মূল নাম কান্তজীউ মন্দির। নামটি ব্যবহৃত হতে হতে শেষ পর্যন্ত লোকমুখে কান্তজীর মন্দির নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। অপূর্ব সুন্দর একটি স্থাপনা এটি। এর অবস্থান দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে। কান্তনগর নামে পরিচিত এই এলাকার কোল ঘেষে বয়ে গেছে টেপা নদী। সারা বছর অল্পই পানি থাকে সেই নদীতে। বিশ্বকবির ‘ছোটনদী’র কথা বেশ মনে পড়বে। শান্ত-স্নিগ্ধ এখানকার জীবনযাত্রা। নদী, গাছ-পালা, সাঁওতাল ও শহুরে মানুষের মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ।
এরকম একটি প্রাণবন্ত প্রকৃতির কোলে রাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে এই মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। টানা ৪৮ বছর কাজ করে চলার পর ১৭৫২ সালে এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এই মন্দিরটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর গায়ে স্থাপনকৃত টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকের অলঙ্করণ। টেপা নদীর পাড়ে অবস্থিত এই মন্দির দেখতে প্রতিবছর দেশি-বিদেশী অসংখ্য পর্যটক-দর্শনার্থী এখানে আসেন। আন্তুরিক প্রকৃতি আর ঐতিহ্যের স্পর্শ পেতে আপনিও পা বাড়াতে পারেন কান্তনগরের পথে।
অপূর্ব এই নিদর্শন

কান্তজীর মন্দির ইট, টালি, টেরাকোটা ও কঠিন পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ভিত্তি দেয়ালে তেমন লোহার ব্যবহার নেই। তবে দরজা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে মূল্যবান কাঠ। মন্দিরে যেসব পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, অনুমান করা হয় সেসব আনা হয়েছিল হিমালয়ের তরাই অঞ্চল থেকে। এই অনুমানের তালিকায় আরো আছে আসামের পার্বত্য অঞ্চল, বিহারের রাজমহল পাহাড় বা বিনকাচল এলাকা থেকে।
মন্দিরের দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার অপূর্ব সব ফলক স্থাপন করা রয়েছে। ছাঁচ ব্যবহার করে পোড়ামাটির চিত্রিত ফলকগুলি খুবই দক্ষতার সাথে তৈরি করা হয়েছিল। সেসব টেরাকোটার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের মতো পৌরাণিক কাহিনী। চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে নারী-পুরুষ, দেবী-দেবতা, যোদ্ধা, গায়ক, বাদক, শিকারী, হাতি-ঘোড়াসহ আরো অসংখ্য চরিত্র।

কান্তজীর মন্দির দেখতে হলে হাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আসা উচিত। অতীত কাহিনীর ছবি এভাবে চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন শতশত বছর আগের শিল্পীরা। আধুনিক যান্ত্রিক সুবিধা ছাড়াই তাদের দক্ষতা প্রকাশের নমুনা বিস্মিত করে। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে মন চলে যাবে ৩’শ বছর পেছনে। শোনা যায়, মহারাজা রামনাথ এই মন্দির নির্মাণের জন্য স্বপ্নের মাধ্যমে ভগবানের আদেশ পান!
সবকিছু মিলিয়ে এই মন্দিরটি অলঙ্করণে অদ্বিতীয়। নির্মাণরীতি, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের কারণে কান্তজীর মন্দির সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়।
মন্দিরটির কাঠামোগত একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। মন্দিরের ভিত্তিমূলের দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ৩ ইঞ্চি। ভূমি সমতল থেকে ভিত্তিভূমির উচ্চতা ৩ ফুট। মেঝেতে ওঠার জন্য দুই পাশে পাঁচধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি আছে। মন্দিরের ভবনের দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট এবং আয়তন ৩ হাজার ৬’শ ফুট। মন্দিরটির উচ্চতা ৭০ ফুট। বেশ কয়েকটি ধাপ ও চূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরটির নির্মাণরীতি মধ্যযুগীয়।

১৮৭৯ সালের ভূমিকম্পে মন্দিরটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তারপরও এখন যা আছে সেটা স্থাপত্যের নির্মাণশৈলির দক্ষতাই প্রমাণ করে। আদ্দিকালের মতই এর দর্শনার্থীরা প্রথম দেখাতেই এখনও মুগ্ধ হয়ে পড়েন। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য শিল্পের অনুপম উদাহরন হিসেবে কান্তজীর মন্দির পর্যটক, গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে টেনে চলছে।
রাশমেলার রেশ জুড়ে রয়
প্রতি বছর নভেম্বর মাসে কান্তজীউ মন্দির প্রাঙ্গনে আয়োজন করা হয় রাশ পূর্ণিমা মেলার। মাসব্যাপী এই মেলায় ভীড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী আর পূণ্যার্থী। রাশ পূর্ণিমা উপলক্ষে তখন দিনাজপুরের রাজবাড়ি থেকে কান্তজী বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় মন্দিরে। সবকিছু মিলিয়ে তখন এই জায়গাটার গুরুত্ব যেন বহুগুণে বেড়ে যায়। লক্ষ লক্ষ দর্শনাথী-পর্যটকের পায়ের চাপে গুঞ্জন তোলে এখানকার মাটি। মেলায় পাওয়া যায় যাবতীয় লোকজ উপকরণ। এছাড়া প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বিচিত্র দেশজ দ্রব্য, খেলনা এসবও পাওয়া যায়। পুতুল নাচ, যাত্রা, সার্কাসের মতো প্রাচীন বিনোদনের সমাহারও ঘটে এখানে। সারা বছরই কান্তনগরের পরিবেশ শান্ত থাকলেও মেলার এক মাস থাকে বেশ সরগরম।
এলেন যখন দিনাজপুরে
কান্তজীর মন্দির দেখতে দিনাজপুরে যখন এসেই পড়লেন, তখন দেখে নেবেন এখানকার রাজবাড়ি। অযত্নে অবশ্য সেটার এখন দুরাবস্থা। এছাড়া রামসাগর নামে যে বিশাল দীঘি রয়েছে সেটাও দেখে আসতে পারেন। রামসাগরের অবস্থান তাজপুর গ্রামে। এটাকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বলা হয়। শহর থেকে এই দীঘির দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। ছিমছাম ছায়াঘেরা গাছের ফাঁকে পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে দিনাজপুর শহরের রাস্তায় বৈকালিক ভ্রমণটা বেশ লাগবে আপনার।
যেতে পারেন যেভাবে
দিনাজপুর থেকে ঢাকার দুরত্ব ৪১৪ ���িলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য রয়েছে অসংখ্য আরামদায়ক কোচ সার্ভিস। রাজধানীর গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী বাস পাওয়া যাবে। ভাড়া পড়বে ৬০০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন ধরেও দিনাজপুর যাওয়া যাবে। দিনাজপুর জেলা সদর থেকে কান্তজীর মন্দিরের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। বাসে বা ব্যক্তিগত যানবাহনে যাতায়াত করা যাবে সবচেয়ে সহজে।
থাকা-খাওয়া
দিনাজপুর শহরে অনেকগুলি আবাসিক হোটেল রয়েছে। দিনপ্রতি ২০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের রুম ভাড়া পাওয়া যায় এসব হোটেলে। খাওয়ার জন্যে বেশ কিছু হোটেল পাবেন হাতের কাছেই। রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ভাল মানের মিষ্টির দোকান আছে। এখানকার স্বাভাবিক পানি পান করা নিরাপদ। মিনারেল ওয়াটারের বাড়তি খরচটুকু না করলেও চলবে। লিচুর সিজনে গেলে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচুর স্বাদ নিতে ভুলবেন না যেন।