বাংলাদেশে কেন বিদেশি পর্যটক আসে না
বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক কেন আসে না-এ প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, আমাদের দেখানোর মতো কিছু নেই বলে নয়; বরং যা আছে, তা দেখানোর মতো একটি পর্যটনব্যবস্থা আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটি সুন্দরবন; পাহাড়, হাওড়, নদী, চা-বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শত শত বছরের ইতিহাস, অসাধারণ খাবার, লোকসংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠী এবং মানুষের সহজাত আতিথেয়তা-সবই আছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড নিজেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থান দিয়ে তৈরি হয় না, তৈরি হয় একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে। আর সেই অভিজ্ঞতার জায়গাতেই বাংলাদেশ বারবার হেরে যায়।
একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকেই একটি দেশকে পড়তে শুরু করেন। অভিবাসন ডেস্কের ব্যবহার, লাগেজ নেওয়ার ব্যবস্থা, ট্যাক্সির শৃঙ্খলা, রাস্তার পরিচ্ছন্নতা, চালকের আচরণ, দামের স্বচ্ছতা-সবই তার কাছে দেশের পরিচয়। আমাদের এখানে অনেক ক্ষেত্রে প্রথম অভিজ্ঞতাটিই হয় অনিশ্চয়তার। কে বৈধ ট্যাক্সিচালক, কত ভাড়া হওয়া উচিত, কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কে সত্যিকার গাইড-এসব বিষয়ে পর্যটকের সামনে পরিষ্কার ব্যবস্থা নেই। এর সঙ্গে যোগ হয় যানজট, শব্দদূষণ, ফুটপাত দখল, অপরিচ্ছন্ন গণপরিসর এবং অবিরাম মানুষের ভিড়। এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ বলে আমরা অভ্যস্ত; কিন্তু পর্যটকের কাছে এগুলো ‘এক্সোটিক’ নয়, নিছক ক্লান্তিকর।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো পর্যটক দেখলেই তাকে যেন একটি চলমান এটিএম মেশিন মনে করা। ‘বিদেশি পেয়েছি, এখন যত পার দাম বলো’-এ মানসিকতা পর্যটনের সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রুদের একটি। রিকশা থেকে দোকান, স্থানীয় পরিবহণ থেকে ছোটখাটো পণ্য-কখনো কখনো বিদেশি দেখলে মূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পর্যটক হয়তো একবার ঠকবেন, কিন্তু ফিরে গিয়ে তিনি দশজনকে বলবেন। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি খারাপ অভিজ্ঞতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পর্যটনশিল্পে সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা ডলার নয়-বিশ্বাস।
এর সঙ্গে আছে অনাহূত বিক্রেতা, দালাল, গাইড এবং অতিরিক্ত কৌতূহলের সমস্যা। একজন বিদেশি সমুদ্রসৈকতে হাঁটছেন, তার পেছনে বিক্রেতা; প্রত্নস্থলে গেছেন, ঘিরে ধরছে অননুমোদিত গাইড; বাজারে ঢুকেছেন, দরদামের বদলে শুরু হচ্ছে চাপ সৃষ্টি। আবার বিদেশিকে দেখলেই ছবি তুলতে চাওয়া, অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা, তাকিয়ে থাকা, ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা-এসব আমাদের কাছে নিরীহ কৌতূহল মনে হতে পারে, কিন্তু একজন পর্যটকের কাছে তা ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ। আতিথেয়তা আর অনধিকারচর্চার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আছে। আমরা অনেক সময় সেই সীমাটি বুঝি না।
আরও গভীর সমস্যা হলো সেবা খাতে পেশাদারত্বের ঘাটতি। পর্যটন মানে শুধু পাঁচতারকা হোটেল নয়। একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, ট্যাক্সিচালক, ওয়েটার, দোকানি, ট্যুর গাইড, পুলিশ সদস্য, সৈকতকর্মী-সবাই পর্যটনশিল্পের অংশ। পর্যটককে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা, সময় মেনে সেবা দেওয়া, নির্ধারিত মূল্য রাখা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার নিশ্চিত করা, ইংরেজিতে মৌলিক যোগাযোগ করতে পারা এবং অভিযোগকে বিরক্তি হিসাবে না দেখা-এসব পর্যটন অবকাঠামোরই অংশ। শুধু রাস্তা বানিয়ে পর্যটন তৈরি হয় না; আচরণের অবকাঠামোও নির্মাণ করতে হয়।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু বড় অপরাধের কথা নয়। একজন একাকী নারী পর্যটক রাতে হাঁটতে পারবেন কিনা, একজন বিদেশি ক্যামেরা নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরতে পারবেন কিনা, প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত সাহায্য পাবেন কিনা-এসবই নিরাপত্তার অংশ। শ্রীলংকা পর্যটকদের হয়রানি, প্রতারণা, চুরি ও অন্য সমস্যায় সহায়তার জন্য বিশেষ পর্যটন পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও পর্যটন পুলিশ আছে, কিন্তু তার দৃশ্যমানতা, সহজপ্রাপ্যতা, বহুভাষিক সহায়তা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিদেশি পর্যটক