হুথি-সৌদি আরব সংঘাত : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এর বাইরেও চামড়া ও চামড়াজাত, পণ্য, সিরামিক, পাটজাত পণ্য এবং কৃষি পণ্যের মাধ্যমে রপ্তানি আয়ের একটা বড় অংশ দেশে আসার মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি সচল রয়েছে।
একইভাবে জনশক্তি রপ্তানি আমাদের বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই খাতে অনেক উত্থান পতন ঘটলেও ২০২৫ সালে এই খাত থেকে আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে এবং বৈদেশিক রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হলে প্রয়োজন কারখানার চাকা সচল রাখা। আর এই লক্ষ্যে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সারা বিশ্বেই অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাতে কয়েকমাস ধরে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ রয়েছে এবং কিছুদিন ধরে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা লোহিত সাগরের অপর গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী বাব এল মান্দেব দিয়েও স্বাভাবিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে সারা বিশ্বেই জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দাম যেমন প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে, শঙ্কা তৈরি হয়েছে এই অচলাবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলার।
এসব সংকটের সাথে কয়েকদিন ধরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের সাথে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাতের ব্যাপকতা। সৌদি আরবের জ্বালানি এবং বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে হুথিদের হামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৌদি নাগরিকসহ বিদেশি নিহত হয়েছে।
সারা বিশ্বের সাথে সৌদি আরবের বিমান যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে, বাতিল হয়েছে শত শত ফ্লাইট। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনা ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এখানেই শেষ নয় সংঘাতের আশু সমাধান না হলে প্রভাব পড়বে দেশটির কর্মসংস্থান, পর্যটন, ব্যবসা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। এর মাধ্যমে সেখানে অবস্থান করা লাখ লাখ বিদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান এবং উপার্জনেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। এই কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দিয়েই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং উন্নয়নশীল দেশের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে দেশকে পরিচালনা করার সবচেয়ে জুতসই উপায় হচ্ছে এদেশের বিশাল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে থাকলেও আশার বিষয়টি হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে অভিবাসী প্রেরক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ এবং দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক দিয়ে বিশ্বে আমাদের অবস্থান অষ্টম।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত রয়েছে। কেউ উচ্চশিক্ষা, কেউ স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে, কেউ ব্যবসায়িক কর্মে এবং কেউবা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এই অভিবাসীরাই দেশের অর্থনীতি এবং নিজ দেশে বসবাসরত স্বজনদের প্রতিপালন, শিক্ষা এবং চিকিৎসার মত মৌলিক বিষয় নিশ্চিতে নীরবে কেউ প্রবাসে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, আবার কেউবা পরিবার নিয়ে দেশের মায়া ভুলে দেশের জন্যই অর্থ প্রেরণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।