ছবি সংগৃহীত
সর্প নৃত্যের বাদ্যযন্ত্র "বীণ"
আপডেট: ২৪ মে ২০১৩, ০৯:২৫
দৃশ্য-১ : নায়ক বিষধর সাপের ছোবলে মৃত্যুপথযাত্রী। খবর পেয়ে বেদেনী নায়িকা ছুটে এলো এবং বাজাতে শুরু করলো বীণ! বীণের মন্ত্রমুগ্ধকর সুরে নায়ককে কামড় দেয়া সাপটি আবার ফিরে এলো এবং নায়কের শরীর থেকে বিষ তুলে নিয়ে চলে গেল। দৃশ্য-২ : নায়িকা মণিধারী নাগিনী। খলনায়ক সাপুড়ে বা বেদে তার বীণ বাজানো শুরু করতেই নাগিনী নায়িকা ছুটে এলো এবং বীণের সুরের মন্ত্রবশবর্তী হয়ে তালে তালে নাচা শুরু করলো! উপরের ঘটনা দুটি খুব পরিচিত মনে হচ্ছে, না? হওয়াটাই স্বাভাবিক! কারণ এমন দৃশ্য সিনেমাতে আমরা হরহামেশাই দেখে থাকি। বিশেষ করে আশির দশকে সাপের কাহিনী নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে প্রচুর! এবং সেসব সিনেমায় সাপুড়ে ও বীণ যেন ছিল সিনেমার মূল আকর্ষণ! বাস্তবক্ষেত্রেও বীণ একটি আকর্ষণীয় বাদ্যযন্ত্র। ফুঁ দিয়ে বাজাতে হয় বলে এটি Wind Instrument বা শুষির শ্রেণীর বাদ্য। সাপ সারা বিশ্বে থাকলেও বীণের ব্যবহার দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বেদে সম্প্রদায় বা সাপুড়েরা বীণ বাজিয়ে সাপ ধরে এবং বীণ বাজিয়েই সাপের খেলা দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করে। এই কথা প্রচলিত যে, বীণের সুর সাপের মনে মন্ত্রের মতো কাজ করে। ফলে সাপ এর টানে ছুটে আসে বা এর তালে তালে নাচে। মজার ব্যাপার হলো, সাপ আসলে শুনতেই পায় না! কারণ সাপ শ্রবণযন্ত্রের ওপরে রয়েছে চামড়ার আচ্ছাদন। তবে সাপ খুব মৃদু শব্দেরও কম্পন টের পায় এবং সতর্ক হয়ে যায়। আমরা দেখি যে সাপ খুব ঘন ঘন জিভ বের করে। আসলে এই জিভের সাহায্যেই সে শব্দের কম্পন টের পায়। অনেক সময় বীণের শব্দের কম্পনের কারণেই সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসে। আপনি হয়তো ভাবছেন যে, সাপ যদি শুনতেই না পায় তাহলে বীণের সুরের তালে নাচে কেন? খেয়াল করলে দেখতে পাবেন সাপুড়ে বীণ বাজানোর সময় ডানে-বামে, উপর-নিচে বিভিন্নভাবে বীণ দোলায়, এমনকি সুরের তালে সে নিজেও দোলে! সাপের দৃষ্টি ও যাবতীয় মনোযোগ বীণের দিকে থাকায় সে বীণের নড়াচড়া অনুযায়ী নিজেও নড়াচড়া করে। এটাকেই সাপের নাচ বলে মনে হয়। বীণের আসল নাম কিন্তু তুবড়ি! যদিও এটা বীণ নামেই বেশি পরিচিত। অঞ্চলভেদে কোথাও বীণের নাম 'তিক্তিরী' ও 'পুঙ্গী' নামে পরিচিত। বীণ তৈরি করা হয় শুকনা লাউ দিয়ে, যা 'বস' নামে পরিচিত। বস-এর শুকনো খোলের ভেতর একজোড়া বাঁশি সংযোজন করা হয়। বীণ বাজানোর জন্য বাঁশির ছিদ্রে আঙুল দিয়ে বাতাস চেপে ধরে সৃষ্টি করা সুর বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফুঁ দেয়া বাতাস খোলের মধ্যে প্রবেশ করে, যা আঙুল দিয়ে চেপে চেপে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই বাঁশির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ফুঁ বন্ধ করার সাথে সাথে এর শব্দ থেমে যায় না। খোলের মধ্যে বায়ু সঞ্চিত থাকে বলে বাঁশির শব্দ অবিরত থাকে। যার কারণে পরবর্তী ফুঁ দেয়ার জন্য অনায়াসে শ্বাস নেয়া যায়। বীণ একটি বহুল পরিচিত বাদ্যযন্ত্র হলেও তেমন একটা জনপ্রিয় নয়। বেদে বা সাপুড়ে ছাড়া এ বাদ্যযন্ত্র অন্যরা খুব একটা ব্যবহার করে না। সঙ্গীতে এর ব্যবহার কদাচিত্ হয়। আমাদের দেশেও বেদে সম্প্রদায় ছাড়া অন্যদের বীণ ব্যবহার করতে দেখা যায় না।
- ট্যাগ:
- লাইফ
- জীবন চর্চা