ছবি সংগৃহীত

আপনার শিশুর জন্যও খোলা চারুকলার দুয়ার

তানজিল রিমন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ মে ২০১৪, ০২:৪৯
আপডেট: ০৭ মে ২০১৪, ০২:৪৯

(প্রিয়.কম) বসে বসে ছবি আঁকায় ব্যস্ত। কথা বলে মনোযোগ নষ্ট করার সময় তার নেই। বার কয়েক নাম জিজ্ঞাসা করার পরও কোনো উত্তর নেই। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে জানাল, তার নাম সানজিদা। আব্বুর সাথে এসেছে এখানে ছবি আঁকা শিখতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে আঁকাআঁকি নতুন কিছু নয়। হরহামেশাই শিক্ষার্থীরা ছবি এঁকে থাকেন। তবে যে সব ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আঁকতে দেখা যায়। এরাও এখানকার শিক্ষার্থী! অনুষদের অভ্যন্তরে শিশুদের জন্য ছবি শেখার প্রতিষ্ঠান ‘জয়নুল শিশুকলা নিকেতন’ এর শিক্ষার্থী এরা। সপ্তাহের দুই দিন ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে ইচ্ছেমত ছবি আঁকে। আর্ট স্কুল এখন পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠেছে। কিন্তু জয়নুল শিশুকলা নিকেতন ও ওই স্কুলের মধ্যে অনেক তফাৎ। এজন্যেই এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। নিকেতনের ভেতরে জায়গা ভরে গিয়ে বাইরে পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বসে বসে ছবি আঁকে। নির্ধারিত দিনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখানে আসে আঁকতে, আঁকা শিখতে। এখানে তামজিদ খান নাতালিয়া আঁকছিল ছবি। গ্রামের দৃশ্য এঁকেছে সে। দুটো ঘর, একটা নদী, নদীতে কয়েকটা হাঁস, একটা নৌকা, ফুলের বাগান, একটা মেয়ে বাগানে যাচ্ছে, গাছপালা, দূরে সূর্য উঠছে সব মিলিয়ে একটা গ্রাম ফুটিয়ে তুলেছে। ছবিতে আবার মেশাচ্ছে জলরং। নাতালিয়া পড়ে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেজিতে। পাশেই বসে আছেন মা এডভোকেট শিউলি খানম। রামপুরা থেকে তিনি মেয়েকে নিয়ে এসেছেন ছবি আঁকা শেখাতে। শিউলি খানম বলেন, ‘ও এখনো অনেক ছোট। যাতে ওর মনের প্রসার ঘটে। তার কল্পনাগুলো কিংবা সে যা ভাবে, সেগুলোই আঁকছে। সৃজনশীলতার প্রসার ঘটছে। এখানে এসে যে আনন্দ পাচ্ছে, সেটা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। আর ছবি আঁকায় ওর আগ্রহের শেষ নেই।’

তার কথার রেশ ধরেই পাশে বসা আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক অনিকা সরকার বলেন, ‘আমার বাচ্চাটা সারাদিন ছবি আঁকতেই চায়। আঁকার প্রতি ওর অনেক আর্কষণ। তাই জয়াকে এখানে নিয়ে এসেছি।’ শুধু ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহই নয়। কেউ কেউ এসেছে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে। পাইকপাড়া স্টাফ কোয়ার্টার উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর শিক্ষার্থী সুজন। বড় হয়ে সে একজন শিল্পী হতে চায়। পড়তে চায় চারুকলায়। তাই এখন থেকেই হাতটাকে ঝালিয়ে নিচ্ছে। জয়নুল শিশু নিকেতনের সামনে বসে সে আঁকছিল সূর্যমুখী ফুল। এরই মধ্যে হাতটাকে সাফাই করেছে সেটা তার জলরঙে আঁকা ছবি দেখেই বুঝা যায়। অন্যদিকে পড়াশুনার ব্যস্ততার কারনে সময় পায় না ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী কমল। কিন্তু শুক্রবার এলে আবার তার সময়ই কাটতে চায় না। তাই এই দিন সকালবেলায় চলে আসে চারুকলায়। এখানে এসে ছবি এঁকে সময় কাটায়। কমল বলে, ‘এখানের যে সুন্দর পরিবেশ। এটা কোথায় পাব বলেন? নতুন কিছু শেখার মজাই আলাদা।’ চারুকলার পরিবেশটায় চমৎকার। নিরিবিলি। মাঝে মাঝে পাখির দেখাও মিলে। গাছপালার পরিমাণও কম নয়। এখানে সেখানে রয়েছে সারিবদ্ধ ফুলের বাগান। নানান রকম ফুল ফুটে আছে গাছে গাছে। নিরিবিলি খোলামেলা এই পরিবেশ কার না ভালো লাগে! আর তাই শুক্রবার সকাল সকাল ছেলে ঋদ্ধকে নিয়ে চলে আসেন ড. সাইফুদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘ঋদ্ধ এখনো আঁকতেই পারে না। তবে পেন্সিল দিয়ে আঁকার চেষ্টা করে। এখানে সে অন্যদের ছবি দেখতে পাচ্ছে। কিভাবে আঁকে সেটা জানছে। বাইরের সুন্দর পরিবেশে খেলতে পারছে। ঢাকা শহরের বাসায় বন্দি থাকার একঘেয়েমিটা এখানে এলেই কেটে যায়। খুব মজা করে অন্যদের সাথে।’
ছবি আঁকতে এসে শুধু আঁকাই নয়। ক্ষুদে শিল্পীরা মাঝে মাঝেই খেলাধুলায়ও মেতে উঠে। তাদের খেলার জন্য এর থেকে ভালো জায়গা আর কোথায়! চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী কান্তা জানান, ‘বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের জন্য ছবি আঁকাটা অনেক দরকার। আর আমাদের এখানে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছেমত আঁকে। ইচ্ছেমত রং করে। তাদের বলে দেওয়া হয় না। এটা আঁকো, এভাবে না ওইভাবে। এতে করে ওদের মনের ভেতরে কিংবা কল্পনা জগতের ছবিগুলো আমরা পেয়ে যাই। আর ওদের কাজগুলো একেক জনের একেক রকম। এখানে এসে বাচ্চারা ধীরে ধীরে অনেক ভালো করে। তাছাড়া এখানে ছবি আঁকতে এসে তারা বাইরে খেলছে, ঘুরছে। সবার সাথে মিশতে পারছে। যা অন্য কোনো স্কুলে সম্ভব না।’ জয়নুল শিশু নিকেতন শিশুদের জন্য এক স্বপ্নপুরী। তাদের স্বপ্নের ছবিগুলোই তারা এখানে বসে কাগজে রং দিয়ে ফুটিয়ে তুলে। প্রতি শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং বৃহস্পতিবার বিকাল তিনটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুরা এখানে আসে। বসে পড়ে রং তুলি, পেন্সিল, কাগজ নিয়ে। তারাও হয়ে যায় শিল্পী। ক্ষুদে শিল্পী। জয়নুল শিশু নিকেতন ও চারুকলা প্রাঙ্গণ ভরে উঠে শিশুদের পদচারণায়।