ছবি সংগৃহীত
খনি-বাকেরের প্রেমাখ্যান
আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ০৬:৪৯
ভাটি অঞ্চলে এক জমিদার ছিলেন-আগা মুহম্মদ বাকের খাঁ। প্রতাপশালী জমিদার, বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নায়ক। তাঁরই নাম অনুসারে বর্তমান বরিশালের নাম সেসময়ে রাখা হয়েছিল বাকেরগঞ্জ। তবে বাকেরগঞ্জ টিকে থাকুক না আর থাকুক, আগা বাকেরের নাম কিন্তু আজও জড়িয়ে আছে এই দেশের জনপ্রিয় একটা খাদ্য বস্তুর সাথে... হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। বাকরখানি তার নাম! আর যেমন তার নামের বাহার, ঠিক তেমনই বাহারি তার নেপথ্যের কাহিনীও। ইতিহাস বলে একসময় নাকি রেওয়াজ ছিল উপঢৌকন হিশাবে বাকরখানি রুটি পাঠাবার। আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে আগা বাকের খাঁ-এর হাত ধরে জন্ম হয় এই বাকরখানি রুটির এবং কালের বিবর্তনে পরিণত হয় ঢাকা নগরীর ইতিহাসের সুবিশেষ একটি অংশে। সেকালে বনেদী পরিবারগুলোতে কেবল এই রুটি বানাবার জন্যই বিশেষ কারিগর রাখা হতো, এমনই ছিল দৈনন্দিন জীবনে বাকরখানির গুরুত্ব। নেপথ্যের করুন প্রেম কাহিনী- মজার ব্যাপারটা হচ্ছে,ভাটি অঞ্চলের সেই জমিদার আগা বাকের খাঁ কিন্তু এই দেশের সন্তান ছিলেন না। তুর্কি দেশ হতে ভাগ্যের ফেরে ক্রীতদাস রূপে উপস্থিত হয়েছিলেন এই দেশে, আর তৎকালীন বাংলার সুবেদারের সুনজরে পড়ে গিয়েছিলেন। সুবেদার মুর্শিদ কুলী খাঁ বালক আগা বাকেরকে লালন করেছিলেন পুত্র স্নেহে, প্রদান করেছিলেন নিজের নাম,বংশ মর্যাদা,প্রভাব-প্রতিপত্তি। এবং তরুণ বয়সে সেই বালকই পিতার অমতে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন রাজধানী মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত নর্তকী খনি বেগমের। এবং ফলাফল যা হবার হলো ঠিক তাই। একটি প্রেম কাহিনী সংঘাতময় হতে যা যা উপাদান প্রয়োজন, তার সমস্তই একে একে উপস্থিত হলো আগা বাকের আর খনি বেগমের অসম প্রেমের মাঝে। প্রতিপক্ষ রূপে সামনে এলো খনি বেগমের প্রেমপ্রার্থী নগর-কোতোয়াল জয়নাল। তার ষড়যন্ত্রে সুবেদার মুর্শিদ কুলী খাঁ রুষ্ট হলেন, পুত্র আগা বাকেরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে নিক্ষেপ করলেন বাঘের খাঁচায়। প্রিয়তমাকে পাবার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় বীর যোদ্ধা আগা বাকের বাঘের সাথে লড়াই করে জীবিত বেঁচে তো গেলেন, কিন্তু ততক্ষণে জয়নাল দ্বারা অপহৃত হয়েছে খনি বেগম। এবং প্রেমিকাকে উদ্ধারের লক্ষ্যে আগা বাকের খাঁ রণসাজে উপস্থিত হলে উজিরপুত্র জয়নাল হত্যা করলো খনি বেগমকে, আর নিজে হলো আত্মঘাতী! বেদনার এই আখ্যানে প্রেমিক পুরুষটির শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল সেই কাহিনী এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে কথিত আছে যে মির্জা আগা মুহম্মদ বাকের খাঁ কখনোই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি প্রেয়সী খনি বেগমকে। আর তাইতো নিজের আবিষ্কৃত এবং প্রিয় খাদ্যটির নাম রেখেছেন “বাকের-খনি” রুটি, পরবর্তীতে যা পরিণত হয় বাকরখানিতে। বাকরখানি হচ্ছে মূলত এক রকমের রুটি যা বানানো হয় প্রচুর মাখন বা ডালডা দিয়ে তৈরি ময়দার খামির দিয়ে। এবং ছোট আকৃতিতে বেলে নিয়ে সেঁকা হয় উত্তপ্ত তন্দুরে। অতীতে ময়দার সাথে মালাই এবং মাখন মিশিয়ে খামির তৈরি করবার চল ছিল। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে দুধমালাইয়ের পরিবর্তে বাকরখানিতে ডালডা ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়৷ কোথায় মিলবে পুরানো ঢাকায় আজও সকালের নাশতা হোক কিংবা বিকালের চায়ের কাপ, সর্বত্রই বাকরখানির বিচরণ সদর্পে। গরুর মাংস ভুনা কিংবা গরম রসগোল্লা, অথবা মিষ্টি পায়েস, এক কাপ দুধ চা- সব কিছুর সাথেই বাকরখানি দারুণ উপাদেয়। প্রচলিত আছে যে ভালো বাকরখানি সেটাকেই বলা হবে যা কিনা মুখে দিলেই মাখনের মতন মিলিয়ে যাবে, হাতের স্পর্শে ভেঙ্গে হবে ঝুরঝুরে। আমলীগোলা, ইসলামবাগ, হাজারিবাগ, লালবাগ,চকবাজার, আবুল হাসনাত রোড, আগা সাদেক রোড, নাজিরাবাজার, বংশাল, সিদ্দিকবাজার, বনগ্রাম, মৈশন্ডি, লক্ষ্মীবাজার, একরামপুর, সুত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, নারিন্দা, দয়াগঞ্জ এক কথায় পুরনো ঢাকার সর্বত্র অলিগলিতে বাকরখানির দোকান নজরে পড়ে আজও। আর এসব দোকান হতেই প্ল্যাস্টিকের আবরণে আবৃত হয়ে সুস্বাদু এই রুটি বিক্রির জন্য পৌঁছে যায় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে। সুতরাং বাকরখানি মিলবে ঢাকা শহরের বড় মিষ্টির দোকান আর সুপারশপ গুলোতেও। নানান রকমের বাকরখানি কিনতে পাওয়া যাবে পুরানো ঢাকার এইসব দোকান গুলিতে। খাস্তা বাকরখানি ছাড়াও মিলবে পনির বাকরখানি, মিষ্টি বাকরখানি, কিমা বাকরখানি, নারকেলের বাকরখানি প্রভৃতি। রুটি বা পরোটা ঠান্ডা হলেই স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বাকরখানি ঠাণ্ডা হলেও থাকে একইরকম সুস্বাদু। সাতদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। বংশ পরম্পরায় সুনিপুণ কারিগরেরা তো তৈরি করেই যাচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী এই খাবারকে, সেই সাথে আসুন জেনে নেই কি করে একজন সাধারণ রাঁধুনি ঘরে বসেই তৈরি করতে পারবেন উপাদেয় বাকরখানি। বাকরখানির ঘরোয়া রেসিপি- খামির তৈরির জন্য- ১ কাপ ময়দার মাঝে ১/৪ কাপ গলানো ডালডা, অল্প তেল ও লবণ দিয়ে ময়ান দিন। এবং তৈরি করে নিন মোলায়েম খামির। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে অল্প পানি দিতে পারেন। পানির বদলে মালাই বা ঘন দুধ এবং ডালডার পরিবর্তে মাখন ব্যবহার করলে স্বাদে বেড়ে যাবে বহুগুণ। খামির তৈরি করে ভালো করে ঢেকে রেখে দিন ২/৩ ঘণ্টা। ডালডার প্রলেপ তৈরির জন্য- ১/৪ কাপ ডালডা নিন, চুলায় গরম করে গলিয়ে আবার ঠাণ্ডা করে নিন। সাথে ১ কাপ সয়াবিন তেল মিশিয়ে বিট করে রাখুন। ময়দার প্রলেপ এর জন্য- ১ কাপ ময়দা, ১/৪ কাপ সয়াবিন তেল ও সামান্য ঘি হাত দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে রাখুন। বাকরখানির মাঝে চিনি,পনির বা মাংস ঝুরি দিতে চাইলে এই মিশ্রণের মাঝেই মিশিয়ে রাখুন। বাকরখানি তৈরি- খামিরকে চার ভাগ করে নিন ও যতটা সম্ভব পাতলা রুটি বেলুন। রুটির চারদিকে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রেখে বাকি স্থানে ডালডার প্রলেপ দিন সমান ভাবে এবং ময়দার ঝুরঝুরে মিশ্রণ ছিটিয়ে দিন। রুটিকে ২ ভাজ করুন, আবার ডালডা ও ময়দার প্রলেপ দিন। আবার ভাজ করুন ও ঢেকে রাখুন আরও এক টুকরো। এভাবে সব খামির দিয়ে তৈরি করে নিন। এরপর উক্ত খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে গোল রুটি বেলে নিন। চাকু দিয়ে দুটো আঁচড় দিন এবং তন্দুরে সেঁকে নিন। নতুবা প্রি হিট করা ওভেনে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট বেক করে নিন লাল মুচমুচে হওয়া পর্যন্ত। ব্যাস, তৈরি হয়ে গেলো পুরানো ঢাকার ঐতিহ্য আপনার ঘরেই! অতুলনীয় স্বাদের জন্য হোক কিংবা হোক আগা বাকের-খনি বেগমের অমর প্রেমগাঁথার জন্য, পুরানো ঢাকার ঘরে ঘরে আজও সমাদৃত বাকরখানি রুটি। টিকে আছে শত শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে, আর টিকে থাকবে আরও বহুকাল।