৭ নভেম্বর : জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের নতুন প্রত্যাশা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করে—জাতীয় ঐক্য ও সংহতির যে প্রত্যাশা নিয়ে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছিল, স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আমরা কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি?
রাজনৈতিক বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?
১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ ছিল গভীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা একটি দেশ। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হয় তাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ও বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৫ আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ও ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের বিদ্রোহ এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সংঘটিত হয় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। দেশের রাজনীতিতে তিনি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে আবির্ভূত হন।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তার মুক্তি কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক দর্শন ও জাতীয় পরিচয়ের ধারণা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির আনুষ্ঠানিক আবির্ভাব ঘটে।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয়, ভৌগোলিক অবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করে বৃহত্তর জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা এতে প্রতিফলিত হয়।
দলটির প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস