বাপি শাহরিয়ারের স্মৃতি, মেহেদীর মৃত্যু এবং ‘আলালের ঘরের দুলাল’
ঘটনা দুটো গাড়িচাপায় মৃত্যুর। এই সেদিন, গেল ২৪ সেপ্টেম্বর বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ফুটপাতে একটি গাড়ি উঠে পড়েছিল। গাড়ির চালক ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। অতএব, তার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার কথা নয়। সেই সময়ে ঘামঝরানো কাজের অবসরে একটুখানি বিশ্রামের জন্য কথা বলতে না পারা (বোবা) ও শুনতে না পাওয়া (কালা) ২৪ বছরের নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান ফুটপাতে বসেছিলেন। তখনই ওই ১৭ বছরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ শখের বশে গাড়ি চালাতে চালাতে কাজের ফাঁকে একটু স্বস্তির জন্য বসে থাকা মেহেদী হাসানকে পিষে মেরে ফেলে।
মেহেদী হাসানের মৃত্যুর খবরে আরেকজনের মৃত্যুর ঘটনা মনে পড়ে গেল। একজন বন্ধু হাজার মাইল দূর থেকে ফোন করে এ নিয়ে লিখতে বললেন।
যার কথা বলা হচ্ছে, তার নাম বাপি শাহরিয়ার। হ্যাঁ, কিশোর ছড়াকার বাপি শাহরিয়ার। মতিঝিল সেন্ট্রাল গভ. স্কুলের ছাত্র ছিল ছেলেটি। তারও মৃত্যু হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সামনে গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে। বাপি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। জানা যায়, বাপিকে চাপা দেওয়া সেই গাড়িচালকের বয়সও ছিল কম এবং তারও কোনো গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছিল না। সে ছিল এরশাদ সরকারের এক হোমড়া-চোমড়া মন্ত্রীর সন্তান। হোমড়া-চোমড়ার সন্তান হওয়াই বোধহয় ছিল তার লাইসেন্স। ঠিক শ্রমিক মেহেদী হাসানের হত্যাকারীর মতোই ক্ষমতাবলে অনুমোদনহীন—অর্থাৎ লাইসেন্সহীন চালক ছিল সে।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। আজকাল অহরহ ঘটছে এমনটা। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে মোট ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন; আর সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৭,৩৬৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯,৭৫৪ জন। বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব তদারকি সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সরকারি পরিসংখ্যানেও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরা পড়েছে। বিআরটিএ পরিবেশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এক বছরে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ৫,৪৯০ জন, যা সরকারি রেকর্ডের ইতিহাসে একক বছরে সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রাণহানির ঘটনা। পূর্বে ২০১৮ সালে বিআরটিএ-র হিসেবে নিহতের সংখ্যা ছিল ২,৬৩৫ জন, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫,০৮৪ জনে, ২০২৩ সালে ৫,০২৪ জনে এবং ২০২৪ সালে তা ৫,৪৮০ জনে পৌঁছেছিল।
তবে শখের বশে কতজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক গাড়ি চালায় বা কোন পরিবার ওই বয়সের বালককে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে অনুমতি দেয়—তার হিসাব কে রাখে? তারা এ পর্যন্ত কতজনকে মেরেছে, তার খবরই বা জানে কয়জন?
বাপি শাহরিয়ার হত্যার বিচারের উদ্দেশ্যে বেআইনিভাবে গাড়ি চালানোর জন্য ওই তরুণকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল কিনা, সে খবর জানা ছিল না, রাখিনি এতকাল; তাই আজ মানুষ হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত।
তবে বারিধারায় নির্মাণ মেহেদী হাসান মারা যাওয়ার পর দুর্ঘটনায় বাপি শাহরিয়ার নিহত হওয়ার কথা আবার আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বলছে, দুর্ঘটনা ঘটানোর সময় যে মন্ত্রীপুত্রটি ছিল একজন বেপরোয়া কিশোর, এখন তিনি নিজে এখন বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডায়াসে হাত রেখে আত্মহত্যা প্রতিরোধ আর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রসারের ওপর দরদি বক্তব্য রাখেন। রাজনীতি আর ক্ষমতার এই পরিহাস দেখে মনে হয়—এমন মায়াবী বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে কি একবারের জন্যও তার মানসপটে ভেসে ওঠে সেই বাপি শাহরিয়ারের চেহারা? মনে কি পড়ে, তারই বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের মাশুল দিতে গিয়ে পঙ্গুত্বের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল এক প্রতিভাবান তরুণ?
বাপির তুলনায় মেহেদীকে ভাগ্যবান বলতে হবে, মেহেদী দুর্ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বাপি ধুঁকে ধুঁকে নিজেই নিজেকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছিল। দুর্ঘটনার ফলে বাপি শাহরিয়ারের পিঠের হাড় ভেঙে গিয়ে শরীর প্যারালাইজড হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘদিন তিনি অবর্ণনীয় শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে ওই কিশোর ছড়াকার। উপযুক্ত চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার না পেয়ে এবং পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকার মানসিক কষ্টে ও অভিমানে একপর্যায়ে বাপি শাহরিয়ার আত্মহত্যা করে না-ফেরার দেশে চলে যায়।
১৯৮৩ সালের মোটর যান আইনে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের দায়ে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল, যা ১৯৯০ সালের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তবে ১৯৯০ সালে আইনটি সংশোধন করে,সম্ভবত এরশাদ সরকারের আমলে, শাস্তির মেয়াদ অর্ধেকে নামিয়ে মাত্র ছয় মাস করা হয় এবং জরিমানার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয় ৫০০ টাকা।
বারিধারায় নিহত শ্রমিক মেহেদী হাসান দরিদ্র; তার জন্য পত্রপত্রিকায় খবর বের হচ্ছে ঠিকই, তবে কিশোর অভিযুক্ত চালকের প্রভাবশালী পরিবার গাড়ির ড্রাইভারের নাম পুলিশের এফআইআরে (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্টে) কৌশলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি বলছি না কিশোরটি অপরাধী; আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সে অভিযুক্ত। তবে ক্ষমতার দাপটে পুলিশের খাতায় তার নামের বদলে ইতিমধ্যে অন্য নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। অথচ সিসিটিভি ক্যামেরার কল্যাণে দুর্ঘটনার পরই সবাই দেখতে পেয়েছে, গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভারের সিট থেকে বেরিয়ে এসেছে ওই কিশোরটি। ক্ষমতা ও অর্থের দাপটে পুলিশ ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে এবং চলবে—এটা অবধারিত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গাড়িচাপায় নিহত