ছবি সংগৃহীত
বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের ধারাগুলো
আপডেট: ০৩ মে ২০১৩, ১০:৪৭
বাংলা সাহিত্যের শেকড় প্রথিত রয়েছে বাংলার লোকসাহিত্যে। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে বাংলাদেশের লোকসাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এখনো রাখছে। যদিও এর সৃষ্টি হয়েছে তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষদের দ্বারা এবং প্রসার ঘটেছে মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তবুও এই লোকসাহিত্য বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ, দান করেছে ব্যাপ্তি। লোকসাহিত্যের মাধ্যমে প্রকাশ ঘটেছে গ্রামবাংলার মানুষের ভালবাসা, আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার। লোকসাহিত্যের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয় গ্রামবাংলার মানুষের জীবন দর্শন। বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের পরিধি অনেক বিস্তৃত, এর শাখা-প্রশাখা অগণিত। বাংলার লোকসাহিত্যের মধ্যে রয়েছে লোকগান, ছড়া, যাত্রা, প্রবাদ, লোকগল্প ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশের একেক স্থানের লোকসাহিত্যের ধারা একেক রকম। কোনোটার সাথে কোনোটার যে একেবারেই মিল নেই, তা নয়। তবে প্রত্যেক অঞ্চলের লোকসাহিত্যের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট। কখনো গ্রামীণ সমাজের পালা-পার্বণ হয়েছে এসব সাহিত্যের মূল বিষয়, আবার কখনো আর্থসামাজিক আবহ প্রভাবিত করেছে বাংলার লোকসাহিত্যকে। এক কথায় বলা যায়, বাংলার লোকসাহিত্য ছিল গ্রামীণ জীবনের আয়না। গ্রামীণ সমাজের সুখ-দুঃখের কাহিনীই বর্ণিত হয়েছে বাংলার লোকসাহিত্যে। আসুন, জেনে নিই বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের ধারা সম্পর্কে - লোকগান : বাংলা গান ঐতিহ্যগতভাবেই কথানির্ভর। গানে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গত থাকে মৃদু। লোকগানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভালবাসা, বিরহ, দর্শন প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করে গানগুলো সৃষ্টি হয়। লোকগানেরও রয়েছে নানা প্রকার। যেমন - জারিগান, ভাওয়াইয়া, সারিগান, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, বাউলগান, কবিগান ইত্যাদি। প্রতিটি ধরনের গানের কথা, তাল-লয় ও সুরের রয়েছে নিজস্বতা। গীতিকা বা গাথা : বাংলা লোকসাহিত্যের গীতিকা বা গাথার সাথে পশ্চিমা সাহিত্যের 'ব্যালাড'-এর রয়েছে অনেক মিল। তবে বাংলাদেশের গীতিকা বা গাথার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। এগুলোর মধ্য নাথ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গীতিকায় বিভিন্ন আঞ্চলিক কাহিনী ছন্দে ছন্দে বর্ণিত থাকে। অন্যান্য লোকসাহিত্যের মতো গীতিকা বা গাথাও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। পরে ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে এগুলোকে লিখিত রূপ দেয়া হয়। লোকগল্প : বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের একটি অন্যতম শাখা হলো লোকগল্প। এসব গল্পের বিষয় হিসেবে এসেছে কখনো রূপকথার রাজা-রানি, কখনো ধর্মীয় প্রসঙ্গ, আবার কখনো পৌরাণিক ঘটনা। তবে বাংলা লোকগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে ভাগ্যের টানাপোড়েন ও জাদুকরি ছোঁয়ার আধিক্য পাওয়া যায়। যাত্রা : বাংলা লোকসাহিত্যের সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় শাখা হলো যাত্রাপালা। গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের সব উপকরণই এতে বিদ্যমান। এতে আছে কাহিনী, নাচ, গান ও অভিনয়ের সমন্বয়। এসব যাত্রার মূল উপজীব্য হিসেবে পাওয়া যায় পৌরাণিক বা ধর্মীয় কোনো কাহিনী, কিংবদন্তি ব্যক্তির জীবনকাহিনী, সামাজিক জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদি নানা বিচিত্র বিষয়। বাংলাদেশের যাত্রাপালার জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে রাম-সীতা, বেহুলা-লখিন্দর, অর্জুন-দ্রৌপদী, রূপবান ইত্যাদি। ছড়া : ছড়া বাংলা লোকসাহিত্যের খুবই আকর্ষণীয় একটি শাখা। অল্প কথা, সুরে ও ছন্দে ছড়া গাঁথা হয়। মূলত ছোট্ট শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্যেই গড়ে উঠেছিল লোকসাহিত্যের এই শাখা। ছড়া মাধ্যমে ছন্দে-কথায় গ্রামবাংলার শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেয়া হতো। এছাড়া জীবনাচরণের জন্য সাধারণ শিক্ষাও শিশুরা এসব ছড়া থেকে লাভ করত। এখনো বাঙালি সমাজের শিশুদের মধ্যে ছড়ার আবেদন আগের মতোই আছে। প্রবাদ : লোকসাহিত্যের সবচেয়ে ছোট আকারের উপাদান হলো প্রবাদ। এটি প্রাচীনতমও বটে। মানুষের নানা অভিজ্ঞতা, বিবেচনা এবং প্রজ্ঞার ভিত্তিতে রচিত হতো এসব প্রবাদ। অনেক প্রবাদই বেদ, উপনিষদ ও চর্যাপদে পাওয়া যায়। তবে এগুলো বাংলা প্রবাদের প্রাচীন রূপ।
- ট্যাগ:
- লাইফ
- জীবন চর্চা