ছবি সংগৃহীত

কৃষক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ভাষা আন্দোলন - দৈনিক বণিক বার্তা

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২৩:১৪
আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ২৩:১৪

(প্রিয়.কম) ১৯৪৭-এ দেশভাগের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলা। প্রবলভাবে নাড়া দেয় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে। পূর্ব বাংলায় খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। ১৯৫১ সালে তা দুর্ভিক্ষের আকার পরিগ্রহ করে। এ অঞ্চলের অর্থনীতি যেহেতু কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই কৃষকদের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়ে।

‘কৃষক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ভাষা আন্দোলন’ শীর্ষক দৈনিক বণিক বার্তা জানায়, মুসলিম লীগ সরকারের কৃষকবিরোধী চরিত্রও স্পষ্ট হতে থাকে। ছাত্রদের বড় অংশ কৃষি পরিবার থেকে আসায় কৃষকদের এ ক্ষোভ তাদেরও আন্দোলিত করে। এ নিয়ে ঢাকায় বিভিন্ন শহরে সভা আয়োজন করতে থাকেন ছাত্রনেতারা। দেশভাগের আগে শুরু হওয়া কৃষকদের যে সংগ্রাম, তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে ছাত্র-বুদ্ধিজীবীদের গড়ে তোলা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন।

পূর্ববঙ্গে জমিদারি প্রথাবিরোধী কৃষক আন্দোলন শুরু হয় ভারতভাগের আগেই। তেভাগার দাবিতে ওই আন্দোলনে ব্যাপক আলোড়ন ওঠে কৃষকদের মধ্যে। পাহাড়ি অঞ্চলে ফসলের খাজনা বা টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধেও জঙ্গি আন্দোলন হয়। ’৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলেও পূর্ববঙ্গের কৃষকের অবস্থার উন্নতি হয়নি। হাজং, টঙ্ক, নানকারসহ পরপর ঘটে যাওয়া অনেকগুলো বিদ্রোহের স্মৃতি তখনো অম্লান। নাচোলের সংগ্রাম ও খাপড়া ওয়ার্ডের ঘটনা উন্মোচন করে দেয় মুসলিম লীগ সরকারের চেহারা।

গোটা পূর্ববঙ্গে তখন খাদ্যাভাব। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত জেলার খাদ্যশস্য ঘাটতি এলাকায় স্থানান্তরের জন্য চালু করা হয় কর্ডন প্রথা। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় শেষ পর্যন্ত তা আরো তীব্র খাদ্য সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু কর্ডন বা লেভি নয়, কৃষকের গলায় ফাঁস পরাতে চালু ছিল টঙ্ক, নানকারসহ নানা ধরনের প্রথা। এমনকি কৃষকের গলার সবচেয়ে কঠিন ফাঁস জমিদারি প্রথাও উচ্ছেদ হয়নি তখনো।

১৯৪৮-৫০ এ দুই বছরে পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় কৃষক আন্দোলন দানাবেঁধে ওঠে। ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী জেলায় এসে তা রূপ নেয় সশস্ত্র সংগ্রামে। টঙ্ক প্রথা উচ্ছেদের জন্য লড়াই চালান ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার হাজং সম্প্রদায়ের কৃষকরা। স্থানীয় ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন রাজশাহীর নাচোল অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষকরা।

এসব লড়াই-সংগ্রামের ফলে ১৯৫০ সালের দিকে এসে টঙ্ক ও নানকার প্রথা উচ্ছেদ করে সরকার। একই বছর বিলুপ্ত হয় জমিদারি প্রথা। কিন্তু এসব আন্দোলন-সংগ্রামে গ্রেফতার হওয়া রাজবন্দিদের ওপর মুসলিম লীগ সরকার যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়, তাও ছাত্র-বুদ্ধিজীবীসহ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দূরে ঠেলে দেয়।

১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত একটানা তীব্র খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষাবস্থা কৃষকসহ জনগণের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, সেটা ভাষা আন্দোলনের সময় গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। দুর্ভিক্ষ চলাকালে নিজ নিজ এলাকায় কৃষকদের খোঁজখবর নিয়েছেন ছাত্রনেতারা। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সভা-সমাবেশও হয়। কোথাও কোথাও আবার ছাত্রদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে প্রতিরোধ কমিটি।

বরিশালে ছাত্রদের উদ্যোগে, বিশেষত ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে একটি দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। সরকার সমর্থক মুসলিম ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যান্য সংগঠন এ কমিটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। এ কমিটির কাজ শহরকেন্দ্রিক হলেও শহরের বাইরে যেসব উদ্বৃত্ত ধান-চাল জোতদার ও চোরাকারবারিদের কাছে জমা ছিল, সেগুলোর খবরাখবর তারা সংগ্রহ করত। সেখানে গিয়ে উদ্বৃত্ত ধান-চাল স্থানীয় গরিব কৃষকদের মধ্যে কিছুটা বিতরণও করত তারা। ট্রাকে করে কিছু অংশ আবার শহরে এনে খাদ্য বিভাগের হাতে তুলে দেয়া হতো।

এ ছাত্ররাই পরে গড়ে তোলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। স্বাভাবিকভাবেই তাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে কৃষক সংগ্রামের একটা যোগ ছিল। ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তত্কালীন রাজনীতি’ বইয়ের ভূমিকায় বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর  উল্লেখ করেছেন, ‘১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন যে সীমিত এলাকায় ঘটেছিল এবং আন্দোলন তখন ছাত্র-শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে যেভাবে সীমাবদ্ধ ছিল, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেইভাবে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

দ্বিতীয় পর্যায়ের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে, তা শ্রমিক কৃষক ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্তের এক ব্যাপক গণপ্রতিরোধ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়ে সমগ্র পূর্ব বাঙলায় এক অদৃষ্টপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।’

দেশভাগের পর ১৯৫১ সালের দিকে এসে ব্যাপক হারে হ্রাস পায় কৃষির প্রকৃত মজুরিও। ১৯৪৭ সালে যেখানে কৃষি শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি ছিল গড়ে ২ টাকা ৩৬ পয়সা, চার বছরের মাথায় তা নেমে দাঁড়ায় ২ টাকায়। অন্যদিকে চালের দাম ২০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি মণ ৩০-৩৫ টাকা। অথচ চালের দাম বাড়লেও কৃষকরা তার কোনো সুফল পাচ্ছিলেন না লেভি প্রথার কারণে।

এ প্রথার মাধ্যমে সরকার নির্দিষ্ট মূল্যে কৃষক ও ভূস্বামীদের উদ্বৃত্ত ধান কিনে নিত। উদ্বৃত্ত এসব ধান সরকারের কাছে বিক্রি করা ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু এর জন্য কৃষক সরকারের কাছ থেকে যে দাম পেতেন, তা ছিল প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। আবার লেভি হিসেবে নেওয়া ধান তথা কৃষকের উদ্বৃত্ত নির্ধারিত হতো সরকারি কর্মচারীদের খেয়ালখুশিমতো। এক্ষেত্রে কৃষকের পরিবারের প্রয়োজনকে কোনোভাবে বিবেচনাই করা হতো না। ফলে সারা বছরের জন্য যথেষ্ট ফসল ফলিয়েও নিজের প্রয়োজনীয় খোরাক জোগাড় হতো না কৃষকের।

প্রিয় সংবাদ/আলম