নানা পাটেকর: কণ্ঠ যার আরেক চরিত্র
নায়ক হওয়ার জন্য সুন্দর মুখ দরকার। তিনি মুখের বদলে নিয়ে এসেছিলেন কণ্ঠ। নায়ককে সাধারণত আকর্ষণীয় হতে হয়, তিনি অনেক সময় হয়ে উঠতেন অস্বস্তিকর। নায়ক দর্শকের ভালোবাসা চান, তিনি কখনো কখনো দর্শককে ভয় পাইয়ে দিতেন। নায়ক পর্দার চরিত্রকে নিজের দিকে টেনে আনেন, তিনি যেন নিজেকে তুলে দিতেন চরিত্রের হাতে।
তিনি ভারতীয় সিনেমার সেই তারকা, যিনি তারকা হওয়ার প্রচলিত ব্যাকরণ মেনে চলেননি। ভারতীয় সিনেমা যে ‘নায়ক’-এর চেহারা তৈরি করে রেখেছিল, নানা পাটেকর সেই ছাঁচে নিজেকে ঢোকাননি। বরং নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন আলাদা একটি জায়গা।
নানা পাটেকরের নাম মনে পড়লে প্রথমে কোনো সিনেমার নাম মনে পড়ে না। কোনো চরিত্রের নামও হয়তো সঙ্গে সঙ্গে মনে আসে না। কিন্তু একটা কণ্ঠস্বর ঠিক মনে পড়ে যায়। মাথার ভেতর বেজে ওঠে একটা গলা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মুখ, একটা শরীর, একটা বিশেষ ভঙ্গি।
কণ্ঠের ওঠানামা, শব্দের ওপর চাপ, হঠাৎ থেমে যাওয়া, তারপর একটি শব্দকে এমনভাবে ছুড়ে দেওয়া, যেন সেটি শুধু কানে এসে পৌঁছায় না, শরীরেও এসে লাগে। তিনি সংলাপ বলতেন না, সংলাপকে যেন একটি শরীর দিতেন।
২.
‘নটসম্রাট’ ছবিতে গণপত রামচন্দ্র চরিত্রের কথা মনে পড়ছে খুব। একসময়ের বিখ্যাত মঞ্চাভিনেতা, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যিনি আশ্রয়হীন। নানা পাটেকরের কণ্ঠে তার সেই আর্তি- “এক তুফানালা কুনি ঘর দেতা থা?" (‘একটা তুফানকে কেউ কি ঘর দেয়?’)
এই সংলাপের শক্তি শুধু তার শব্দে নয়, শব্দের মাঝখানে যে, কণ্ঠ ক্রমশ ভেঙে পড়ে, আবার নিজেকে সামলে নেয়, তার মধ্যেও। কোথাও বহু বছর মঞ্চে অভিনয় করা এক প্রবীণ অভিনেতার বিশেষ উচ্চারণ, শব্দের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভ্যাস। আবার কোথাও সেই কণ্ঠই হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে আসা এক বৃদ্ধ মানুষের অসহায় নিঃশ্বাস হয়ে যায়।
‘কেউ কি ঘর দেবে?’ প্রশ্নটি একই থাকে। কিন্তু প্রতিবার তার অর্থ বদলে যায়। একবার মনে হয় আশ্রয়ের আবেদন, আরেকবার যেন নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চাওয়া। শেষে প্রশ্নটি আর কোনো বাড়ির দরজায় করা প্রশ্ন থাকে না। হয়ে ওঠে পৃথিবীর কাছে এক পরিত্যক্ত মানুষের শেষ আবেদন।
এইখানেই নানা পাটেকরের অভিনয়ের বিস্ময়। তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না। কণ্ঠের ওঠানামার মধ্য দিয়ে চরিত্রটির ভেতরের জীবনটাকে শ্রাব্য করে তুলতেন। তার কণ্ঠ তাই কেবল সংলাপের বাহন ছিল না। কণ্ঠই ছিল তার অভিনয়ের আরেকটি চরিত্র।
৩.
ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে অভিনয়ের এই বহুমাত্রিকতার একটি পুরোনো ভিত্তি আছে। ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ অভিনয়ের চারটি রূপের কথা বলে: আঙ্গিক, বাচিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক। শরীর, কণ্ঠ ও বাক্য, সাজসজ্জা এবং অন্তরের অনুভূতি- এই চারটি মিলে তৈরি হয় অভিনয়ের পূর্ণতা। বাচিক অভিনয় মানে শুধু সংলাপ মুখস্থ বলে যাওয়া নয়, কণ্ঠের সাহায্যে শব্দের মধ্যে অনুভূতি ও অর্থের নানা স্তর তৈরি করা।
নানা পাটেকরের বিশেষত্ব ছিল, একই কণ্ঠে তিনি রুদ্র ও করুণ রসের দুই প্রান্তে যাতায়াত করতে পারতেন। তার কণ্ঠে রাগ ছিল, বিদ্রোহ ছিল, তীক্ষ্ণতা ছিল। আবার সেই একই কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত হাস্যরস, ক্লান্তি, অসহায়তা, কখনো গভীর বিষন্নতা। তিনি চিৎকার করেও অভিনয় করতে পারতেন, আবার চুপ থেকেও একটি দৃশ্যের সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিতে পারতেন।
নীরবতার ওপর তার দখল ছিল অসাধারণ। অথচ অভিনয়শিল্পী নানা পাটেকরকে নিয়ে আলোচনায় এই দিকটি তুলনামূলকভাবে কম আসে। নাট্যনির্দেশক ও তাত্ত্বিক পিটার ব্রুক মঞ্চের শূন্যতা ও বিরতির মধ্যেও অর্থ সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। মারাঠি মঞ্চে প্রশিক্ষিত নানা পাটেকর জানতেন, অভিনয়ে বিরতি মানে কেবল কথা না বলা নয়। কখন থামতে হবে, কতক্ষণ থামতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও অভিনয়ের অংশ।
ক্যামেরার সামনে তিনি মঞ্চের সেই বিদ্যাকে অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সংলাপের আগের নীরবতায় জমিয়েছেন হুমকি, সংলাপের পরের নীরবতায় বসিয়েছেন তার ওজন। দর্শককে সব কথা বলে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন তার হতো না। অনেক সময় তিনি চুপ করে থাকতেন, আর দর্শক সেই নীরবতার মধ্যে বিপদের উপস্থিতি টের পেতেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জীবনাবসান
- ভারতীয় অভিনেতা
- নানা পাটেকার