মানবজাতি তিনটি মহাবিপদের সম্মুখীন
২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মহাবিপদ আঁচ করতে পেরেই সাংবাদিকদের ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি বিশ্ববাসীর কাছে জরুরি বার্তা পৌঁছে দিতে চান। কারণ, তিনি মনে করছেন, মানুষের অস্তিত্ব আজ এক গভীর ও বহুমাত্রিক হুমকির মুখোমুখি। তাই আগাম সতর্ক করতে আসন্ন মহাবিপদ সংকেত দিতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের আশ্রয় নিতে চাচ্ছেন। মানবজাতির প্রতি তাঁর সতর্কবার্তায় উঠে এসেছে আসন্ন তিনটি বিপদের কথা। তিনি জানিয়েছেন, অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষে মানুষে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মানুষকে খুব দ্রুত টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির কৃষ্ণগহ্বরের দিকে।
অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রযুক্তির দানব
জাতিসংঘ মহাসচিবের এমন উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ, এ বছর সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎ ছিল অনেক বেশি উত্তাল, অনেক বেশি উন্মাদনায় অশান্ত। মানুষের বুকে কাঁপন ধরিয়েছে।
মানুষ আগুন আবিষ্কারের পর সভ্যতার এক বিশাল ধাপে উত্তীর্ণ হতে পেরেছিল। অথচ তার পর থেকে এই আগুনকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে, প্রায়ই ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেই মানুষ আজকের দিনে প্রবেশ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে এক অতি বিস্ময়কর অতি-বুদ্ধিমত্তার সভ্যতায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জ্ঞান, উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এর অনিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বহীন ব্যবহার কর্মসংস্থান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের সত্যতা, নিরাপত্তা এবং এমনকি যুদ্ধ ও অস্ত্র ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। মানুষের তৈরি বুদ্ধিমান প্রযুক্তি যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে আশীর্বাদই একসময় অভিশাপে পরিণত হতে পারে। বিপদটা সেখানেই।
৮ সেপ্টেম্বর ওপেন-এআই সদম্ভে ঘোষণা করেছিল যে তারা ‘সহস্রাব্দের অন্যতম জটিল ও প্রায় অসমাধানযোগ্য একটি গাণিতিক সমস্যা’ সমাধান করেছে। একই দিনে অ্যানথ্রোপিকের (অ্যানথ্রোপিক হলো আমেরিকার একটি শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষণা কোম্পানি।) একজন সেরা গবেষক মানবজাতির সম্ভাব্য বিলুপ্তিতে অবদান রাখতে না চেয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। কারণ, তিনি আশঙ্কা করছেন যে এআই ‘এই দশক শেষ হওয়ার আগেই আমাদের সবাইকে হত্যা করতে পারে।’ কী ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাঁর এই উক্তিতে ফুটে উঠেছে!
১১ সেপ্টেম্বর অ্যানথ্রোপিক জানায়, তাদের এআই মডেল ব্যবহার করে রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কয়েকটি প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। পরদিনই অ্যানথ্রোপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই প্রকাশ্যে এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কিছুটা ধীর করা এবং রাশ টেনে ধরার উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর এমন ভয়ার্ত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অনেকটাই সুর মিলিয়েছেন ওপেন-এআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান, গুগলের এআই প্রধান ডেমিস হাসাবিস এবং এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক।
তাঁদের ধারণা, প্রযুক্তির অতি-বুদ্ধিমত্তার এমন দানবকে নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে তা হবে সভ্যতার অপমৃত্যু। যাঁদের হাতে এই দানব প্রাণ (সত্তা) পাচ্ছে, তাঁরাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না যে এই দানব খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে কি না!
সে কারণেই মানবসভ্যতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু আর কেবল প্রকৃতির কোনো দুর্যোগ নয়; মানুষের নিজের সৃষ্টি, নিজের কর্মকাণ্ড এবং নিজের মধ্যে তৈরি করা বিভাজনও অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রযুক্তির ব্যবহার
- মানব জাতি