মাথাপিছু তিন হাজার ডলার আয়ের দেশে মানুষ কেন হাঁপাচ্ছে
কাগজে-কলমে বাংলাদেশ এখন মাথাপিছু তিন হাজার ডলার আয় করা দেশ। কিন্তু বাজারের থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী কিংবা দিন শেষে মজুরি গুনতে থাকা নির্মাণশ্রমিকের কাছে এই অঙ্কের কোনো অর্থ নেই।
তাঁরা কষছেন অন্য হিসাব—আয় যতটুকু বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। এ যেন এক উল্টোপাল্টা খেলা—মাথাপিছু আয় বাড়ে, অথচ দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়ে; প্রবৃদ্ধি থমকে যায়, অথচ রাষ্ট্রের ঋণ থামে না।
বিবিএসের সাময়িক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু সেই হিসাব করা হয়েছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে; সংশোধিত হিসাবে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে থাকতে পারে। গড় আয়ের রেকর্ড তাই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার রেকর্ড নয়।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ দারিদ্র্যের হিসাব। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ; ২০২২ সালে তা নেমে আসে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে, যা ছিল দেড় দশকের অন্যতম বড় অর্জন।
কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা চার বছর বেড়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় শুধু গত অর্থবছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন।
অর্থাৎ এক দশকের অর্জন আমরা মাত্র চার বছরে অনেকটাই হারাতে বসেছি। অথচ দেশের ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো সামাজিক সুরক্ষার বাইরে।
দারিদ্র্যের এই উল্টোযাত্রার মূলে কাজের সংকট। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বেকার ২৬ লাখ ২৪ হাজার, যার মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজারই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ।
অর্থাৎ প্রতি চারজন বেকারের তিনজনই তরুণ; উচ্চশিক্ষিত বেকার প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণও ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে।
কারখানার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। শিল্প পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, যার ১৭০টি বস্ত্র ও পোশাক খাতের।
উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর হিসাবে সংখ্যাটি পাঁচ শতাধিক, আর শুধু পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কার্যাদেশ কমে যাওয়া, ঋণ ও এলসির জটিলতা আর শ্রম অসন্তোষের কারণ বহুমুখী।
কাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দামের চাপ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, অথচ মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। সামনের চিত্রও স্বস্তির নয়। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে, আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। পূর্বাভাস সত্য হলে এটি হবে প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জীবিকা নির্বাহ
- মাথাপিছু আয়