ণ হ’য়ে পড়ে।
সমস্ত গাছের দীর্ঘ ছায়া
বাংলার প্রান্তরে পড়েছে;
এ-দিকের দিনমান— এ-যুগের মতো শেষ হ’য়ে গেছে,
না জেনে কৃষক চোত বোশেখের সন্ধ্যার বিলম্বনে প’ড়ে
চেয়ে দেখে থেমে আছে তবুও বিকাল;
উনিশশো বেয়াল্লিশ ব’লে মনে হয়
তবুও কি উনিশশো বেয়াল্লিশ সাল।
কোথাও শান্তির কথা নেই তার, উদ্দীপ্তিও নেই;
একদিন মুত্যু হবে, জন্ম হয়েছে;
সূর্য উদয়ের সাথে এসেছিলো খেতে;
সূর্যাস্তের সাথে চ’লে গেছে।
সূর্য উঠবে জেনে স্থির হ’য়ে ঘুমায়ে রয়েছে।
অাজ রাতে শিশিরের জল
প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি নিয়ে খেলা করে;
কৃষাণের বিবর্ণ লাঙল,
ফালে ওপড়ানো সব অন্ধকার ঢিবি,
পোয়াটাক মাইলের মতন জগৎ
সারাদিন অন্তহীন কাজ ক’রে নিরুৎকীর্ণ মাঠে
প’ড়ে অাছে সৎ কি অসং।
অনেক রক্তের ধ্বকে অন্ধ হ’য়ে তারপর জীব
এইখানে তবুও পায়নি কোনো ত্ৰাণ;
বৈশাখের মাঠের ফাটলে
এখানে পৃথিবী অসমান।
আর-কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কেবল খড়ের স্তূপ প’ড়ে অাছে দুই— তিন মাইল,
তবু তা’ সোনার মতো নয়;
কেবল কাস্তের শব্দ পৃথিবীর কামানকে ভুলে
করুণ, নিরীহ, নিরাশ্রয়।
অার-কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
জলপিপি চ’লে গেলে বিকেলের নদী কান পেতে
নিজের জলের সুর শোনে;
জীবাণুর থেকে আজ কৃষক, মানুষ
জেগেছে কি হেতুহীন সংপ্রসারণে—
ভ্ৰান্তিবিলাসে নীল আচ্ছন্ন সাগরে?
চৈত্য, ক্রুশ, নাইন্টিথ্রি ও সোভিয়েট শ্রুতি প্রতিশ্রুতি
যুগান্তের ইতিহাস, অর্থ দিয়ে কূলহীন সেই মহাসাগরে প্রাণ
চিনে-চিনে হয়তো বা নচিকেতা প্রচেতার চেয়ে অনিমেষে
প্রথম ও অন্তিম মানুষের প্রিয় প্রতিমান
হ’য়ে যায় স্বাভাবিক জনমানবের সূর্যালোকে।
‘যক্ষের নিবেদন’
-সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল, কইগো কই মেঘ উদয় হও,
সন্ধ্যার তন্দ্রার মূরতি ধরি' আজ মন্দ্র-মন্থর বচন কও;
সূর্যের রক্তিম নয়নে তুমি মেঘ! দাও হে কজ্জল পাড়াও ঘুম,
বৃষ্টির চুম্বন বিথারি' চলে যাও---অঙ্গে হর্ষের পড়ুক ধূম।
বৃক্ষের গর্ভেই রয়েছে আজো যেই---আজ নিবাস যার গোপনলোক,
সেইসব পল্লব সহসা ফুটিবার হৃষ্ট চেষ্টায় কুসুম হোক্;
গ্রীষ্মের হোক শেষ, ভরিয়া সানুদেশ স্নিগ্ধ গম্ভীর উঠুক তান,
যক্ষের দুঃখের করহ অবসান, যক্ষ কান্তার জুড়াও প্রাণ।
শৈলের পইঠায় দাঁড়ায়ে আজি হায় প্রাণ উধাও ধায় প্রিয়ার পাশ,
মূর্ছার মন্তর ভরিছে চরাচর, ছায় নিখিল কার আকুল শ্বাস!
ভরপুর অশ্রুর বেদনা ভারাতুর মৌন কোন সুর বাজায় মন,
বক্ষের পঞ্জর হারায় কলেবর, চক্ষে দুঃখের নীলাঞ্জন!
রাত্রির উৎসব জাগালে দীবসেই, তাই তো তন্দ্রায় ভুবন ছায়
রাত্রির গুণ সব দিনেরে দিলে দান, তাই তো বিচ্ছেদ দ্বিগুণ, হায়;
ইন্দ্রের দক্ষিণ বাহু সে তুমি দেব! পূজ্য! লও মোর পূজার ফুল,
পুষ্কর বংশের চূড়া সে তুমি মেঘ! বন্ধু! দৈবের ঘুচাও ভুল!
নিষ্ঠুর যক্ষেশ, নাহিক কৃপা লেশ, রাজ্যে আর তার বিচার নেই
আজ্ঞার লঙ্ঘন করিল একজন, শাস্তি ভুঞ্জান্ দুজনকেই!
হায় মোর কান্তার ছিল না অপরাধ, মিথ্যা সয় সেই কতই ক্লেশ,
দুর্ভর বিচ্ছেদ অবলা বুকে বয়, পাংশু কুন্তল, মলিন বেশ।
বন্ধুর মুখ চাও, সখা হে সখা যাও, দুঃখ দুস্তর তরাও ভাই
কল্যাণ-সংবাদ কহিয়ো কানে তার, হায়, বিলম্বের সময় নাই;
বৃন্তের বন্ধন আশাতে বাঁচে মন, হায় গো, বল্ তার কতই আর?
বিচ্ছেহ-গ্রীষ্মের তপেতে সে শুকায়, যাও হে দাও তাহে সলিল্-ধার।
নির্মল হোক পথ,---শুভ ও নিরাপদ, দুর-সুদুর্গম নিকট হোক্,
হ্রদ, নদ, নির্ঝর, নগরী মনোহর, সৌধ সুন্দর জুড়াক চোখ;
চঞ্চল খঞ্জন-নয়না নারীগণ বর্ষামঙ্গল করুক্ গান,
বর্ষার সৌরভ, বলাকা কলরব, নিত্য উৎসব ভরুক্ প্রাণ্!
পুষ্পের তৃষ্ণার করহ অবসান, হোক বিনিঃশেষ যূথীর ক্লেশ,
বর্ষায় হায় মেঘ! প্রবাসে নাই সুখ,---হায় গো নাই নাই সুখের লেশ,
যাও ভাই একবার মুছাতে আঁখি তার, প্রাণ বাঁচাও মেঘ! সদয় হও;
"বিদ্যুৎ-বিচ্ছেদ জীবনে না ঘটুক", বন্ধু! বন্ধুর আশিষ্ লও।।
‘কালবৈশাখী’
-কাজী নজরুল ইসলাম
বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হল রে পুব-হাওয়ায়,
দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়,
কে পাগল সেথা যাস হাঁকি –
‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’
হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়।
সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারি নে, হায়।।
কালবৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল
ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ওই সনাতন দাওয়া, ভগ্ন চাল।
এলে হেথা কালবৈশাখী
মরা গাঙে যেত বান ডাকি,
বদ্ধ জাঙাল যাইত ভাঙিয়া, দুলিত এ দেশ টালমাটাল।
শ্মশানের বুকে নাচিত তাথই জীবন-রঙ্গে তাল-বেতাল।।
কালবৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে
সিন্ধু-শকুন বসিত না আসি ভিড় করে আজ নদীতীরে।
জানি না কবে সে আসিবে ঝড়
ধুলায় লুটাবে শত্রুগড়,
আজিও মোদের কাটেনিকো শীত, আসেনি ফাগুন বন ঘিরে।
আজিও বলির কাঁসর-ঘন্টা বাজিয়া ওঠেনি মন্দিরে।।
জাগেনি রুদ্র, জাগিয়াছে শুধু অন্ধকারের প্রমথ-দল,
ললাট-অগ্নি নিবেছে শিবের ঝরিয়া জটার গঙ্গাজল।
জাগেনি শিবানী – জাগিয়াছে শিবা,
আঁধার সৃষ্টি – আসেনিকো দিবা,
এরই মাঝে হায়, কালবৈশাখী স্বপ্ন দেখিলি কে তোরা বল!
আসে যদি ঝড়, আসুক, কুলোর বাতাস কে দিবি অগ্রে চল।।