
ছবি সংগৃহীত
বাংলার স্বাধীনতার সূর্য আসলে অস্ত গিয়েছিল কবে- ১৭৫৭ সালে, নাকি ১২০৬ সালে?
আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৪, ১২:০৮
সৈয়দ মীর মুহম্মদ জাফর আলী খান। তার কারণেই আমরা বিশ্বাসঘাতকদের ডাকি ‘মীর জাফর’ নামে। বিষয়টা আমাদের কাছে গালির মতো হয়ে গেছে। কিন্তু মীর জাফর কি আসলেই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন? এমন না যে, আমি এখানে মীর জাফরের সাফাই গাইতে এসেছি। আমার এই আলোচনার মূল বিষয়, বাংলার স্বাধীনতা। বাংলার স্বাধীনতা বিষয়ে কথা বলতে গেলে কয়েকটা বিষয় অবশ্যই আলোচনা করতে হবে। হয়তো এই বিষয়ে গ্রন্থের পর গ্রন্থ রচনা করা যাবে। এখানেই আমার যতো সমস্যা। আমি বেশিরভাগ সময় জটিল বিষয়কে ছোট পরিসরে আলোচনা করতে গিয়ে আরো জটিল করে তুলি। আজ আমাদের ‘স্বাধীনতার সূর্য কবে অস্তমিত হলো’ এর মতো একটি জটিল বিষয়ও ছোট পরিসরে আলোচনা করতে চাইছি। জানি না, হয়তো আজ আমি আরো জটিল করে তুলবো এই প্রসঙ্গ! স্বাধীনতার বিষয়টা আলোচনা করতে গেলে আমাদের অন্তত যেতে হবে রাজা লক্ষণ সেনের আমলে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিমলগ্নে পাল রাজবংশের অবসান ঘটিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ অধ্যায়। বাংলার পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র 'সামন্তচক্রের' বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। সেন রাজারাই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজয় সেনের পুত্র ছিলেন বল্লাল সেন। আর বল্লাল সেনের পুত্র রাজা লক্ষণ সেন। তিনি তাঁর রাজত্বকে কামরূপ (বর্তমানে আসাম), কলিঙ্গ (বর্তমান উড়িষ্যা) এবং কাশী পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ১২০৬ সালে দিল্লী সালতানাতের তুর্কী সেনা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাহিনীর হাতে গৌড়ের পতন হয়। লক্ষণ সেন প্রাণ নিয়ে তৎকালীন বঙ্গে পালিয়ে যান এবং তার সৈন্যরা পরাজিত হয়ে নদিয়া শহর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ছিলেন জাতিতে তুর্কি আর পেশায় ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। জীবনের প্রথম ভাগে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী। এর অর্থ দাঁড়ায় তিনিও ইংরেজদের মতো ভীনদেশী। তাহলে আমরা কেন বলি, ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গেছে? স্বাধীনতার সূর্য তো আসলে অস্ত গেছে ১২০৫-৬ সালে খলজী বাহিনীর ছায়ায়। এরপর বাংলা তথা গোটা উপমহাদেশ শাসন করেছে ভীনদেশী শাসকরা। একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই আমরা সকল সম্রাট আর রাজাদের আদিনিবাস জানতে পারবো। এবার একেবারে চলে আসি নবাব সিরাজদ্দৌলা প্রসঙ্গে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার মাতামহ ছিলেন নবাব আলীবর্দী খাঁ। তাঁর প্রকৃত নাম মির্জা মুহাম্মদ আলী। তার পিতার নাম মির্জা মুহাম্মাদ। আরব বংশোদ্ভূত মির্জা মুহাম্মদ ছিলেন আজম শাহের (আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় পুত্র) দরবারের একজন কর্মকর্তা। আলীবর্দী খাঁ পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে আজম শাহ তাকে পিলখানার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৭০৭ এর যুদ্ধে আজম শাহের মৃত্যুর পর চাকরি চলে যায় মির্জা মুহাম্মদ আলীর। তিনি ও তার পরিবার সমস্যার সম্মুখীন হন। বাকি জীবনের জন্য তিনি সপরিবারে ১৭২০ সালে বাংলায় চলে আসেন। কিন্তু বাংলার তৎকালীন নবাব মুর্শিদকুলী খান তাকে গ্রহণ করেননি। বাংলায় ঠাঁই না পেয়ে মির্জা মুহাম্মদ আলী চুতাকে গমন করেন। সেখানে সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন। মাসিক ১০০ রুপি বেতনের চাকরি দেওয়া হয় তাকে। তার কাজ ও বিশ্বস্ততায় খুশি হয়ে মির্জা মুহাম্মদ আলী পদোন্নতিও পান। বিশেষ করে সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান তাকে ওড়িষ্যার কিছু জমিদারির তদারকি দান করেন। ওড়িষ্যাতে সন্তোষজনক দ্বায়িত্ব পালন ছাড়াও সুজাউদ্দিনের শ্বশুর মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর বাংলার মসনদ রক্ষায় সুজাউদ্দিনকে মির্জা মুহাম্মদ আলী সাহায্য করেন। ফলশ্রুতিতে তাকে চাকলা আকবরনগর (রাজমহল) এর ফৌজদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৭২৮ সালে তাকে আলীবর্দি উপাধি দেওয়া হয়। ১৭৩২ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহ বিহারকে বাংলা সুবার অধীনে নিয়ে আসেন। এদিকে নবাব সুজাউদ্দিন আলীবর্দিকে বিহারের নিজাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিছু দিন আগে আলীবর্দির কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগম তার কনিষ্ঠ ভাতিজা জৈনুদ্দিন আহমেদ খানকে বিয়ে করেন। আমিনা বেগমের গর্ভেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয়। আলীবর্দি খাঁ যখন পাটনার শাসনভার লাভ করেন, তখন আমেনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজ উদ দৌলা) -এর জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এদিকে আলীবর্দী খাঁ’র কোনো পুত্র ছিল না। তাই সিরাজই হন তাঁর উত্তরাধিকার। এতো এতো আলোচনার কারণ, আমি আসলে পাঠককে পরিষ্কার করতে চাইছি- কীভাবে সিরাজউদ্দৌলা শাসন ক্ষমতা পেলেন এবং তাঁর শেঁকড় কোথায়। যদিও তিনি বাংলাতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, কিন্তু তিনি কোনোমতেই বাঙালি ছিলেন না। এমনকি তিনি বাংলার মানুষের ভাষায় কথাও বলতেন না। অতএব তাঁকে আমরা স্বদেশি শাসক বলে গ্রহণ করতে পারি না। এদিকে যদি আমরা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র আলোচনায় আসি, তাহলে মীর জাফরকে কিছুতেই একা দায়ী করতে পারি না। মানবসভ্যতা যেদিন থেকে সাম্রাজ্যবাদের দিকে অগ্রসর হলো, সেদিন থেকেই প্রাসাদ রাজনীতির জন্ম। এরই একটা খণ্ডিত চিত্র মীর জাফরের কর্ম। বিশ্বাসঘাতকতার কাঠগড়ায় যদি দাঁড় করাতে হয়, তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বাগ্রে থাকবেন সম্রাট অশোক। তিনি ছিলেন তার বাবার সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান। বাকি সকল বড় ভাইদের খুন করেই তিনি সিংহাসনে চড়ে বসেছিলেন। এছাড়া এরপরেই আমরা মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকেও দাঁড় করাতে পারি। তিনি তাঁর পিতা সম্রাট শাহজাহানকে বন্দি করে সিংহাসন দখল করেছিলেন। সম্রাট আকবরের বোন-জামাইও এই কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন। মীর জাফরের বিষয়টা খুব সংক্ষেপে যদি বলি- বাংলার শাসন দখলের জন্য তিনি ইংরেজদের সহায়তা নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নবাবের প্রধান সেনাপতি। পলাশীর যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থেকে তিনি যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, তা বাংলার জনগণের সাথে নয়, নবাব পরিবারের বিরুদ্ধে। সাহায্যের বিনিময়ে ইংরেজদের শুল্কমুক্ত ব্যবসা এবং যুদ্ধের খরচ রাজকোষাগার থেকে পরিশোধ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি কোনোমতেই ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটাননি। তিনি অগণতান্ত্রিক রাজ্য ব্যবস্থায় শুধুমাত্র ক্ষমতার পালাবদলের পথেই হেঁটেছিলেন নিজেকে মসনদে দেখতে। ক্ষমতার লোভ মানুষের জন্মগত। এবং এই লোভের জন্য মানুষ যুগে যুগে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। কিন্তু আমাদের কাছে মীর জাফর এতো বড় বিস্ময়সূচক চিহ্ন হয়ে থাকার একমাত্র কারণ- আমরা মনে করি, তার কারণেই আমাদের পরাধীনতা বরণ করতে হয়েছে। আমরা যারা এই ধারণায় একদম শক্তপোক্ত, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি- সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজরা ব্যবসা ফেলে শাসনের দিকে তাদের লোভাতুর হাত প্রসারিত করলো, তখন মীর জাফর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং পরাজিত হন। এক ভীনদেশি অপর ভীনদেশির কাছে পরাজিত হয়। এখানে বাংলা কী হারালো বা কী পেল, তা মূখ্য নয়। বাংলার কাছে যা মূখ্য, তা তো বিলীন হয়েছে ১২০৫-৬ সালেই খলজী বাহিনীর তোড়ে। ১৭৫৭ সাল গুরুত্ব পেতে পারে, কারণ এই সালে বাংলায় ইংরেজ শাসনের পথ প্রসারিত হতে শুরু করে, যা গোটা উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা পায় ১৭৮৫ সালের দিকে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের রাজা লক্ষণ সেনের কাছেই যেতে হবে। আমরা ইতিহাসে পড়ি, আমরা পরাধীন ছিলাম দু’শ বছর। আসলেই কি তাই? আমরা তো আসলে পরাধীন ছিলাম প্রায় সাড়ে সাতশ’ বছর। এখন হয়তো অনেকেই তেড়ে আসতে পারেন, ইংরেজদের অত্যাচার আর সম্রাট-নবাবদের উন্নয়ন কর্ম নিয়ে বিতর্ক করতে। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, শুধু নবাব-সম্রাটরাই উন্নয়ন করেননি, ইংরেজরাও উন্নয়ন করেছে এই উপমহাদেশে। উপমহাদেশে রেলওয়ে চালু করেছিল কে? ব্রিটিশরা। উপমহাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল কে? ব্রিটিশরা। উপমহাদেশে শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছিল কে? ইংরেজরা। শাসক যতোই শোষণ করুন না কেন, তার দ্বারা কিছু উন্নয়ন সাধন হবেই। এটা সব শাসকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অতএব আমার এই আলোচনায় থাকবে শুধুই স্বাধীনতার প্রশ্ন। এবং তা আমরা হারিয়েছি সাড়ে সাতশ’ বছর আগে ১২০৫-৬ সালে। অথচ ইতিহাস বইতে লেখা ইতিহাস আমাদের কতভাবেই না ধোঁকা দিচ্ছে! [নোট: সকল পাঠককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলছি, এখানে আমি কোথাও বলিনি রাজা লক্ষ্মণ সেন বা সেন বংশ বাঙ্গালি ছিলেন। আমি স্বাধীনতার প্রশ্নে ১২০৬ সালে গিয়ে দাঁড়াতে বলেছি, বলে এই নয় যে, সেখানেই আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত গেছে। আমার লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার হতে সকল পাঠককে আমার পরবর্তী লেখাগুলো পড়ার আহ্বান জানাচ্ছি।] (এই বিভাগে প্রকাশিত মতামতের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে)
- ট্যাগ:
- বাংলাদেশ