রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য মাপার সবচেয়ে সহজ উপায় চুক্তির সংখ্যা গোনা, সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপায় মানুষের জীবনে তার প্রভাব খোঁজা। কত টাকা আসার ঘোষণা হলো, তার পাশাপাশি জানতে হয় সেই অর্থ কী শর্তে আসবে, কোথায় ব্যয় হবে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬–২৯ অক্টোবরের জাপান সফরকেও এই মানদণ্ডে বিচার করা প্রয়োজন।
সফরের দৃশ্যমান ফলাফলের মধ্যে রয়েছে ছয়টি সহযোগিতা দলিল এবং দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রায় ১০ কোটি ৮ লাখ ডলার এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য টহল জাহাজ সরবরাহে ২১২ কোটি ইয়েন (প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার) অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ঋণ, অনুদান ও সহযোগিতার সমঝোতার পার্থক্যটি স্পষ্ট রাখা জরুরি। কেননা এগুলোর আর্থিক দায় ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া এক নয়।
এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অবশ্য ঋণের অঙ্কের বাইরেও বিস্তৃত। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবরণ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত পৌঁছানো এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি আশাব্যঞ্জক। তবে ভাষার নির্ভুলতা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রক্ষেপণ, সম্পূর্ণ অর্থছাড় বা সব প্রকল্পের চূড়ান্ত আর্থিক নিষ্পত্তির ঘোষণা নয়। ফলে সরকারের দায়িত্ব হবে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর বিনিয়োগকারী, অর্থায়ন, সময়সূচি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অগ্রগতি পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা।
সফরের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ কাঠামোয় সম্প্রসারণ। জাপানের প্রকাশিত রূপরেখায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমানবন্দর, সড়ক, রেল, নৌপথ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়নের কথা রয়েছে। এর অর্থনৈতিক যুক্তি সুস্পষ্ট। একটি বন্দর তখনই উৎপাদনশীল সম্পদ হয়, যখন কারখানা থেকে পণ্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে সেখানে পৌঁছাতে পারে। পরিবহন ব্যয় কমলে রপ্তানিকারক প্রতিযোগিতায় সুবিধা পান, নতুন শিল্প স্থাপনে আকর্ষণ বাড়ে এবং স্থানীয় ব্যবসাও বড় সরবরাহব্যবস্থার অংশ হতে পারে।
ইউনিক্লোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা এই বৃহত্তর শিল্পায়ন–ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে কৃত্রিম তন্তু, বিশেষ কার্যোপযোগী বস্ত্র ও পরিবেশসম্মত পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য এই দিক গুরুত্বপূর্ণ। বেশি পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি বেশি মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা অর্জন প্রয়োজন।
জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো–অপারেশনের (জেবিআইসি) ঢাকায় কার্যালয় খোলার প্রস্তাবও সম্ভাবনাময়। স্থানীয় উপস্থিতি তৈরি হলে প্রকল্প শনাক্তকরণ, উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা বোঝা সহজ হতে পারে। বিশেষত বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থদাতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকাশিত সংবাদে এটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অনুরোধ, কার্যালয় স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক অনুসরণ এবং সম্ভাব্য অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা।
উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়নে ঋণের প্রতিশ্রুতিও অবহেলার বিষয় নয়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ রাজধানীর বাইরের মানুষের জন্য সরাসরি সুফল আনতে পারে। কিন্তু স্থানীয় উন্নয়ন মানেই কেবল নির্মাণকাজ নয়। কোন প্রকল্প অগ্রাধিকার পাবে, নাগরিকের মতামত কীভাবে নেওয়া হবে এবং নির্মিত অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ কে করবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে সহযোগিতার সুযোগকে প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কাজে লাগানো গেলে ক্ষুদ্র উৎপাদকও উপকৃত হতে পারেন।