(প্রিয়.কম) ঢাকা তথা পূর্ববাংলার বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, আন্দোলন, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা একাডেমীর ঐতিহ্যবাহী ভবন ‘বর্ধমান হাউস’। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা যখন প্রাদেশিক রাজধানীর গুরুত্ব পেল তখন ১৯০৬ সালে পূর্ববঙ্গের গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের জন্য রমনা এলাকায় এই বাড়িটি নির্মান করা হয়। এই তথ্যানুযায়ী কার্জন হল, বর্ধমান হাউস আর হাইকোর্ট ভবন প্রায় একই সময় নির্মিত। আবার অনেকের ধারণা ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের পর এটি নির্মিত হয়।

ভবনটি অনেকটা ভিক্টোরিয়ান রীতিতে তৈরি হয়। সাদা এই দোতলা পাকা দালানটিতে অর্ধচন্দ্রাকৃতি বারান্দা, নিচতলায় নাচের বলরুম, দোতলায় ফায়ার প্লেস ও অন্যান্য সুবিধা ছিলো। এটি মূলত ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সরকারি উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও রাজকীয় অতিথিদের জন্য বাংলো হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হওয়ায় বর্ধমানের রাজা স্যার বিজয়চাঁদ ম্যাকার্থি সে সময় রাজকীয় অতিথি হিসেবে এই বাড়িতে বাস করেন। তাঁর সম্মানার্থে এই বাড়ির নাম রাখা হয় বর্ধমান হাউস। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের আবাসস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত ��য়। ১৯২৬ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউস টিউটর হিসেবে কাজী মোতাহার হোসেন বর্ধমান হাউসের দোতলার এক অংশে বাস করতেন। তাঁর আমন্ত্রতিত অতিথি হিসেবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিছুদিন এখানে এসে অবস্থান করেন। এছাড়াও রমেশচন্দ্র মজুমদারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এখানে নানা সময়ে এ ভবনে বাস করেছেন।

এরপর বর্ধমান হাউস ব্যবহৃত হয় পূর্ববাংলার সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে। প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ও দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন এ বাড়িতে বাস করতেন।
১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট থেকে ১৯৫৪-এর এপ্রিল পর্যন্ত এটি ছিল পূর্ববাংলা সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন। প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ও দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন এ বাড়িতে বাস করতেন।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গুলি চালানোর হলে মুখ্যমন্ত্রীর আবাসস্থল হওয়ায় এই বাড়িটি জনরোষে পড়ে।
বাংলার জনগণের মুক্তির সনদ হিসেবে যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাবিত ২১ দফার ষোড়শ’ দফায় প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় যে বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষার গবেষণাগারে পরিণত করা হবে। সে মতে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর আবু হোসেন সরকার কর্তৃক বর্ধমান হাউস চত্বরে বাংলা একাডেমীর উদ্বোধন হয় আর ৮ ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসের একটি অংশে বাংলা একাডেমীর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬২ সালে আদি নকশার সঙ্গে সংগতি রেখে এই ভবনের তৃতীয়তলা নির্মিত হয়।
১৯৭৮ সাল থেকে প্রতিবছর বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে এই বর্ধমান হাউসকে ঘিরে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী একুশের গ্রন্থমেলার আয়োজন হয়ে আসছে।

২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে বর্ধমান হাউসের চারটি কক্ষে স্থাপিত হয় ভাষা আন্দোলন জাদুঘর। এ জাদুঘরে এখন পর্যন্ত সংগৃহিত স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্মারকলিপি, নির্বাচিত বইয়ের প্রচ্ছদ, ভাষা সৈনিকদের রচনা, ভাষা সৈনিকদের বিভিন্ন লেখনী, আন্দোলনের ছবি, ভাষা শহীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমানে এটির প্রদর্শনী বন্ধ রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী- মুনতাসীর মামুন, বাংলাপিডিয়া, ইন্টারনেট।