ছবি সংগৃহীত
দাসপ্রথা-দাসবৃত্তি বিলুপ্তকরণে ইসলামের ভূমিকা
আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৪, ০২:৫০
দাসপ্রথার উদ্ভব কীভাবে হলো, তার কোনো প্রামাণ্য দলিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু বলা যায়, সম্ভবত যুদ্ধজয়ের সামগ্রীরূপেই দাস শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। দাস কথাটি শুনলেই মনে ভসে ওঠে এক করুণ ছবি হাটে-বাজারে মানুষ কেনাবেচার দৃশ্য। প্রাচীন ও মধ্যযুগে দাসপ্রথা বৈধ ছিল। গ্রিস ও রোমান সাম্রাজ্য দাসপ্রথার ওপর গড়ে উঠেছিল। আরবেও ছিল দাসপ্রথা। দাসদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার ছিল না। ইসলাম আগমনের পর দাসপ্রথার প্রচলন কমতে শুরু করে। হজরত রাসুলুল্লাহ [সা.] দাস-দাসীর প্রতি মানুষের অধিকার প্রদান করেন। তিনি দাসপ্রথা উচ্ছেদে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। হজরত খাদিজা [রা.]-এর সঙ্গে তার বিয়ের সময় আরবের তৎকালীন রীতি অনুযায়ী হজরত যায়েদ [রা.]-কে দাস হিসেবে দেয়া হয়। কিন্তু হজরত রাসুলুল্লাহ [সা.] তাকে মুক্ত করে দেন। দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অল্প কিছুক্ষণ পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে, ইসলামের আগমন ঘটেছে এমন অবস্থায় যে, দাসত্ব একটি আন্তর্জাতিক প্রথা, যা বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও জাতির নিকট স্বীকৃত; বরং দাসত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকভাবে প্রচলিত জরুরি বিষয়, যাকে কোনো মানুষ অপছন্দ করত না এবং তা রদবদল করার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে কেউ চিন্তাও করত না। আর পূর্বে আমরা আরও আলোচনা করেছি যে, ইসলামপূর্ব সময়ে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে দাসত্বের উৎসধারা বা উৎপত্তিস্থলসমূহ ছিল বিভিন্ন প্রকৃতির, বিভিন্ন পদ্ধতির এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সংবলিত !! এমতাবস্থায় ইসলাম কী করেছে? ইসলাম প্রাচীনকালের দাসত্বের উৎস্থলসমূহ থেকে একটি ব্যতীত বাকী সবগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে; আর সে একটি উৎস বন্ধ না করার কারণ হচ্ছে, এ উৎসটি বন্ধ করা তার আওতাধীন ছিল না; কারণ, সে সময়ে যুদ্ধবিগ্রহের ময়দানে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল স্বীকৃত ছিল যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত দাসত্বের প্রথাটি। আর তাই যে উৎসটি ইসলামে অবশিষ্ট ছিল, তা হলো যুদ্ধের মাধ্যমে সংঘটিত দাসত্ব। কিতাবুশ্ শুবহাত (كتاب الشبهات) নামক গ্রন্থের লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী সেই সময় বহুল প্রচলিত ও প্রভাব বিস্তারকারী প্রথা ছিল, যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী বানানো অথবা তাদেরকে হত্যা করা। [ তারীখুল আলম ( تاريخ العالم ) নামক ঐতিহাসিক বিশ্বকোষের ২২৭৩ পৃষ্ঠায় এসেছে, যার ভাষ্য হল: “৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে রোমানীয় সম্রাট মুরীস তার অর্থলোভের কারণে খান আল-আওয়ার এর হাতে বন্দী হাজার হাজার যুদ্ধবন্দীকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনতে অস্বীকার করে; ফলে খান আল-আওয়ার তাদের সকলকে হত্যা করে। ] আর এই প্রথা ছিল খুবই প্রাচীন, যা ইতিহাসের অন্ধকার যুগেরে গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তা প্রথম মানুষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনের উপক্রম হতে পারে; কিন্তু তা মানবতার জন্য তার বিভিন্ন ধাপে নিত্য সঙ্গী হয়ে পড়ে। মানুষের এই পরিস্থিতিতে ইসলামের আগমন ঘটল এবং ইসলাম ও তার শত্রুগণের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল; ফলে মুসলিম যুদ্ধবন্দীগণ ইসলামের শত্রুদের নিকট গোলাম বা দাসে পরিণত হলো, অতঃপর হরণ করা হলো তাদের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি এমন দুঃখ-কষ্ট ও যুলুমের শিকার হতে লাগল, যে আচরণ ঐ সময় দাস-দাসীদের সাথে করা হত !! ইসলামের পক্ষে সেই সময় সম্ভব ছিল না যে, তার হাতে শত্রুদের মধ্য থেকে যারা যুদ্ধবন্দী হবে তাদেরকে সাধারণভাবে ছেড়ে দেওয়া; আর এটা সুন্দর রাজনৈতিক দর্শনও নয় যে, তুমি তোমার শত্রুকে তার যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে তোমার ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করবে, যখন তোমার পরিবার, তোমার আত্মীয়-স্বজন ও তোমার দীন-ধর্মের অনুসারীগণ ঐসব শত্রুগণের নিকট লাঞ্ছনা, অপমান ও শাস্তির শিকার। এমতাবস্থায় সেখানে সমান নীতি অবলম্বন করাটাই অধিক ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, যার প্রয়োগ শত্রুতা প্রতিরোধে সক্ষম হবে, বরং এটাই একমাত্র ও অনন্য নিয়ম। ইসলাম প্রাচীনকালের দাসত্বের উৎস্থলসমূহ সামগ্রিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে; তবে একটি মাত্র উৎস ছাড়া, আর তা হলো শরীয়ত সম্মত যুদ্ধে বন্দী হওয়া যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করার উৎস, যখন মুসলিমগণের ইমাম এই দাস-দাসী বানানোর মধ্যে কল্যাণ আছে বলে মনে করেন। আর ইমামের জন্য সুযোগ বা অধিকার রয়েছে যে, তিনি (যুদ্ধবন্দীদেরকে) দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণের নীতি অনুসরণ করতে পারবেন, যখন যুদ্ধসমূহে দাস-দাসী বানানোর প্রথাকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বিশ্ব সন্ধি-চুক্তি করবে, যেই কাজটি করেছেন ওসমানী সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ র. এই বিবেচনায় যে, ইসলাম তাকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেনের ব্যাপারে চারটি বিষয়ে সুযোগ দান করেছে: অনুকম্পা প্রদর্শন, অথবা মুক্তিপণ আদায় করা, অথবা হত্যা করা, অথবা দাস-দাসী বানানো সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ইসলাম, মুসলিম ও সমস্ত মানবতার কল্যাণের দিক বিবেচনা করে এর মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে নির্বাচন করার এখতিয়ার রাখেন। ইসলাম মানবজাতির জন্য শান্তির পয়গাম। জীবনের সব পর্যায়ে তাই শান্তির বার্তা শোনায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবজাতির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম ঘৃণিত দাসপ্রথা বিলোপে উদ্যোগী হয় এবং দাসমুক্তিতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে হজরত রাসুলুল্লাহ [সা.] ঘোষণা দেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান দাসকে মুক্ত করবে, (মুক্ত দাসের) প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তার (মুক্তিদানকারীর) প্রত্যেক অঙ্গকে দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দান করবেন।[মিশকাত] কিভাবে ইসলাম দাস-দাসীকে মুক্তি দিয়েছে? দাস-দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে ইসলাম যে শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে, তা নিম্নোক্ত পদ্ধতি বা ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক. উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান : ইসলাম মনিবদেরকে দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে প্রচণ্ডভাবে এবং যথেষ্ট পরিমাণে মনিবদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে; আল্লাহ তাআলা বলেন, “তবে সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি। আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, বন্ধুর গিরিপথ কী? এটা হচ্ছে দাসমুক্তি...।” [সূরা আল-বালাদ: ১১ – ১৩] অন্যদিকে যেসব হাদিসে দাস-দাসী মুক্ত করার ফযিলত ও মর্যাদা বর্ণনা এসেছে এবং দাস-দাসী মুক্তিদানকারী ব্যক্তির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে, সেগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি, গণনার বাইরে; আমরা উদাহরণস্বরূপ তন্মধ্য থেকে সাধ্যমত কিছু উপস্থাপন করেছি, ইবনু জারির রহ. আবূ নাজীহ [রা.] থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “যে কোনো মুসলিম পুরুষ কোনো মুসলিম পুরুষ (গোলাম) কে আযাদ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রত্যেকটি অস্থির বিনিময়ে তার এক একটি অস্থিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। আর যে কোনো মুসলিম নারী কোনো মুসলিম দাসীকে আযাদ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রত্যেকটি অস্থির বিনিময়ে তার এক একটি অস্থিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।” - [মুসনাদে আহমদ]। খ. কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান : আর দাস-দাসী মুক্ত করার ক্ষেত্রে শরীয়ত সম্মত উপায়সমূহের মধ্য থেকে এটা একটা অন্যতম মহান উপায়; আল-কুরআনুল কারীম কাফ্ফারা স্বরূপ দাস-দাসী মুক্ত করার জন্য অনেক বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেছে, শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড ও প্রকাশ্য এসব গুনাহের মধ্য থেকে কোনো একটিতে মুসলিম ব্যক্তি জড়িয়ে গেলে (তার উপর এই ধরনের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে)। আর অধিকাংশ অপরাধ ও শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড এমন, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন ও বাস্তব জীবনকে পরিবেষ্টন করে আছে!! ... সুতরাং যখন দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়া হবে এসব অপরাধ ক্ষমার অন্যতম উপায়, তখন এর অর্থ হবে- ইসলামী সমাজে দাস-দাসীদের একটা বিরাট সংখ্যার মুক্তির ব্যাপারে ইসলাম দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে !! ... আপনাদের সামনে আল-কুরআনুল কারীমের বক্তব্যের আলোকে কাফ্ফারার মাধ্যমে দাস-দাসী আযাদ করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় তুলে ধরা হল : ভুলবশত হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা; আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে এক মুমিন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা কর্তব্য ।” [সূরা আন-নিসা: ৯২] যদি এমন সম্প্রদায়ের কাউকে হত্যা করা হয়, যাদের সাথে আমরা পরস্পর অংগীকারাবদ্ধ, তবে সে ক্ষেত্রে হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা; আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর যদি সে এমন সম্প্রদায়ভুক্ত হয় যাদের সাথে তোমরা অংগীকারাবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা এবং সাথে মুমিন দাস মুক্ত করা কর্তব্য।” [সূরা আন-নিসা: ৯২] গ. লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দান : এটা দাস-দাসীর জন্য মুক্তি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, যখন সে নিজেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হবে এবং সেই অর্থের ব্যাপারে গোলাম ও মনিব ঐক্যমত পোষণ করবে যে, গোলাম কিস্তিতে তা মনিবকে পরিশোধ করে দেবে; অতঃপর যখন সে তা পরিশোধ করবে, তখন সে স্বাধীন হয়ে যাবে; আল্লাহ তাআলা বলেন, “... আর তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি চাইলে, তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দান কর।” [সূরা আন-নূর: ৩৩] ঘ. রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে মুক্তি দান : দাস-দাসীর মুক্তির ক্ষেত্রে এটাও অন্যতম মহান উপায়, বরং এটা হলো ইসলামী সমাজে এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দাস-দাসীর মুক্তির ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ উপায়সমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। আর ইসলাম রাষ্ট্রের জন্য যাকাতের অর্থ থেকে দাস-দাসীর মুক্তির জন্য বিশেষ খাত নির্ধারণ করে দিয়েছে; এই খাতকে আল-কুরআনুল কারীম " وَفِي ٱلرِّقَابِ " (দাসমুক্তির) খাত নামে নামকরণ করেছে; মুসলিম রাষ্ট্রে দাস-দাসীদের মুক্ত করার জন্য এই খাত সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “সদকা তো শুধু ফকীর, মিসকীন ও সদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবা: ৬০] সুতরাং ইসলামের ইতিহাসের গৌরবময় দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অন্যতম একটি দিক হল: খলিফাদের যুগে যখনই দরিদ্র ও অভাবীদের অভাব পূরণ করে বাইতুল মালের অর্থ অতিরিক্ত হত, তখনই বাইতুল মালের কোষাধ্যক্ষ দাস-দাসী বিক্রেতাদের হাট থেকে গোলামদেরকে ক্রয় করতেন এবং তাদেরকে মুক্ত করে দিতেন। ঙ. সন্তানের মা (উম্মুল অলাদ) হওয়ার কারণে মুক্তি দান : অনুরূপভাবে এটাও দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায় এবং নারী জাতিকে সম্মান দানের ব্যাপারে ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম মহান কীর্তি। আর এটা দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায়; কারণ, দাসী যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকে, তখন সেই মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার সাথে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করার মত মেলামেশা করা বৈধ আছে; ফলে যখন দাসী তার (মনিবের) জন্য সন্তান প্রসব করবে এবং সেও সন্তানকে তার সন্তান বলে স্বীকৃতি দেবে, তখন সে শরীয়তের দৃষ্টিতে উম্মুল অলাদ (সন্তানের মা) হয়ে যাবে; আর এই অবস্থায় মনিবের উপর তাকে বিক্রি করা হারাম হয়ে যাবে; আর যখন সে তার জীবদ্দশায় তাকে আযাদ না করে মৃত্যুবরণ করবে, তখন তার মৃত্যুর পর সে সরাসরি স্বাধীন হয়ে যাবে। আর পূর্ববর্তী যুগসমূহের মধ্যে কত দাসীই না এই পদ্ধতিতে (দাসত্ব থেকে) মুক্তি লাভ করেছে? ! আর কত নারী দাসীই না স্বাধীনতা অর্জনের মত নিয়ামত দ্বারা ধন্য হয়েছে, যখন তারা উম্মুল অলাদ বা সন্তানের মা হয়েছে? ! অনুরূপভাবে এটা নারী জাতিকে সম্মান দানের ব্যাপারে ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম মহান কীর্তি; কারণ, নারী যখন অমুসলিম রাষ্ট্রে যুদ্ধের সময় বিপক্ষ শক্তির মালিকানায় চলে আসে, তখন তার সম্মান লুটের মালের মত ব্যভিচারের পন্থায় প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য বৈধ হয়ে যায়, বরং সে হয়ে যায় সম্মান হারা, সস্তা পণ্য ও অধিকার বঞ্চিত ...। আর তাকে ইসলামী শাসনব্যবস্থার ছায়াতলে দাসী বানানোর দ্বারা ইসলামের পূর্বে সে যেসব অপমান, অপদস্থ ও অসম্মানের শিকার হয়েছে, তা পরিবর্তন হয়ে গেছে ... সুতরাং ইসলাম তার অধিকার সংরক্ষণ করেছে এবং তার মান-সম্মান ও মর্যাদাকে রক্ষা করেছে। চ. নির্যাতনমূলক প্রহারের কারণে মুক্তি দান : আর কোনো ফকীহ তথা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মতে এটাও দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায়; আর তাদের মধ্যে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও রয়েছেন। আর আমরা পূর্বে এমন নিয়মনীতি আলোচনা করেছি, যা দাস-দাসীর সাথে আচার-ব্যবহারের পদ্ধতি হিসেবে ইসলাম প্রণয়ন করেছে; সুতরাং মনিবের জন্য তার ও তার দাস-দাসীর মাঝে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এই মজবুত নিয়মনীতি থেকে বের হয়ে যাওয়া বৈধ হবে না; বরং এই সম্পর্কটি ভালবাসা, অনুকম্পা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক হবে ... যাতে দাস-দাসী তার নিজস্ব অস্তিত্ব ও মানবতাকে অনুভব করতে পারে এবং সে জানতে পারে যে, সে অন্যান্য মানুষের মতই সৃষ্ট মানুষ, তার সম্মান পাওয়া ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের কাউকে যখন তার গোলামকে নির্যাতন ও প্রহার করতে এবং তাকে অপমান-অপদস্থ করতে দেখতেন, তখন তিনি তার প্রতিবাদ করতেন; সহীহ হাদিসের মধ্যে রয়েছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আবূ মাসউদ [রা.] কর্তৃক তার গোলামকে প্রহার করতে দেখলেন, তারপর তিনি তাকে নিন্দা করে বললেন: “হে আবূ মাসউদ! জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এই গোলামের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিতে তোমার উপর সর্বশক্তিমান।” দাসদের ব্যাপারে এমন ঘোষণার প্রেক্ষিতে কোনোরূপ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াই অসংখ্য দাস মুক্তি পেয়ে যায়। হজরত আবুবকর সিদ্দিক [রা.] বহু দাস ক্রয় করে মুক্তি দিয়েছেন। এর প্রায় হাজার বছর পর বিভিন্ন ধাপে আইন প্রণয়ন করে দাসপ্রথার বিলোপ সাধন করা হয়। আমরা জানি, জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান। তাদের রয়েছে জীবন ও স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। এ অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আশার কথা হলো, দাসপ্রথা এখন ইতিহাস। তবে এটা সত্য, দাসরূপী বিভিন্ন কাজের অমানবিকতা থেকে মানবসমাজ এখনো পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি। সে অর্থে দাসপ্রথার বিলোপ হলেও দাসবৃত্তির বিলোপ হয়নি; ধরন পাল্টেছে মাত্র। এ অবস্থারও অবসান দরকার। মাওলানা মিরাজ রহমান