ছবি সংগৃহীত

জেনে নিন মহীয়সী নারী মাদার তেরেসার অজানা কিছু তথ্য

সাবেরা খাতুন
লেখক
প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০১৬, ১৭:২৯
আপডেট: ১২ মার্চ ২০১৬, ১৭:২৯

ফটো সোর্স : www.youtube.com

(প্রিয়.কম)- মাদার তেরেসা নামটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে এমন একজনের প্রতিচ্ছবি যিনি তার সারাটি জীবন অতিবাহিত করেছেন দুঃস্থ মানুষের কল্যাণের জন্য। বিংশ শতাব্দীর ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল হিসেবে গণ্য করা হয় তাকে। তিনি উদারতা ও নম্রতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আসুন আজ এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য জেনে নেই।

১। মাদার তেরাসার আসল নাম অ্যাগনেস গোনযা বোসাক্সহুই। তিনি মেসিডোনিয়ার আলবেনীয় পরিবারে ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন, তবে তিনি ২৭ আগস্ট এই তাঁর জন্মদিন বলা পছন্দ করতেন কারণ সেই দিন তিনি খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাঁর ৮ বছর বয়সে তাঁর পিতা মারা যান এবং তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটে পরে।  

২। তিনি ১৮ বছর বয়সে গৃহ ত্যাগ করেন এবং আয়ারল্যান্ডের রেথফারনহেম এর  সিস্টার্স অফ লরেটো তে যোগদান করেন। তারপরে তিনি আর কখনো তাঁর পরিবারের সাথে দেখা করেন নি।

৩। আয়ারল্যান্ডে এক বছর থাকার পর তিনি ভারতের দার্জিলিং এর সিস্টার্স অফ লরেটো মঠে স্থানান্তরিত হন।

৪। ১৯৩১ সালে তিনি সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন এবং নিজের জন্য তেরেসা নামটি পছন্দ করেন অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনের ঋষি যথাক্রমে থেরেসে অফ লিজিয়াক্স ও থেরেসা অফ এভেলা এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে।

৫। তিনি কলকাতার সেন্ট মেরী হাই স্কুলে ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করেন ১৫ বছর। কিন্তু তিনি নিপীড়িত দরিদ্র মানুষের কষ্টে গভীর পিড়া অনুভব করতেন। ১৯৪৬ সালে দার্জিলিং যাওয়ার পথে তিনি তাঁর অন্তরের ডাক শুনতে পান। তিনি বলেন, “আমি ভেতর থেকে সব কিছু ছেড়ে দেয়ার ডাক শুনতে পেলাম এবং বস্তির অতি দরিদ্র মানুষের সেবা করলেই খ্রিষ্টকে সেবা করা হবে বুঝতে পারলাম”।   

৬। ১৯৪৮ সালে তিনি সন্ন্যাসী জীবন ত্যাগ করে বস্তির জীবনধারাকে গ্রহণ করেন এবং বস্তির একটি খুপরি ঘর ভাড়া করে সেখানে থাকা ও কাজ আরম্ভ করেন।  

৭। ১৯৫০ সালে তিনি মিশনারিজ অফ চ্যারেটি গঠন করেন যা একটি রোমান ক্যাথলিক ধর্মসভা যাদের উদ্দেশ্য- “অন্ন, বস্র ও বাসস্থানহীন, বিকলাঙ্গ, অন্ধ, কুষ্ঠরোগী, সমাজের সকল অবাঞ্ছিত মানুষ, সমাজের বোঝা এবং পরিত্যাজ্য মানুষদের সেবা করার জন্য নিবেদিত”।

৮। তিনি ১৯৬২ সালে পদ্মশ্রী পদক পান এবং ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরষ্কার পান। তিনি নোবেল প্রাপ্তি উপলক্ষে সম্মান ভোজ প্রত্যাখ্যান করেন এবং পুরষ্কারের ১ লক্ষ ৯২ হাজার টাকা ভারতের দরিদ্র মানুষের সাহায্যে ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেন।

৯। তিনি ঝাড়ুদারদের সম্মানার্থে নীল পাড়ের সাদা শাড়ি ও স্যান্ডেল পরতেন।  

১০। ২০০৩ সালে দাপ্তরিক ভাবে তাঁকে কলকাতার ধন্য তেরেসা নামে আখ্যায়িত করা হয়।

১১। তাঁর মৃত্যুর সময়ে তাঁর মিশনারিজ অফ চ্যারিটি বিশ্বের ১২৩টি দেশে ৬১০টি মিশন স্থাপিত হয়। এই মিশন গুলোর মধ্যে ঘরবাড়ি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে যা এইডস আক্রান্ত মানুষদের জন্য, কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা আক্রান্তদের জন্য, শিশু ও পরিবারের পরামর্শ কেন্দ্র,ভোজনশালা, এতিমখানা এবং স্কুল অন্তর্ভুক্ত।

১২। বলা হয় তিনি একজন মহিলার পেটের টিউমার নিরাময় করেছিলেন অলৌকিকভাবে।

১৩। তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগেই তিনি তাঁর নিজের গঠিত মিশনারির প্রধানের পদ থেকে সরে দাড়াতে চেয়েছেন কারণ তিনি ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পরছিলেন এবং নতুন কেউ এই দায়িত্বে আসুক তিনি সেটাই চেয়েছিলেন। তাই তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন যে সদস্যরা তারাই গোপনে ভোটের মাধ্যমে তাঁকে এই পদে বহাল রাখেন।

১৪। ১৯৮৩ সালে পোপের সাথে দেখা করার সময় তিনি প্রথম হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। ছয় বছর পরে তিনি আবার ও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এবং পেস মেকার লাগানো হয়। ১৯৯৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন কিন্তু তারপরে তাঁর অসুস্থতা অনেক বৃদ্ধি পায় এবং সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

১৫। তিনি বিশ্ব ব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন কিন্তু তারপরও তিনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। ক্যাথোলিক চার্চের কিছু মতবাদের বিরোধীতা করেছিলেন তিনি  যেমন- গর্ভনিরোধ ও গর্ভপাতের বিরোধী ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে নোবেল বক্তৃতায় তিনি বলেন, “আমি অনুভব করি শান্তির সবচেয়ে বড় বিনাশকারী হচ্ছে গর্ভপাত”।

১৬। তিনি রক্ষণশীল মনভাবের ছিলেন। বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনঃবিবাহের সাংবিধানিক  নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার বিষয়ে আইরিশ গনভোটে তিনি প্রকাশ্যে না ভোট প্রদান করেন।

১৭। একদিন মাদার তেরেসা তাঁর এতিমখানার শিশুদের জন্য একটি বেকারিতে রুটি চাইতে যান। তিনি যখন তাঁর হাতটি বাড়িয়ে দেন তখন বেকারির লোকটি তাঁর হাতে থুতু দেন। তখন তিনি অন্য হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে লোকটিকে বললেন, “এটা আমি আমার জন্য রেখে দিলাম, কিন্তু আমার শিশুদের জন্য আমাকে কিছু রুটি দিন”। তখন লোকটি মাদার তেরেসার নম্রতা উপলব্ধি করতে পারেন এবং তারপর থেকে সেই লোকটিই হয়ে যায় এতিমখানায় নিয়মিত রুটি দাতা।

মাদার তেরেসার বিখ্যাত কিছু উক্তি-  

“স্নেহের শব্দ খুব ছোট হয় এবং বলাও খুব সহজ কিন্তু এর প্রতিধ্বনি সত্যি অসীম”।  

“আপনি আজ যে ভালো কাজটি করবেন তা হয়তো মানুষ আগামীকালই ভুলে যাবে তারপরও ভালো কাজটিই করুন”।  

“শান্তি শুরু হয় একটি হাসি দিয়ে”

“নেতার জন্য অপেক্ষা করোনা, একাই শুরু কর, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি”।      

লিখেছেন-

সাবেরা খাতুন

ফিচার রাইটার, প্রিয় লাইফ

প্রিয়.কম