ছবি সংগৃহীত

জাপানের ধর্মীয় বৈচিত্র্য (পর্ব- ৪)

প্রবীর বিকাশ সরকার
লেখক
প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০১৫, ০৭:৩০
আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০১৫, ০৭:৩০

বৌদ্ধ ধর্ম জাপান এবং এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যে ভারতবর্ষ তথাগত বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র জন্মস্থান সেখান থেকে তাকে হটিয়ে দেয় ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী ও শাক্তরা---সেই বিলুপ্তপ্রায় ধর্মটির শেষ আশ্রয়স্থল হয় জাপান। নতুন রূপে, নতুন বিনির্মাণে বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। চীন, কোরিয়া হয়ে মহাযান বৌদ্ধধর্ম জাপানে আগমন করে ৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন কোরিয়ার কুদারা রাজ্যের শাসক পায়েকচে বংশের (Paikche, ১৮ খ্রি:পূ:-৬৬০ খ্রি:) রাজা শাক্যমুনির একটি তামার মূর্তি এবং কিছু বৌদ্ধ পান্ডুলিপি জাপানের সম্রাট কিনমেইকে (৫০৯-৫৭১ খ্রি:) উপহার হিসেবে প্রদান করেন। কিনমেই এই ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি হন। কিন্তু অত সহজে বৌদ্ধধর্মকে রাজ্যে প্রবর্তন করা যায়নি। তখনকার শিন্তোও সম্রাটের অধীন জাপানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ছিল শিন্তোও। সম্রাট রাজি হলেও রাজবংশের অন্যান্য এবং প্রধান পুরোহিত, পণ্ডিতরা সম্রাটের অভিপ্রায়ের বিরোধিতা করেন। পরবর্তী শতাব্দীতে সম্রাট কিনমেই এর পর সিংহাসনে উপবিষ্ট হন সম্রাট বিদাৎসু (৫৩৮-৫৮৫ খ্রি:), তিনি ছিলেন নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার বিরোধী। তাঁর পরে সম্রাট য়োমেই (-মৃত্যু ৫৮৭ খ্রি:) তিনিই হচ্ছেন প্রথম জাপানি সম্রাট যিনি বৌদ্ধ ধর্মের উপর একনিষ্ঠ আস্থা স্থাপনকারী ব্যক্তি। তাঁর বংশধর প্রিন্স শোওতোকু তাইশি (৫৭৩-৬২১ খ্রি:) হচ্ছেন জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। অত্যন্ত প্রভাবশালী এই রাজপুত্রের প্রচেষ্টার কারণেই জাপানের সর্বত্র এই ধর্মের প্রসার ঘটে এবং রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গৃহীত হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে তিনি জাপানের রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য অশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনকি জাপানের প্রথম সংবিধান রচনার মূল পরিকল্পকও ছিলেন তিনি। তাঁর আমলে ১৬ ফুট দীর্ঘ তামার বুদ্ধমূর্তিসহ ৪৬টি মন্দির নির্মিত হয়। বৌদ্ধ পুরোহিত এবং সন্ন্যাসিনীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৮১৬ এবং ৫৬৯ জন। তাঁর এই অবদান আজও জাপানিরা ভক্তিভরে স্বীকার করেন। প্রিন্স শোওতোকুর মৃত্যুর পর সম্রাট শোউমু (৭০১-৭৫৬ খ্রি:), যিনি ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ বৌদ্ধ---রাজধানী নারা নগরে তোওদাইজি নামে কাঠের এক মহামন্দির নির্মাণ এবং তার মধ্যে তামার পাতে গিলটি করা মহাবুদ্ধমূর্তি ‘দাইবুৎসু’, ‘দাইবুৎসু নিয়োরাই’ বা ‘বৈরোচন’-বিগ্রহ স্থাপন করেন। এটাই বিশ্বের বৃহৎতম বুদ্ধমূর্তি। এই মূর্তির ‘চক্ষু উন্মীলন’ মহানুষ্ঠানের উদ্বোধন করার জন্য দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণকুলে জন্ম ৩৩ বছর বয়স্ক মহাভিক্ষু বোধিসেনাকে (৭০৪-৭৬০ খ্রি:) আমন্ত্রণ জানানো হয় যদিওবা সম্রাট নিজেই এই অনুষ্ঠানের কাজটি সম্পাদান করার মতো উপযুক্ত ছিলেন। কিন্তু উদারমনস্ক সম্রাট ভারতীয় মহাপুরোহিতকেই আহবান জানান। উল্লেখ্য যে, সম্রাট শোউমু জাপানি বৌদ্ধ পুরোহিত ও ভিক্ষুদেরকে প্রকৃত বৌদ্ধধর্ম ও আচার-আচরণ শিক্ষা দেবার জন্য একজন শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধপণ্ডিতকে খুঁজে বের করার জন্য চীনে দূত পাঠিয়েছিলেন সেখানে ভারতীয় বৌদ্ধ মহাপুরোহিত বোধিসেনার সন্ধান পেলে পরে তাঁকে জাপানে আহবান করা হয়। বোধিসেনা জাপানি সম্রাটের আমন্ত্রণক্রমে একাধিক শিষ্যসহ নারা নগরে আগমন করেন ৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে। সেই সময় একমাত্র সুদৃশ্যমান তোওদাইজি মহামন্দিরের প্রাঙ্গণেই হরিণ চড়ে বেড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয় মূলত শিন্তোও ও বৌদ্ধ ধর্মের রীতি অনুসারে। আজও তা অনুসৃত হচ্ছে। বাঁধা পড়ে এই দু’টি সুপ্রাচীন ধর্ম পরস্পরের সম্প্রীতি এবং বাস্তব্যবিদ্যার আলোকে। বৌদ্ধ ধর্ম আগমনের পর প্রথমদিকে বৌদ্ধ ও শিন্তোওধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কিছুকাল অন্তর্দ্বন্দ্ব বিরাজ করেছিল আরাধ্য ‘কামি’কে কেন্দ্র করে। কারণ দু’টি ধর্মেই ‘কামি’ বা ‘ঈশ্বর’, ‘দেবতা’ ছিল ভিন্নার্থক। আদিকাল থেকেই শিন্তোও ধর্মাবলম্বী জাপানিদের ‘কামি’র কোনো চাক্ষুষ মূর্তি প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা ছিল না। অবশ্য বৌদ্ধ ধর্মেও তথাগতের জীবদ্দশায় মূর্তিপূজা ছিল না তাঁর মহাপরিনির্বাণের পর কুষাণ সম্রাট কনিষ্ককের সময় (১২৭ খ্রি:) হীনযান ও মহাযান দু’টি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়, আর জাপানে আগমন করে মূর্তিপূজক মহাযান শাখা। ফলে বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয় যদিওবা একসময় সামাজিক সহবতের প্রশ্নে এই সমস্যা মিলিয়ে যায়। মূলত জাপানে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বৌদ্ধ ধর্মের পথ প্রশস্ত হয়। যেমনটি হয়েছে গৌতম বুদ্ধের জীবিতকালে প্রাচীন ভারতে। ভারতবর্ষ থেকে যার উদয় সেই তথাগতের বুদ্ধত্বের শেষ স্থিতি এবং বিকাশ ঘটে জাপানি জাতির আবহমান রীতি-নীতি, সংস্কৃতির প্রবাহ ধরে। তাই ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্ম ও জাপানি বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে আচার-অনুষ্ঠানের অনেক তারতম্য বিদ্যমান। কিন্তু মূলগত আধ্যাত্মিক শান্তি, শিক্ষা, মানবিক গুণাগুণ, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মেধাচর্চার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রধান অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘হানা মাৎসুরি’ বা পবিত্র ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ যা গৌতম বুদ্ধের জন্মদিবস---উদযাপিত হয় মন্দিরে মন্দিরে এবং সরকারি কোনো ছুটিও নির্ধারিত নেই এই পবিত্র দিনটির জন্য। কিন্তু ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এই অনুষ্ঠানটি দেখার মতো অপূর্ব সুন্দর। ‘ওবোন’ উৎসবও এদেশের বৌদ্ধধর্মকেন্দ্রিক একমাত্র প্রধান উৎসব---তা কয়েক দিনব্যাপী বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। এই উৎসব মূলত প্রতি বৎসর পূর্বপুরুষের আত্মার পৃথিবীতে শুভাগমন ও শুভবিদায়কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় যাতে ‘হানাবি’ বা ‘আতসবাজি’ পোড়ানো, বিশেষ উপাসনা, খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করাই প্রধান রীতি। তখন থাকে সরকারি ছুটিও। এই দু’টি রীতি ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মে কোনোদিন ছিল না, এখনও নেই বলেই জানি। ‘হানাবি’ এতই বৈচিত্র্যময় প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একটি সংস্কৃতি যা গড়ে তুলতে জাপানি মেধার বিকল্প খুঁজে পাওয়া মুশকিল বলেই ধারণা হয়। এটা বলতে হবে যে, জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বা দল-উপদলে বিভক্ত হওয়ার পরেও একমাত্র সামুরাই সেনাশাসকদের বদৌলতে। আসুকা যুগ তথা সপ্তম শতাব্দীতে সম্রাট তেনজি (৬২৬-৬৭১ খ্রি:) প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে অভিজাত যোদ্ধা শ্রেণী গঠন করেন যারা পরবর্তীকালে ঘটনাক্রমে ‘সামুরাই’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং একসময় রাজকীয় শাসনব্যবস্থা তথা রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করে নিতে সক্ষম হন। তাঁরা ক্রমশ বিভিন্ন গোত্র বা বংশে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ১২ শতাব্দীর দিকে প্রধান তিনটি বংশ ফুজিওয়ারা, মিনামোতো এবং তাইরা’র মধ্যে রাজক্ষমতা দখলের তীব্র দ্বন্দ্ব-লড়াই দেখা দেয়। ১১৮৫ খ্রিস্টাব্দে মিনামোতো ও তাইরা বংশের মধ্যে এক লড়াই বাঁধে তাতে মিনামোতো বংশপ্রধান য়োরিমোতো (১১৪৭-৯৯ খ্রি:) বিজয়ী হয়ে সূচনা করেন কামাকুরা যুগের (১১৮৫-১৩৩৩ খ্রি:); তিনিই প্রথম ‘বাকুফু’ বা ‘শোউগুন’ সরকারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রাজধানী হয় কামাকুরা যা বর্তমান কানাগাওয়া-জেলা এবং এই বংশের আমলেই নির্মিত হয় তামার তৈরি ‘অমিতাভ’ মহাবুদ্ধমূর্তি, যার উচ্চতা ১৩.৩৫ মিটার এবং ওজন ৯৩ টন। এই যুগে বেশ কিছু যোদ্ধাকৃতির শক্তিশালী কাঠের বুদ্ধমূর্তিও নির্মিত হয়। কামাকুরা যুগে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার জাপানি ইতিহাসে এক বিখ্যাত ঘটনা। ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে মিনামোতো বংশকে পরাজিত করে হোওজোও বংশ। তাঁরা মিনামোতোদের চেয়েও ছিলেন কট্টর একনায়কতান্ত্রিক। রাজপ্রতিভূর অধিকারী হোওজোও বংশ প্রধান হোওজোও তোমিকাসা (১১৩৮-১২১৫ খ্রি:) ছিলেন য়োরিমোতোর শ্বশুর। এবং মূল ক্ষমতা ছিল সামুরাই-যোদ্ধা হোওজোওদের হাতেই। মিনামোতো বংশকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ১৬ পুরুষ ধরে হোওজোওরা শাসন করেন কামাকুরা বাকুফু এবং তাঁদের সময়েই উল্লেখযোগ্য তিনটি ইতিহাস সৃষ্টি হয়: প্রথমত, পরাক্রমশালী মঙ্গল সেনাপতি কুবলাই খানের (১২১৫-৯৪ খ্রি:) দু’বার জাপান আক্রমণ প্রতিহতকরণ। দ্বিতীয়ত, ‘জেন্ বৌদ্ধ ধর্মে’র পৃষ্ঠপোষকতা। তৃতীয়ত, ‘বুশিদোও’ বা ‘সামুরাই-সংহিতা’ রীতি-নীতি-পদ্ধতির প্রসার সাধন। বিশেষ করে, জেন্ বৌদ্ধ রীতি সামুরাই-যোদ্ধাদের একমাত্র আদর্শ হয়ে উঠেছিল সেই যুগে। জেন্ কে জাপানে চীন থেকে নিয়ে আসেন বৌদ্ধ পুরোহিত মিয়োআন এইসাই (১১৪১-১২১৫ খ্রি:) যিনি জাপানে রিনজাই জেন্ সম্প্রদায়ের প্রবর্তক, যদিও মূল প্রবর্তক চীনের লিনজি (Línjì Yìxuán (?-৮৬৬ খ্রি:), তাঁর নামানুসারেই এই রিনজাই। তারপর চীন থেকে শিক্ষা নিয়ে আর একজন পুরোহিত দোওগেন্ জেনজি (১২০০-৫৩ খ্রি:) জেন্ সোওতোওশুউ সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন যদিও তিনি কিছুদিন এইসাইয়ের শিষ্য ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, লিনজি ছিলেন চীনে প্রথম জেন্ প্রবর্তকের অনুসারী। যাহোক, হোওজোও সামুরাইরা এই নতুন ধারণাকে উৎসুকভরে স্বাগত জানিয়েছিলেন তাঁদের শাসনামল ১৩ শতকে। জেন্ বৌদ্ধ ধর্ম এবং জাপান আজ একে অপরের সম্পূরক। জেন্ হচ্ছে চেতনাবোধকে নিঃশব্দতার মধ্যে লীন করে দিয়ে নিজেকে আলোকিত এবং মননকে সুস্থির করার এক মহাধৈর্যশীল পরীক্ষার নাম। জেন্ মানেই অপার সৌন্দর্যচর্চা। ‘জেন’ হচ্ছে ‘ধ্যান্’ (সংস্কৃত ধ্যান্, ইংরেজি Meditation) এর মাধ্যমে নিজের মনের প্রশান্তিকে অন্বেষণ করা এবং বুদ্ধত্বে সমাধিস্থ হওয়াই জেন্ এর মূল লক্ষ্য। জেন্ বৌদ্ধ ধর্মের মূল প্রবর্তক হচ্ছেন বোধিধর্ম। যদিওবা গৌতমবুদ্ধ নিজে খ্রি:পূর্ব ৫০০ শতাব্দী তথা ২,৫০০ বছর পূর্বে এর সূচনা করেছিলেন বুদ্ধগয়ায়। নির্বাক ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি বুদ্ধত্ব অর্থাৎ সেই জ্ঞানালোক যা কিনা মানবমুক্তির সার্বিক পন্থা। এই বোধিধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না, মনে করা হয় তিনি দক্ষিণ ভারতের পল্লভ (Pallavas) রাজবংশীয় (৭-৮ম শতাব্দী) এক রাজপুত্র। মূলত দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর উত্তরপুরুষ ও রাজপুত্র বোধিধর্ম ছিলেন দীর্ঘকায় সুঠাম দেহের অধিকারী এবং বদমেজাজি এক মানুষ। বৌদ্ধভিক্ষু হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ঘুরে ঘুরে অবশেষে চীন�� গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের মূল এই ধ্যান্-সাধনা তথা শিক্ষাটিকে চীনা বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে অঙ্গীভূত করে জনপ্রিয় করে তোলেন। চীনা ভাষায় ‘জেন্’কে বলা হয় ‘চ্যান্’। জাপানি ভাষায় বোধিধর্মকে বলা হয় ‘দারুমা’। ‘দারুমা’র জেন্ সম্প্রদায় জাপানে জন্ম দেয় বিগত ৬০০ বছরের মধ্যে অভূতপূর্ব সমৃদ্ধ এক আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের। তার প্রমাণ আজও আমরা দেখতে পাই এই জাপানেই অনুষ্ঠিত ‘জাজেন্’ বা ‘ধ্যানাসন’ এর অনুশীলনের মধ্যে। অত্যন্ত কঠোর এই ‘ধ্যান্’ পদ্ধতি, যা সকাল-বিকেল শুধু জেন্ পুরোহিতই নন, দেশী-বিদেশী সাধারণ মানুষেরও এই ধ্যানাসনে অংশগ্রহণ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করার অপার সুযোগ রয়েছে। জেন্ মানেই জাপানের বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের উৎস এবং আধার। শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে জেন্ সাহিত্যচর্চা---নিয়মিত পুরোহিতরা তো চর্চা করেনই, পাশাপাশি শিক্ষা প্রদান করেন মন্দিরের মধ্যেই হাইকু, তানকা, ওয়াকা প্রভৃতি কবিতা যাঁরা এই বিষয়ে চর্চায় আগ্রহী তাঁদেরকে; জেন্ কলাচর্চা একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা-অনুষদ। অতীতে চীনে যেমনটি ছিল তা হারিয়ে গিয়ে অনেক আগেই জাপানে ক্রমাগত অনুসৃত হয়ে আসছে ব্যাপকভাবে। বলাই বাহুল্য যে, চীনের ইতিহাসকে অনেক আগেই ছাপিয়ে গেছে জাপানি জেন্ চিত্রকলাচর্চা ‘সুইবোকুগা’---এই রীতিতে রেশম কাপড় এবং হস্তনির্মিত ‘ওয়াশি-পেপারে’ গাঢ় কালো রঙে কখনও ধোঁয়াটে কখনওবা গেরুয়া ছবি আঁকা হয়ে থাকে। শুধু চিত্র আঁকাই নয় ‘শোদোও’ বা ‘লিপিচর্চা’ জাপানি জেন্ বৌদ্ধ ধর্মকে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চীনে ও জাপানে এর দ্বারা বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ক্ষুদ্র কবিতা বা স্বাক্ষর এই রীতিতে লিখে ভক্তদেরকে উপহার দিয়েছেন। জেন্ থেকে উদ্ভাবিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘চাদোও’ বা ‘শাদোও’ অর্থাৎ ‘গ্রীন টি সিরেমনি’ বা ঐতিহ্যবাহী ‘চা-অনুষ্ঠান’, ফুলসজ্জা ‘ইকেবানা’ এবং ধূপধুনোর গন্ধ উপভোগ্য সমাবেশ ‘কোওদোও’। অসাধারণ এই জেন্ সংস্কৃতি সামুরাই শ্রেণী ছাড়াও অভিজাত ধনী ব্যবসায়ীরাও বহুবছর ধরে পৃষ্টপোষকতা করেছেন। মেইজি সংস্কারের (১৮৬৮-১৯১২) পর আধুনিক জাপানে এর চর্চা বা পৃষ্ঠপোষকতা ছিল একটি উঁচুমাপের সামাজিক মর্যাদাস্বরূপ রীতি। আজকে বিশ্বব্যাপী জেন্ সংস্কৃতি প্রভূত সুনাম অর্জন করে চলেছে। অবশ্য কালক্রমে জাপানের অন্যান্য সংস্কৃতিতেও জেন্ প্রভাব পড়েছে যেমন নোহ্ থিয়েটার, বুনরাকু বা পাপেট থিয়েটার; বোনসাই, তেইএন বা বাগানচর্চা, জুউদোও, কারাতে, কেনদোও, কিউদোও প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মোটকথা আজকের জাপানে জেন্ বৌদ্ধ ধর্ম আন্তর্জাতিক মৈত্রীবন্ধনের ক্ষেত্রেও অপরিসীম প্রভাব রেখে চলেছে---সেখানে স্বরূপে উদ্ভাসিত পারস্পরিক সহাবস্থান ও সহনশীলতা। এখানেই মনে হয় যে, পার্থিব ধর্ম দিয়ে কী হবে যদি তার পরিশীলিত সংস্কৃতি না থাকে? তাই হয়ত সর্বস্তরের জাপানিরা ধর্মের কুটিল ও কুৎসিত জটিলতাকে এক পাশে রেখে জীবননান্দকে আবিষ্কার ও উপভোগের যে উজ্জ্বল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন মেইজি সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিগত ১৫০ বছর ধরে সেটাকেই ভালোবাসেন। এটা সত্য যে, অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো জাপানেও অধ্যাত্মবাদের চেয়ে বস্তুতান্ত্রিক ভোগবাদের চাহিদা ক্রমবর্ধমান তাই বলে ঈশ্বরবাদকে একেবারে দৃষ্টির সীমানা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়নি কখনোই। তাই মন্দির, জিনজা চোখে পড়ে শহর, গ্রাম, দ্বীপ সর্বত্র। বছরে অন্তত একবার মন্দিরকেন্দ্রিক সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত পূর্বপুরুষ, আত্মীয়স্বজনের সমাধিস্তম্ভ পরিদর্শন, ধোয়ামোছা, ফুল সাজানো এবং ভক্তিপূর্বক মন্ত্রপাঠ করে থাকেন অধিকাংশ নাগরিক। একে বলে জাপানি বৌদ্ধ ভাষায় ‘ওহাকা মাইরি’, ‘ওহিগান’ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, সারা বছরই ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ’ (National treasure) হিসেবে বৌদ্ধ, শিন্তোওধর্ম বিষয়ক দুর্লভ মূর্তি, প্রতিমা, আলোকচিত্র, চিত্রকলা, লিপিকলা ইত্যাদির জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় জাদুঘরগুলোতে রীতিমতো প্রবেশমূল্যের ভিত্তিতে। আবাল-বৃদ্ধবনিতা টিকিট কিনে সেসব প্রদর্শনী নিবিষ্ট মনে উপভোগ করেন। প্রতিমাসৌন্দর্য, চারুকলা, চিত্রকলার শৈল্পিক রূপ তাঁদেরকে বরাবরই টানে---এটা একটা জনপ্রিয় রীতি, সংস্কৃতিও বটে। এইসব প্রদর্শনীতে হাজার বছর ধরে চর্চিত আধ্যাত্মিকতা, মেধা ও মননশীলতার প্রামাণ্যচিত্র দেখে জাপানিরা আত্মপ্রসাদ অনুভব করেন। খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রদর্শনীও মাঝেমাঝে অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া প্রায়শ চীন, কোরিয়া, তাইওয়ান, তিব্বত, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, ভারত প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ক দীর্ঘ প্রদর্শনীর আয়োজন করে বিভিন্ন ধর্মীয়, বাণিজ্য ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তখন তাতে সাধারণ জাপানিদেরকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা যায়। এই যে দেশী-বিদেশী প্রদর্শনীগুলো এদেশে অনুষ্ঠিত হয় তার পেছনে কাজ করে একটি লক্ষ্য আর তা হল: অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনশিল্পের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। ধর্মীয় সম্পদ যে লাভজনক অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে জাপানি মেধা তাই করে দেখাচ্ছে বহু বছর ধরে। এখান থেকে বাংলাদেশ অনায়াসে শিক্ষালাভ করতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশে এখনো তিনটি বড় ধর্মের ঐতিহ্যগত নিদর্শন রয়েছে অনেক। সেগুলোকে অনুরূপ পর্যটনকেন্দ্র করা যেতে পারে। ধর্মীয় প্রত্ন-ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন শিল্পের মতো চিরকালীন লাভজনক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র খুব কমই আছে এটা জাপানিরা শতবর্ষ আগেই অনুধাবন করেছেন। (চলবে)