ছবি সংগৃহীত

কিতাবুল ইমান : প্রবন্ধ নং- ১২ : মানুষ ও মহাবিশ্বের সঙ্গে ফেরেশতাদের সম্পর্ক

priyo.Islam
লেখক
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১২:০১
আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১২:০১

মানুষ ও মহাবিশ্বের সঙ্গে ফেরেশতাদের সম্পর্ক

আল্লাহর তাআলার সঙ্গে ফেরেশতাদের সম্পর্ক হলো, পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব ও আনুগত্যের সম্পর্ক। তাঁরা আল্লাহ তাআলার সকল আদেশ-নিষেধ নির্দ্বিধায় মেনে চলেন। অতএব মানুষ ও মহাবিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটাও হলো আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও দাসত্ব-কেন্দ্রিক। আর তা এভাবে যে- ফেরেশতাদের ইবাদত শুধু আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা, গুণকীর্তন ও মহিমা বর্ণনা করায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং মহাবিশ্বের পরিচালনায় আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা-অনিচ্ছিার অনুপুঙ্খ বাস্তবায়ন করেও তারা আল্লাহর আনুগত্যের পরিচয় দেন। যেমন মহাবিশ্বে আল্লাহর যেসব সৃষ্টি রয়েছে, জৈব অথবা অজৈব, এবং প্রত্যেকের যে নড়াচড়া ও কর্মচাঞ্চল্য রয়েছে, এবং মহাবিশ্বে যেসব নিয়এ নীতি রয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা তা তদারকিসহ আল্লাহর সিদ্ধান্তমালা সকল সৃষ্টিকুলের ওপর বাস্তবায়ন করে থাকেন। মহাবিশ্বে যত মুভমেন্ট ঘটে- হোক তা ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত- সব-কিছুর রেকর্ড ও পর্যবেক্ষণে তাঁরা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করে যান। এক-কথায়- তাঁরা আসমান ও জমিনের দায়িত্বে নিয়োজিত এবং এ মহাবিশ্বে যেকোনো ধরনের মুভমেন্ট, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছানুযায়ী, তাদের দায়িত্বের আওতাধীন। [ইগাছাতুল লুহফান: ২/১২০; শারহুল আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ: ২৩৫ ] আল্লাহ তাআলা বলেন , فَالْمُدَبِّرَاتِ أَمْرًا ‘অতঃপর কসম সকল কার্যনির্বাহকারীদের’-(সূরা আন-নাযিআত , ৫)। ‘কার্যনির্বাহকারী’ বলতে আল্লাহর নির্দেশে আসমান ও জমিনের কার্যনির্বাহকারী ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে। তিনি অন্যত্র বলেছেন, فَالْمُقَسِّمَاتِ أَمْرًا ‘আর কসম নির্দেশ বণ্টনকারীদের’ - সূরা আয-যারিয়াত , ৪)। ‘নির্দেশ বণ্টনকারী’ বলতে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ বণ্টনকারী ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে। [ইগাছাতুল লুহফান :পৃ ১২০] ফেরেশতারা বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন- কোরান-সুন্নাহ থেকে এ ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা চাঁদ ও সূর্য, গ্রহনক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, মেঘ-বৃষ্টি ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা ফেরেশতা নিয়োজিত রেখেছেন। মাতৃগর্ভের জন্যও ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন, যারা ভ্রূণের দেখা- শোনা করেন, আর এভাবেই, এক পর্যায়ে, তা পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতি ধারণ করে। মৃত্যু ও জীবননাশের জন্যও ফেরেশতা রয়েছেন। প্রতিটি মানুষের জন্যও ফেরেশতা রয়েছেন, যারা তাকে সংরক্ষণ করেন। বরং প্রতিটি মাখলুক, এমনকি মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা ও বিষয়-আশয়ের জন্যও ফেরেশতা রয়েছেন। [ইগাছাতুল লুহফান:২/১২০; শারহুল আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ: পৃ:২৩৫] মহাবিশ্বে যেসব নীতি ও কার্যকারণ রয়েছে, যার একটি অন্যটির সঙ্গে, সাধারণত, সংযুক্ত। এ বিষয়টির সঙ্গে উল্লিখিত বিশ্বাসের কোনো সংঘর্ষ নেই; কেননা মহাবিশ্বে স্থাপিত নীতি ও কার্যকারণ আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি তথা মাখলুক। অতএব এ সবের দায়িত্বেও ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন, যারা এ সব নীতি ও কার্যকারণের দেখাশোনা করেন, ঠিক একইরূপে যেভাবে তারা অন্য মাখলুকদের দেখাশোনা করেন। মহাবিশ্বে স্থাপিত কার্যকারণ ও নীতিমালা সংরক্ষণ করার ইচ্ছা যদি আল্লাহ তাআলার না-থাকত এবং যদি তা সংরক্ষণের জন্য ফেরেশতা নিয়োজিত না-রাখতেন, তাহলে সুসংহত ও সুবিন্যস্তভাবে লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে মহাবিশ্বের চলমান থাকা কিছুতেই সম্ভবপর ছিল না। আর মানুষ তো তার প্রকৃতিগত জীবন নিয়ে সেই সামগ্রিক যত্নের আওতাধীন থাকে, যার জন্য আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন; কেননা মানুষ হলো আললাহর সৃষ্টির মধ্যে একটি সৃষ্টি। বরং সে এমন সৃষ্টি, যার জন্য আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের সব-কিছুই নিয়োজিত করে রেখেছেন। ইরশাদ হয়েছে , أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ‘তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনে যা-কিছু আছে’-(সূরা লুকমান , ২০)। অতএব ফেরেশতাদের আসমান ও জমিন এবং দুয়ের মধ্যে যা-কিছু আছে তা সংরক্ষণ ও দেখাশোনা করা, প্রকৃত পক্ষে মানুষকে সহায়তা করা যাতে তারা পৃথিবীতে খেলাফতের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথার্থরূপে পালন করতে পারে। উপরন্তু মানুষের ইচ্ছাজাত জীবনসংক্রান্ত নানা কর্মেও- যেভাবে আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন ঠিক সেভাবেই- ফেরেশতারা সংযুক্ত রয়েছেন। যেমন মানুষকে হিদায়েতের পথ দেখানো, তাদের সৌভাগ্যবান বানানো। আল্লাহ তাআলার ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করা। হিদায়েত ও কল্যাণের পথ অবলম্বনের ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা দেয়া। অকল্যাণ, দুষ্কর্ম ও গোমরাহি থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা দেয়া। আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকেই, সম্মানিত রাসূলগণের মাধ্যমে, পৃথিবীতে হিদায়েত পৌঁছে দেয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন। আর এ দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে বেছে নিয়েছেন, তিনি হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ . نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ . عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ ‘আর নিশ্চয় এ কোরান সৃষ্টিকুলের রবেরই নাযিলকৃত। বিশ্বস্ত আত্মা এটা নিয়ে অবতরণ করেছে। তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও’- (সূরা আশ-শুয়ারা , ১৯২-১৯৪) ফেরেশতারা মানুষের জীবনব্যাপী সঙ্গ দেন। তাঁদের এ সঙ্গদানের উদ্দেশ্য মানুষকে সৌভাগ্যবান করা, তাদের হিদায়েতের পথ দেখানো। ফেরেশতারা মানুষের অন্তরে সত্য ও ন্যায়ের অনুভূতি জাগ্রত করেন এবং তা আঁকড়ে ধরতে মানুষকে উৎসাহ দেন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘নিশ্চয় আদম সন্তানের শয়তান কর্তৃক জাগ্রত একটি হৃদয়ানুভূতি রয়েছে এবং ফেরেশতা কর্তৃক জাগ্রত একটি হৃদয়ানুভূতিও রয়েছে। শয়তান কর্তৃক জাগ্রত হৃদয়ানুভূতি হলো দুষ্কর্ম করা ও সত্যকে অস্বীকার করার অনুভূতি। আর ফেরেশতা কর্তৃক জাগ্রত হৃদয়ানুভূতি হলো ভালো কাজ ও সত্যকে স্বীকার করার অনুভূতি। অতএব, যদি কেউ এরূপ অনুভূতি আঁচ করে, তবে তাকে বুঝতে হবে যে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি এর বিপরীতটি অনুভব করে তাহলে সে যেন শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন , الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالْفَحْشَاءِ وَاللَّهُ يَعِدُكُمْ مَغْفِرَةً مِنْهُ وَفَضْلًا وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ‘শয়তান তোমাদেরকে দরিদ্রতার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’- (সূরা আল বাকারা , ৩৬৮)। [হাদিসটি তিরমিযি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে, তা হাসান গারীব; নাসায়ী ও ইবনে হিববানও হাদিসটি ইবনে মাসউদ রাযি. এর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। [দেখুন: ফয়জুল কাদীর:১/৪৪৯] আল্লাহ তাআলা আমাদের আরও সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি মুমিনদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করার জন্যও ফেরেশতাদের নিয়োজিত রেখেছেন। এ মর্মে তিনি বলেছেন , الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آَبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ . وَقِهِمُ السَّيِّئَاتِ وَمَنْ تَقِ السَّيِّئَاتِ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمْتَهُ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ‘যারা আরশকে ধারণ করে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে। আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলে যে, ‘হে আমাদের রব, আপনি রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সব কিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রয়েছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অনুসরণ করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। আর জাহান্নামের আজাব থেকে আপনি তাদেরকে রক্ষা করুন’। ‘হে আমাদের রব, আর আপনি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করান, যার ওয়াদা আপনি তাদের দিয়েছেন। আর তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নি ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম সম্পাদন করেছে তাদেরকেও। নিশ্চয় আপনি মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়।’ আর আপনি তাদের অপরাধের আজাব হতে রক্ষা করুন এবং সেদিন আপনি যাকে অপরাধের আজাব থেকে রক্ষা করবেন, অবশ্যই তাকে অনুগ্রহ করবেন। আর এটিই মহাসাফল্য’- (সূরা গাফের , ৭-৯)। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করে। তাদের একজন বলে,‘হে আল্লাহ, আপনি ব্যয়কারীকে [ব্যয়কৃত সম্পদের] স্থলাভিষিক্ত সম্পদ দিন। আর অন্যজন বলে, ‘হে আল্লাহ, আপনি ব্যয়কুণ্ঠের সম্পদ বিনাশ করুন।’ [মুত্তাফাকুন আলাইহি- দেখুন সহিহ বুখারি ফাতহুল বারীসহ: ৩/২৩৭] ফেরেশতারা বান্দাদের আল্লাহর ইবাদত-আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ দেন। যিকির ও কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যকে তাদের নিকট প্রিয় করে তোলেন। ইল্ম ও উত্তম কাজের প্রতি তাদের অনুপ্রাণিত করেন। তাদের নামাজ ও কোরান তিলাওয়াতে তাঁরা হাজির হন। উল্লিখিত সকল বিষয়েই বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত বুখারি ও মুসলিমে উল্লিখিত হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘জামাতের সঙ্গে ব্যক্তির নামাজ, তার ঘরে নামাজের চেয়ে অধিক ছাওয়াবপূর্ণ। আর তার বাজারে নামাজ বিশ এরও অধিক মর্যাদাপূর্ণ। আর তা এভাবে যে, তোমাদের কেউ যখন ওযু করে এবং তা উত্তমরূপে করে। এরপর সে এমনভাবে মসজিদে আসে যে তাকে নামাজ ছাড়া অন্য কিছু তাড়িত করে না, নামাজ ছাড়া অন্য কিছু সে উদ্দেশ্য করে না, তাহলে মসজিদে প্রবেশ করা পর্যন্ত, তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে মর্যাদায় তাকে একধাপ উঁচু করে দেয়া হয় এবং তার একটি গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। এরপর সে যখন মসজিদে প্রবেশ করে, সে তখন নামাজরত বলে বিবেচিত হয় যতক্ষণ নামাজের অপেক্ষা তাকে আটকে রাখে। আর ফেরেশতারা তোমাদের জন্য দোয়া করতে থাকে যতক্ষণ সে ওই জায়গায় বসে থাকে যেখানে নামাজ আদায় করেছে। এরপর তারা বলে,‘হে আল্লাহ, আপনি তাকে দয়া করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাকে মাফ করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি তার তাওবা কবুল করুন। যতক্ষণ সে তার বসার স্থলে কাউকে কষ্ট না দেবে, যতক্ষণ সে তার ওযু নষ্ট না করবে। [মুত্তাফাকুন আলাইহি- দেখুন ফাতহুল বারী ১/৪৪৮; সহিহ মুসলিম (নববীর ব্যাখ্যাসহ) ৫/২২৯] আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন , ফেরেশতারা তোমাদের মাঝে পালাক্রমে আসে, রাত ও দিনে তারা তোমাদের কাছে আসে, তাদের একদল আসে এবং আরেক দল যায়। ফজর ও আসরের নামাজের সময় তাদের দু-দল একত্র হয়। অতঃপর (পালা শেষ করে) তোমাদের মাঝে রাতযাপনকারী ফেরেশতারা আকাশে উঠে যায়। তখন তাদের রব জিজ্ঞেস করেন, তোমরা আমার বান্দাদের কি অবস্থায় দেখে এসেছ? অথচ তিনি তাদের সব কিছুই সর্বাধিক অবগত আছেন। জবাবে ফেরেশতারা বলে, আমরা তাদের নামাজরত অবস্থায় রেখে এসেছি, আর গিয়ে দেখেছিলাম তারা নামাজ পড়ছে।’ [মুত্তাফান আলাইহি- দেখুন ফাতহুল বারী ৬/২৩৯] ফেরেশতারা ইলম তলবকারীদের উৎসাহ দেন। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘ইলম তলবের উদ্দেশে কোনো ব্যক্তি ঘর থেকে বের হলেই ফেরেশতারা খুশি হয়ে তার জন্য পাখা বিছিয়ে দেয়।’ [বর্ণনায় তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, ইবেন হিববান ও হাকেম। তিরমিযি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।] তারা সৎ কাজের ওপর বান্দাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেন। বিশেষ করে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের সময়। ইরশাদ হয়েছে , إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلَائِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آَمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ ‘স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে অনড় রাখ’। অচিরেই আমি ভীতি ঢেলে দেব তাদের হৃদয়ে যারা কুফরি করেছে। অতএব তোমরা আঘাত কর ঘাড়ের উপরে এবং আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙুলের অগ্রভাগে’- (সূরা আল আনফাল , ১২)। ফেরেশতাদের যেসব আমলের কথা আল্লাহ তাআলা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তন্মমধ্যে একটি হলো এমন মানুষের জীবনে যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী, বিশেষ করে পাপ-গুনাহ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে। আর তা হলো বান্দাদের আমল পর্যবেক্ষণ করা ও হিসেব করার পর তা লিখে রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন , وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ . إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ ‘আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। যখন ডানে ও বামে বসা দু’জন লিপিবদ্ধকারী পরস্পর গ্রহণ করবে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে’-(সূরা ক্বাফ , ১৬)। অন্য এক আয়াতে এসেছে , وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ . كِرَامًا كَاتِبِينَ . يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ ‘আর নিশ্চয় তোমাদের উপর সংরক্ষকগণ রয়েছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে, যা তোমরা কর’-(আল ইনফিতার , ১০-১২)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন , أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ ‘না কি তারা মনে করে, আমি তাদের গোপনীয় বিষয় ও নিভৃত সলাপরামর্শ শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ, আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে লিখছে’-(সূরা আয-যুখরুফ , ৮০)। মানুষের সঙ্গে ফেরেশতাদের সম্পর্ক ও তাদের ইচ্ছাজাত ও অনিচ্ছাজাত আমলে এর প্রভাব বিষয়ক আলোচনার উপসংহারে ইবনুল কাইয়েম আল জাওযিয়া র. এর একটি ব্যাপক অর্থবোধক কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেন,‘মানুষ ভ্রূণ আকারে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থা থেকে আরম্ভ করে মানব অস্তিত্বের সর্বশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেরেশতারা তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। মাতৃগর্ভে মানুষের উন্মেষক্রিয়া, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উন্নীত করা, আকৃতি দান, তিন তবক আঁধারের অভ্যন্তরে তাদের সুরক্ষা দেয়া, তার রিযিক লিপিবদ্ধ করা, বয়স লিপিবদ্ধ করা, তার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা, সকল অবস্থায় তার সঙ্গদান, তার কথা ও কাজ হিসেব করা, তার জীবনকে হিফাযত করা, মৃত্যুর সময় তার রূহ কব্জা করা এবং তা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর তাআলার সামনে পেশ করা, তাকে বারযাখি জীবনপর্ব ও পরবর্তী জীবনে শাস্তি প্রদান ও নিয়ামত ভোগ করানো, নিয়ামত ও আযাবের মাধ্যমসমূহ তৈরি করা- আল্লাহর তাআলার নির্দেশে এসব কাজের দায়িত্বে ফেরেশতারাই নিয়োজিত। তারা আল্লাহর অনুমতিতে মুমিন বান্দাদের সৎকাজের ওপর সুস্থির করেন, যা কিছু উপকারী তা তাদের শেখান, তারা তাদের সুরক্ষার জন্য যুদ্ধ করেন। অতএব তারা দুনিয়া ও আখেরাতে মুমিনদের বন্ধু। মুমিনদের তারা কল্যাণের পথে ডাকেন। দুষ্কর্ম ও অকল্যাণ থেকে তাদের হুঁশিয়ার করেন। অতএব ফেরেশতারা মুমিনদের বন্ধু ও তাদের সার্বিক সহযোগিতাকারী। তারা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতকারী ও তাদের শিক্ষক। তাদের উপদেশদাতা। তাদের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনাকারী। মুমিনদের জন্য তারা রহমত বর্ষণের দোয়া করেন যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর আনুগত্যের আওতাধীন থাকে, যতক্ষণ মানুষদের জন্য যা-কিছু কল্যাণকর তা শেখায়। তারা যে আল্লাহর কাছে সম্মানিত, এ বিষয়ে তাদের স্বপ্নে, মৃত্যুকালে, পুনরুত্থানকালে সুসংবাদ প্রদান করেন। ফেরেশতারাই একজন মুমিনকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ করে তোলেন, আখেরাতের প্রতি তার আগ্রহকে শাণিত করেন। যখন সে কিছু ভুলে যায় ফেরেশতারাই তাকে স্মরণ করিয়ে দেন। যখন নিরুদ্যম হয়ে পড়ে তখন তাকে উদ্যমী করে তোলেন। যখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে তাকে শান্ত্বনা যোগান। যা তার দুনিয়া ও আখেরাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তা সম্পন্ন করতে তারা সচেষ্ট হন। তারা হলেন আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর আদেশ নিষেধ বাস্তবায়নে আল্লাহর দূত। তারা আল্লাহ তাআলা ও তার বান্দাদের মাঝে আল্লাহর দূত যারা তাঁর নির্দেশ নিয়ে অবতরণ করেন মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। তারা আবার নির্দেশ মোতাবেক আল্লাহর কাছেই উঠে যান। [ইগাছাতুল লুহফান মিন মাসাইদিশ শাইতান ২/১২৫-১২৬] মূল : ড. মুহাম্মাদ নাঈম ইয়াসিন বাংলা অনুবাদ : ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক