ছবি সংগৃহীত

কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ১৪ : ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্লিষ্ট ও অবিশ্লিষ্ট ঈমান

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৬:০২
আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ০৬:০২

ফেরেশতাদের প্রতি বিস্তারিত ও বিস্তারিত ঈমান

ফেরেশতাদের মধ্যে যাদের নাম কোরান-সুন্নাহয় এসেছে, তাদের প্রতি বিস্তারিত আকারে ঈমান আনতে হবে। তাঁদের মধ্যে তিনজন হলেন প্রধান, জিবরিল, মিকাইল ও ইসরাফিল। [ইগাছাতুল লহুফান ২/১২২ ] জিবরিল হলেন অহি বহনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা। যে অহি মানুষের অন্তরাত্মায় জীবনীশক্তি সরবরাহ করে। জিবরিল ও মিকাঈল এ দুজনের নাম পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ ‘বল, ‘যে জিবরিলের শত্রু হবে (সে অনুশোচনায় মরুক) কেননা নিশ্চয় জিবরিল তা আল্লাহর অনুমতিতে তোমার অন্তরে নাযিল করেছে, তার সামনে থাকা কিতাবের সমর্থক, হিদায়েত ও মুমিনদের জন্য সুসংবাদরূপে’-(সূরা আল বাকারা , ৪৩)। আল্লাহ তাআলা আল-কোরানে ফেরেশতা জিবরিল আ. এর প্রশংসা করেছেন এবং তাকে সর্বোত্তম গুণাবলিযুক্ত করে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে , فَلَا أُقْسِمُ بِالْخُنَّسِ . الْجَوَارِ الْكُنَّسِ . وَاللَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ . وَالصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ . إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ . مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ ‘আমি কসম করছি পশ্চাদপসারী নক্ষত্রের। যা চলমান, অদৃশ্য। আর কসম রাতের, যখন তা বিদায় নেয়। আর কসম প্রভাতের, যখন তা আগমন করে। নিশ্চয় এ কোরান সম্মানিত রাসূলের [জিবরিল (আলাইহিস সালাম)। ] আনিত বাণী। যে শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন। মান্যবর, সেখানে সে বিশ্বস্ত’ - (সূরা আত-তাকওয়ির , ১৫-১৬)। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى ‘তাকে শিক্ষা দিয়েছে প্রবল শক্তিধর, প্রজ্ঞার অধিকারী [জিবরিল]। অতঃপর সে স্থির হয়েছিল’-(সূরা আন্-নাজম , ৫-৬)। আর মিকাঈল হলেন পৃথিবী, উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর জীবন-বিষয়ক কার্যক্রমের দায়িত্বে নিয়োজিত। [ইগাছাতুল লুহফান ২/১২২ ] পক্ষান্তরে ইসরাফিল আ. শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত, যার মাধ্যমে পরকালীন জীবন শুরু হবে। [প্রাগুক্ত ] আল-কোরানে উল্লিখিত আরেকজন ফেরেশতা হলেন, মালেক, যিনি দোযখের প্রহরীর দায়িত্বে নিয়োজিত। ইরশাদ হয়েছে, وَنَادَوْا يَا مَالِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ قَالَ إِنَّكُمْ مَاكِثُونَ ‘তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হে মালিক, তোমার রব যেন আমাদেরকে শেষ করে দেন’। সে বলবে, ‘নিশ্চয় তোমরা অবস্থানকারী’-(সূরা আয্-যুখরুফ , ৭৭)। সহিহ হাদিসেও তাঁর কথা এসেছে। [বুখারি , আস-সহিহ ( ফাতহুল বারীসহ): ৬/৩৪২] উল্লিখিত ফেরেশতাসহ যাদের নাম সহিহ হাদীসে এসেছে, তাদের প্রতি ঈমান আনা এবং তারা যে যে দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন, তার প্রতি ঈমান আনা ফরজ। আর যাদের নাম উল্লিখিত হয়নি, তাদের প্রতি এজমালিভাবে ঈমান আনতে হবে। তাদের প্রকার ও কাজকর্মের ব্যাপারে কোরান সুন্নাহয় যা উল্লিখিত রয়েছে তার প্রতিও ঈমান আনতে হবে। [ইমাম বুখারি একটি আলাদা অধ্যায়ে ফেরেশতাদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি ত্রিশটিরও অধিক হাদিস এ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- দেখুন বুখারি, আস-সহিহ (ফাতহুল বারীসহ): ৬/৩৪২] অতএব আমরা সম্মানিত লেখক ফেরেশতাবৃন্দের প্রতি ঈমান আনব, যাদের আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর সংরক্ষক হিসেবে নিয়োজিত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ . كِرَامًا كَاتِبِينَ . يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ ‘আর নিশ্চয় তোমাদের ওপর সংরক্ষকগণ রয়েছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে, যা তোমরা কর।’- (সূরা আল ইনফিতার , ১০-১২)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ‘মানুষের জন্য রয়েছে, সামনে ও পেছনে, একের পর এক আগমনকারী প্রহরী, যারা আল্লাহর নির্দেশে তাকে হেফাযত করে’- (সূরা আর্-রা‘দ , ১১)। أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ ‘না কি তারা মনে করে, আমি তাদের গোপনীয় বিষয় ও নিভৃত সলাপরামর্শ শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ, আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে লিখছে’- (সূরা আয্-যুখরুফ , ৮০)। কোনো-কোনো তাফসিরগ্রন্থে সম্মানিত লেখক ফেরেশতাদের সংখ্যা দু’জন বলা হয়েছে। একজন থাকেন ব্যক্তির ডানে। আর-একজন বামে। যিনি ডানে থাকেন তিনি নেক-আমল লিপিবদ্ধ করেন। আর যিনি বামে থাকেন তিনি বদ-আমলম লিপিবদ্ধ করেন। এ ছাড়া আরও দু’জন ফেরেশতা আছেন যারা সংরক্ষকের দায়িত্বে নিয়োজিত। একজন থাকেন ব্যক্তির সামনে আরেকজন পেছনে। অতএব বলা যায় যে প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে থাকা ফেরেশতাদের সংখ্যা চারজনের মতো। [দেখুন ইবনু আবিল ইয্য, শারহুল আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ: পৃ ৪৩৯] মানুষের সঙ্গী হিসেবে-থাকা ফেরেশতা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সঙ্গী হিসেবে একজন শয়তান ও একজন ফেরেশতা নিয়োজিত রাখা হয়নি। সাহাবীগণ বললেন, আপনার ক্ষেত্রেও কি, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, আমার ক্ষেত্রেও। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে ওর ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। অতঃপর সে আত্মসমর্পণ করেছে। সে আমাকে ভালো ছাড়া অন্যকিছুর নির্দেশ দেয় না।’ [সহিহ মুসলিম বি শারহনি নববী: ১৭/১৫৭] আমরা মৃত্যুর ফেরেশতা- মালাকুল মাওত- এর ওপরও বিশ্বাস স্থাপন করি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরানে বলেন, قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ ‘বল, ‘তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা, যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে’-(সূরা আস-সাজদা , ১১)। মৃত্যুর ফেরেশতার নাম কী, তা পবিত্র কোরান ও সহিহ হাদীসে পাওয়া যায় না। তবে সাহাবায়ে কেরাম ((রাযি.)) থেকে বর্ণিত কিছু আছার থেকে তাঁর নাম আযরাঈল বলে জানা যায়। আল্লাহ তাআলাই এ ব্যাপারে ভালো জানেন। আমরা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করি। আল-কোরানের আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের কথা এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ‘সেদিন তোমার রবের আরশকে আটজন ফেরেশতা তাদের ঊর্ধ্বে বহন করবে’-(সূরা আল হা-ক্কাহ , ১৭)। ইসরাফিল, যিনি শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন, তিনিও আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মধ্যে একজন। [উসূল ঈমান:১৪] যারা জাহান্নামের আগুন দেখাশোনা করার দায়িত্বে আছেন, তাদের প্রতিও আমরা ঈমান আনি। তাঁদেরকে বলা হয় আয-যাবানিয়া। তাঁদের নেতৃত্বে আছেন ঊনিশজন ফেরেশতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقَالَ الَّذِينَ فِي النَّارِ لِخَزَنَةِ جَهَنَّمَ ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفْ عَنَّا يَوْمًا مِنَ الْعَذَابِ ‘আর যারা আগুনে থাকবে তারা আগুনের দারোয়ানদের বলবে, ‘তোমাদের রবকে একটু ডাকো না! তিনি যেন একটি দিন আমাদের আজাব লাঘব করে দেন।’- (সূরা গাফের , ৪৯)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ‘যেখানে রয়েছে নির্মম ও কঠোর ফেরেশতাকুল যারা, আল্লাহ তাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, সে ব্যাপারে অবাধ্য হয় না। আর তারা তা-ই করে যা তাদেরকে আদেশ করা হয়’- (সূরা আত-তাহরীম , ৬)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, عَلَيْهَا تِسْعَةَ عَشَرَ . وَمَا جَعَلْنَا أَصْحَابَ النَّارِ إِلَّا مَلَائِكَةً ‘তার ওপর রয়েছে ঊনিশজন (প্রহরী)। আর আমি ফেরেশতাদেরকেই জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছি’ -(সূরা আল-মুদ্দাছছির , ৩০-৩১)। আমরা জান্নাতের দায়িত্বে-রত ফেরেশতাদের প্রতিও ঈমান আনি, যারা জান্নাতবাসীদের জন্য মেহমানদারি, খাদ্য-পানীয়, পোশাক ইত্যাদি প্রস্ত্তত করবেন, যা কেউ কোনোদিন চোখেও দেখেনি, কানেও শোনেনি এবং কারও অন্তরেও যা কল্পিত হয়নি। মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক