ছবি সংগৃহীত

হারেম সিক্রেটস (পর্ব-১)

priyo.com
লেখক
প্রকাশিত: ১০ মে ২০১৬, ১২:১৩
আপডেট: ১০ মে ২০১৬, ১২:১৩

ছবি : সংগৃহীত।
(প্রিয়.কম) প্রিয় পাঠকদের জন্য আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে রণক ইকরাম-এর ইতিহাসিভিত্তিক নন ফিকশন সিরিজ ‘হারেম সিক্রেটস’। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

[বৈচিত্র্য আর রহস্যে ভরা অতীতের কাঁধে ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক সভ্যতা। পেছন ফিরে তাকালে যুগে যুগে মানুষের বিচিত্র সব জীবনাচরণ, রীতি রেওয়াজ, সংস্কৃতি, স্থাপত্য আমাদের চমকে দেয়। ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আগের দিনের রাজা-বাদশাদের নানা কীর্তিকলাপ এখনো মানুষের মুখে মুখে। এসবের অনেক কিছু যেমন ঐতিহাসিক প্রমাণে ভাস্বর, আবার  অনেক কিছুই নেহায়েত মানুষের কল্পনাপ্রসূত। কোনো কোনো রীতি আবার স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পাল্টেছে নিজের রঙ। হারেমের কথাই ধরা যাক। অন্তঃপুরের নারীদের থাকার জায়গা হিসেবে যার শুরু, এর বিবর্তন কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে ‘হারেম’ সব সময়ই ছিল মানুষের চিরন্তন আগ্রহের কারণ। তুর্কি সাম্রাজ্যে থেকে আলোচনায় আসা নারীকেন্দ্রিক এ রীতিকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুঘল সম্রাটরা রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তবে হারেম মানেই কেবল রাজা-বাদশাদের মনোরঞ্জনের জায়গা নয়, পেছনে রয়েছে অনেক গল্প অনেক কাহিনি। অটোমান সম্রাজ্য থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাজ্য কিংবা তারও আগে হিন্দু রাজ্যের উপপত্নী রাখার প্রথা সবই যেন এক সূত্রে গাঁথা। এই সিরিজ মূলত সেই রহস্যের জট খোলার জন্যই।]


মানুষের সৃষ্টির পর থেকেই দুটি বিষয় সর্বজনবিদিত। একটি হচ্ছে পেটের ক্ষিধে আর আরেকটি হচ্ছে জৈবিক তাড়না। এ দুটোর জন্য মানুষের কোনো শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষুধার্ত মানুষমাত্রই খাবারের সন্ধানে উন্মুখ হয়ে পড়বে। যৌন ক্ষুধার ক্ষেত্রেও কিন্তু মানুষ অনেকটাই লাগামহীন। যৌনতা ধর্মীয়ভাবে নির্দিষ্ট নিয়মের গণ্ডিতে স্বীকৃত। সেই নিয়মের বাইরের যৌনতাকে সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা ধর্ম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সেই আদিকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সমাজব্যবস্থাতেও যৌনতা কখনোই সীমাবদ্ধতা মানেনি। স্বকীয় প্রয়োজনে গোপনীয়তা মেনেই আদিম মনোবাসনা পূরনের অভিপ্রায়ে ব্যস্ত থাকে সংশ্লিষ্ট সবাই। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অবাধ যৌনাচার সমর্থন করে না। কিন্তু আগের দিনের রাজা বাদশাদের জন্য এটি ছিল রাজসিক রীতি। সেই রীতির আধার ছিল রমণী আর অবকাঠামো ছিল হারেম। যদিও হারেমের উৎপত্তি, গঠন, আর বিকাশের ধারায় বারবার পাল্টেছে তবু  ‘হারেম’ বলতেই কেমন যেন একটা নিষিদ্ধ সুবাস নাকে লাগে। চোখের সামনে ফোটে ওঠে বিলাসবহুল এক মনোহর দৃশ্য। যেখানে অপূর্ব সব সুন্দরীরা তাদের রাজার মনোরঞ্জনে ব্যস্ত। সঙ্গীত-নৃত্যকলাতো বটেই প্রয়োজনে কামকলা প্রদর্শনেও আপত্তি নেই তাদের। হারেম শব্দের সঙ্গে তাই মিশে আছে গোপন তৃপ্তির অচেনা ঢেঁকুর।  হারেমের এই অবয়বের পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের অটোমান সাম্রাজ্যের। তাদের রাজকীয় হারেম আর বিলাসবহুল জীবনযাত্রা মানুষকে মোহিত করেছে। কেবল বিনোদন আর মনোরঞ্জনই নয় অটোমান প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হারেমের নারীরা। অটোমান সংস্কৃতির এই রহস্যময় শব্দ দূর প্রাচ্য থেকে সূদুর পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্রই তৈরি করেছে গোপন আগ্রহ। সব জায়গার মানুষের কাছে এক গোপন আগ্রহের বিষয়। কিন্তু গোপন আগ্রহ সব সময়ই ভয়ঙ্কর। গোপন বিষয় নিয়ে মানুষ সত্যের কাছাকাছি থাকার চেয়ে কল্পনার আশ্রয়ে বসবাস করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বেশি। আর এজন্যই বাড়ির রমনীদের আলাদা থাকার জায়গার পরিচয় হারিয়ে মানুষের কাছে হারেম হয়ে ওঠেছে বিলাসবহুল মনোরঞ্জনকেন্দ্র। কিন্তু আসল রহস্য কী?

স্টিফেন সেডলাকের আঁঁকা ‘হারেম ডান্সারস’। অটোমান হারেমে অল্পবয়সী মেয়েদের নাচ-গান থেকে শুরু করে যৌনদাসী  হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

হারেম আসলে কী
‘হারেম’ শব্দটিকে কখনো কখনো ‘হেরেম’ও বলা হয়। তবে মূল অর্থ একই। ‘হারেম’ (Harem) শব্দটি তুর্কি হলেও হিব্রু হেরেম এবং গ্রিক  হারেমিও এর সমগোত্রীয় শব্দ এটি। আবার তুর্কি শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ থেকে। আরবি ‘হারাম’ শব্দ থেকেই হেরেমের উদ্ভব। আরবি ‘হারাম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিষিদ্ধ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা। তুর্কি ভাষায় হারেম বুঝানো হয়েছে মহিলাদের বসবাসের নিরাপদ স্থান যেখানে পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ।  হিব্রু ভাষায় হেরেম (Harem)-এর অর্থও একই। গ্রিক শব্দ হেরেমি এর অর্থ গোত্রচ্যুতকরণ।
মূলত আরবি ‘হারাম’ শব্দটিকে তুর্কীরা খানিকটা সহনীয় করে হারেম এ পরিণত করে। এরপর যোগ করে ‘লিক’। ফলে তুর্কি শব্দটি দাঁড়ায় ‘হারেমলিক’। বাড়ির যে অংশে মহিলারা থাকে তুর্কীতে সেই স্থানকে ‘হারেমলিক’ বলা হয়। এই উপমহাদেশে হারেম নামে পরিচিত হলেও ইউরোপীয়দের কাছে হারেম হচ্ছে ‘সেরালিয়ো’। এখানে ইতালিয়ান ও ফারসি ভাষার অদ্ভুত এক সম্মিলণ ঘটেছে। ইতালিয়ান ভাষায় ‘সেররালিয়োন’ মানে হচ্ছে ‘বন্য প্রাণীর খাঁচা’। ‘সেররালিয়ো’ এসেছে ফারসি ‘সেরা’ থেকে। তবে ফারসি ‘সরা’ ও ‘সরাই’ মানে হচ্ছে ভবন বা প্রাসাদ বিশেষ। মূলত এই শব্দের সঙ্গে মিলিয়েই এমন অদ্ভুত নামকরণ। অবশ্য  ১৬৩৪ সালে হারেম শব্দটি ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়।
তবে সব শব্দের অর্থ মোটামুটি একই ধরনের, যার অর্থ নিষিদ্ধ। অন্যভাবে বললে এর অর্থ হচ্ছে নিষিদ্ধ বা গোপনীয় স্থান। রাজপ্রাসাদের যে আলাদা অংশে  শাসকের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা, নারী কর্মচারী, উপপত্নী প্রমুখ বাস করতেন  তা হারেম, হারিম বা হেরেম নামে অভিহিত হতো। বহিরাগতদের হারেমে প্রবেশ  নিষিদ্ধ ছিল। হারেমকে মহল, জেনানা,  হেরেম-সারা, হেরেম-গাঁ, মহল-সারা, রানীবাস ইত্যাদি নামেও আখ্যায়িত করা হতো।

জন ফ্রেডেরিক লুইসের আঁঁকা ‘লাইফ ইন দ্য হারেম’।

হারেমের উদাহরণস্বরূপ বাদশা আকবরের অন্দরমহলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
মুঘল আমলে জেনানা বা হারেম ছিল রাজপ্রাসাদের একটি গুরুত্বপূর্ন অংশ। আবুল ফজলের লেখা বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ ‘আকবরনামায়’ এর বিবরণ পাওয়া গেছে। ‘আকবর এক বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত ভবন তৈরি করিয়েছিলেন— যেখানে তিনি প্রায়ই বিশ্রাম নিতেন। তার হারেমে পাঁচ হাজারেরও বেশী রমণী ছিল— যাদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত ছিল আলাদা-আলাদা কক্ষ। এতে বোঝা যায়, গোটা সেরাগোলিয়োতে যত জন রমণী কমপক্ষে ততটি কক্ষ ছিল।’
সেখান থেকে আরো জানা যায়— এই নারীদের মধ্যে বেগম, দাসী বা সেবিকা ছিলেন। এক এক দলের বেগমের ওপর এক এক  কাজের ভার দেওয়া ছিল। আবার এক এক দল বেগমের কাজ দেখার জন্য স্ত্রী দারোগা নিযুক্ত ছিল। প্রত্যেক বেগমের জন্য মাসিক পারিশ্রমিকের ব্যবস্থাও ছিল। বেগমের সর্বশ্রেষ্ঠ দলের বয়স-রূপ ও গুণ অনুসারে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের হেরেম থেকে নিয়ে আলাদা বাসস্থান দেওয়া হতো।বেগমদের কারও কোনো সামগ্রী লাগলে তারা হারেমের কোষাধ্যক্ষের কাছে আবেদন করত। হারেমে ব্যবহারের  জন্য আলাদা রকমের মুদ্রা ছিল যা বাইরে পাওয়া যেত না। এ রকম করেই একেক  রাজবংশ ও একেক রাজার রাজত্বে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও রং নিয়ে পরিচালিত হয়েছে হারেম।

হারেমের নারীরা কবুতরদের খাবার দিচ্ছে। ছবিটি জন লিও জেরমের আঁঁকা

প্রচলিত ধারণা বনাম ভ্রান্তি

হারেম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। আর সেই  অনুসারে হারেমের কথা কল্পনা করলেই আমাদের মনে রানী, উপপত্নী, নর্তকী, গায়িকা ও দাসীর ছবি ভেসে ওঠে। আর সেই সঙ্গে নিষিদ্ধ সব কীর্তিকলাপের রগরগে চিত্র ফুটে ওঠে। কিন্তু বাস্তবের ব্যাপারটি ছিল আরও সংযত এবং স্বাভাবিক। স্বাভাবিক এই অর্থে যে তখনকার সময়ে একজন রাজার অনেক পত্নী আর উপপত্নী থাকাটাই ছিল রীতি। নিজের দাস-দাসী কিংবা পছন্দের পাত্রীদের রাজা যেমন ইচ্ছা তেমন করেই ব্যবহার করবেন এতেও অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না। তবে যে বিষয়টি অনেকেই জানেন না সেটি হলো মুসলিম হারেম কেবলমাত্র বাড়ির কর্তার সাথে যেমন মহিলার যৌণ সম্পর্ক (স্ত্রী ও উপপত্নী) রয়েছে সে সব মহিলাদের জন্যই নয়, বরং সেখানে তাদের সন্তানসন্ততি ও অপরাপর মহিলা আত্মীয়স্বজনও থাকতে পারে। আরবি ভাষায় হুরমাহ (Hurmah) এর বহুবচন হারিম (Harim) যার অর্থ বিত্তশালী ও উচ্চপদে আসীন পরিবারের প্রধানের স্ত্রী বুঝানো হতো। কিন্তু কালক্রমে ইরাকি আরবি ভাষায় এর অর্থ দাঁড়ায় জাতিবর্ণ নির্বিশেষে যেকোন মহিলা। অর্থাৎ হারেমে রানী-দাসী আর উপপত্নী ছাড়াও আরও অনেক মহিলাদের বসবাস ছিল। এর মধ্যে সম্রাটের মা, সৎ মা, কন্যা, তার মহিলা আত্মীয়-স্বজনরা উল্লেখযোগ্য। আরেকটি ব্যাপার হলো বড় হওয়া নাগাদ ছেলেরাও হারেমে অবস্থান করত। তাছাড়া ছিল সঙ্গিনী, দাসী, বাঁদি, মহিলা কর্মচারী ও প্রহরী। সম্রাট হারেম দেখাশোনা করার জন্য তাদের নিয়োগ দিতেন। খোজা প্রহরীরা হারেমের চারদিকে পাহারা দিতেন। শুধু তাই নয়, পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকজন মহিলা ও খোজা প্রহরী গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতেন। তারা হারেমে অবস্থানকারী মহিলাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্রাটকে অবহিত করতেন। মোটকথা  হেরেম কেবল রাজাদের চিত্তবিনোদনের কেন্দ্রস্থলই ছিল এমন ধারণা একদমই ঠিক নয়। বরং বলা চলে হারেম ছিল রাজার কাছের সব মহিলাদের নিরাপদে রাখার জন্য একটি সুরক্ষিত স্থান। আর একই স্থানে রাজার চিত্তবিনোদনের জন্য কঙ্কুবাইন  কিংবা রক্ষিতাদেরও রাখা হতো।

কার্লা কোকোর বই সিক্রেটস অব দ্য হারেম-এর কভার

উৎপত্তি ও বিকাশ
হারেমের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে ইসলাম ধর্মের মূল নীতি। ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী পরপুরুষের সামনে নারীদের উপস্থিতি নিষেধ। মূলত অন্তঃপুরের নারীদেরকে নিরাপদে আলাদা ও ঘরের ভেতরে রাখা এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষার জন্যই ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ শব্দটির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মহিলাদের জন্য যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে এর অধিকাংশই কিন্তু তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে করা। ‘হারেম’ এর এই প্রথাও কিন্তু মহিলাদের নিরাপত্তার নিমিত্তেই শুরু করা হয়েছিল। অনেকেই একে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর। পুরুষের তুলনায় শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে পরিশ্রমী কাজগুলোতে ইসলাম নারীদের পুরুষের সাহায্য নিতে বলেছে। আবার পুরুষ ও নারীদের জীবনাযাত্রার ধরনেও আছে ভিন্নতা। একজন নারীকে তার প্রাত্যহিক জীবনে অনেকগুলো স্তর পার করতে হয়। যেমন মাসিক, গর্ভবতী হওয়া, সন্তান জন্মদান, সন্তানের পরিচর্যা ইত্যাদি। এসব কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য তাদেরকে আলাদা স্থানে থাকাটা জরুরি। এর বাইরে বলা হয়ে থাকে মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে থাকেন। তাই তাদেরকে সহজেই ভুল বোঝানো কিংবা প্রতারণার ফাঁদে ফেলা যায়। এছাড়া নারীদেরকে পুরুষের কামনা-বাসনা থেকেও নিজেদের নিরাপদে রাখতে হয়। একজন পুরুষের ন্যায় নারী তার বাড়িতেও প্রকাশ্যে তার কাপড়-চোপড় পরিধান করতে পারে না। পুরুষের মতো অনেকটা প্রকাশ্যে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পারেন না নারীরা। এমনকি নিজেদের ব্যক্তিগত কাজগুলো করার জন্যও তাদের গোপনীয়তার দরকার পড়ে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে নারীদের জন্য আলাদা একটি বসবাসের স্থানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। যেখানে পুরুষের প্রবেশ নিষেধ থাকবে। মূলত সেই ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা থেকেই হারেম এর উৎপত্তি। ইসলাম ধর্ম অবাধ যৌনাচার নিষিদ্ধ থাকলেও রাজা-বাদশারা সেই নীতির পথে পা-ই রাখেননি। ফলে হারেমের অর্থ আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে। হারেম শব্দের সব ব্যাখ্যাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেয় মূলত আদিকাল থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত নানান রাজ্যের হারেমখানা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো হয়ে ওঠেছিল বহু নারীকে ভোগের নির্ধারিত স্থান। হারেমের আচরণ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হারেমখানার প্রতি অতি আসক্তির কারণে অনেক রাজা তাদের রাজ্য হারিয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন কিন্তু তাদের বিকৃত রুচি আর যৌন-জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আরেকদল ঐতিহাসিক মনে করেন হারেমের এই বিকৃতির পেছনে দায়ী মূলত পুরুষের বহুগামিতার অভ্যাস। এক পুরুষ কর্তৃক বহু নারীভোগের বিষয়টি কিন্তু নতুন নয়। খুব প্রাচীনকাল থেকেই এর চর্চা হয়ে আসছে। এমনকি সনাতন আমলেও এ ধরনের চর্চার উল্লেখ আছে। বেদ-উত্তর কালে ব্রাহ্মণ্য উপনিষদে (আনুমানিক ৫০০ পূর্বাব্দ) এর রেশ পাওয়া যায়। বুদ্ধের আবির্ভাবের আগে পূর্বাব্দের পঞ্চম শতকে পুরুষদের বহুগামিতা প্রচলিত ছিল বিশেষভাবে। ‘মহাপদ্মজাতক;- এ ১৬ হাজার রমণী-অধ্যুষিত এক রাজকীয় সেরালিয়োর উল্লেখ আছে। ঠিক ১৬ হাজার রমণীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু রীতি কিন্তু হারেমের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। আর এই উল্লেখ প্রাকবৌদ্ধ যুগে ‘ইত্থাগারা’ থাকার এক অকাট্য প্রমাণ। অবন্তীর রাজা প্রদ্যোৎ মগধের রাজ্য বিম্বিসার (আনুমানিক ৫৪৬-৯৪ পূর্বাব্দ) ও তার পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের রাজাদের শাসনামলে একই ধরনের প্রথার উল্লেখ আছে ওই বৃত্তান্তে।

হারেমের উৎপত্তি নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও অধিকাংশের মতানুসারে এর উৎপত্তি মূলত প্রাচ্যেই। তবে ধরনে পার্থক্য থাকলেও তৎকালীন আরো অনেক দেশেই হারেমের প্রচলন ছিল। দক্ষিণ এশিয়াতে হারেমের মতোই প্রথা রয়েছে যা ‘পর্দা’ কিংবা ‘জেনানা’ নামে পরিচিত। আবার কোনো কোনো রাজ্যে হারেম বা পর্দা না থাকলেও রাজা কিংবা অভিজাতদের মনোরঞ্জনের জন্য রক্ষিতাদের ব্যবস্থা ছিল। কোনো কোনো সমাজে আবার এদেরকে গণ্য করা হতো উপপত্নী হিসেবে।

তবে সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারেমের ধারণাটিরও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আবার তুর্কি সাম্রাজ্য হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত  পৌঁছতে গিয়েও বিবর্তিত হয়েছে। আগের দিনের রাজা-বাদশাদের হেরেম থাকত। কারও কারও দরবারে এই হারেম ছিল পরিবারের নারী সদস্যদের আবাসস্থল। পাশাপাশি থাকত নিষিদ্ধ সুবাস গ্রহণের সুযোগ। সেখানে রাজার বিনোদনের জন্য  প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হতো। আর মদ আর নৃত্যগীতের আসর জমত। অসংখ্য রমণীদের মাঝ থেকে রাজা যখন ইচ্ছা তাকে ভোগ করতে পারতেন। এ নারীদের বাইরেও ক্ষেত্র বিশেষে রাজার অনেক উপপত্মী আর দাসী থাকত। থাকত সংগীতশিল্পী এবং নৃত্যশিল্পীরাও। আর এদের সবার সমন্বিত আবাসস্থল ছিল একটি হারেম। তবে  হেরেমের ধারণাটি মুসলমান রাজা এবং অন্য ধমের্র রাজাদের ক্ষেত্রে স্বকীয় পার্থক্য বহন করে।

একই ধারার দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম প্রতিষ্ঠান হলো জেনানা (Zenana)। জেনানার আভিধানিক অর্থ ‘নারী সম্পর্কিত’। এর সংজ্ঞায়ন করলে অনেকটা হারেমের অর্থই দাঁড়ায়। সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম পরিবারে বসতবাড়ির একটি অংশ যা কেবল নারীদের জন্যই নির্ধারিত এটাই জেনানা। অর্থাৎ এটি হচ্ছে বাড়ির অন্দরমহল যেখানে পুরুষদের প্রবেশ খুব বেশি রকম নিয়ন্ত্রিত। পুরুষদের জন্য আবার আলাদা অঞ্চল ছিল যার নাম মার্দানা। সাধারণভাবে বলা যায় মার্দানাতে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নেই।

১৮৬৭ সালে ইতালিতে আঁঁকা ফ্রান্সিসকো হায়েজের ‘ইনসাইড দ্য হারেম’।
রোমান উপাখ্যানেও হারেমের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে হারেম সম্পর্কে বলা হয়েছে খুব বিলাসবহুল একটি প্রাসাদ কিংবা কয়েকটি প্রসাদের একটি কমপ্লেক্স, যেখানে অনেক লোকের বসবাস যাদের প্রত্যেকেই মহিলা কিংবা খোজা। এদের কাজ হচ্ছে রাজা ও রাজপরিবারের বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করা। এদের প্রত্যেকেই মূলত দাসশ্রেণির। এই প্রসাদ প্রহরায় রয়েছে খোজা পাহারাদার। পরবর্তীতে অটোমান শাসনামলে হারেমের পরিবর্তন আনা হয় এবং হারেমের আদলে পুরুষের জন্য আলাদা স্থান বা সেলামিল্ক (Selmlik) তৈরি করা হয়। অটোমান সাম্রাজ্য হারেম পরিচিত ছিল সেরাগ্লিয়ো (Seraglio) নামে। সেরাগ্লিয়োতে অটোমান সম্রাটের স্ত্রী ও উপপত্নীরাই বসবাস করতেন। সঙ্গে থাকতেন রাজার মনোরঞ্জনের জন্য কঙ্কুবাইন ও দাসীরা। যুবরাজদের বয়স ৭ বছর হওয়া পর্যন্ত তারা সেরাগ্লিয়োতে থাকতে পারতেন। সুলতান ব্যতীত অপরাপর সকল পুরুষের সেরাগ্লিয়োতে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সেলামিল্ক ও সেরাগ্লিয়ো উভয়ই পরিবারের একটি অংশ হিসেবেই বিবেচিত হত।
অটোমান আমলে হারেমের উদ্দেশ্য ছিল রাজপরিবারের কন্যা শিশুদেরকে প্রচলিত সাংস্কৃতিক ধারায়  ও সঠিক শিক্ষায় বড় করা। হারেমের আরো একটি উদ্দেশ্যে ছিল—কন্যা  শিশুরা যেন সেখানে অবস্থানরত মহিলাদের নিকট হতে রাজকীয় আদর্শ শিখতে পারে এবং ভবিষ্যতে যেন কোন রাজকীয় ও বিখ্যাত ব্যক্তির স্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। এখানে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাও গ্রহণ করতে হতো। কারণ ভবিষ্যতে রাজপরিবারের স্ত্রী হয়ে তাকে জনগণের সম্মুখে আসার প্রয়োজন হতে পারত।



তথ্যসূত্র:
দি অটোমান সেঞ্চুরিজ- লর্ড কিনারস
অটোমান হারেমের নারীরা— আশরাফ উল ময়েজ
হারেম- লাভ টু নো ১৯১১ এনসাইক্লোপেডিয়া
দ্য প্রাইভেট ওয়ার্ল্ড অব অটোমান ওমেন- গুডউইন গডফ্রে
হারেম- জন দেলপ্ল্যাটো
ইনসাইড দ্য সেরাগেলিও- প্রাইভেট লাইভস অব সুলতানস ইন ইস্তাম্বুল
হারেম- শ্রীপান্থ
উইকিপিডিয়া ও রিলেটেড ওয়েবসাইটস

    [চলবে]