গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন গঙ্গা চুক্তি করাটাই আমাদের জন্য ভালো
ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য। পানি ব্যবস্থাপনা, পানি অর্থনীতি ও আন্তসীমান্ত পানি সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি, অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১২ ডিসেম্বর। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ এ হোসেন: বাংলাদেশের প্রস্তুতির দুটি অংশ রয়েছে। একটি কারিগরি, অন্যটি রাজনৈতিক। বাংলাদেশের যথেষ্ট কারিগরি প্রস্তুতি রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সমঝোতা বা মতৈক্য হলে আলোচনা করে চুক্তি নবায়ন অথবা নতুন চুক্তি করা সম্ভব।
১৯৯৬ সালের চুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতার কথা আলোচিত হয়। চুক্তিতে কী ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
মোহাম্মদ এ হোসেন: ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ছিল না। গ্যারান্টি ক্লজ অনুযায়ী গঙ্গার পানি যদি ফারাক্কা পয়েন্টে ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে বাংলাদেশ তার শেয়ারের ৮০ শতাংশ পাবে। অর্থাৎ কম প্রবাহ শুধু ভারত পাবে। পক্ষান্তরে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ৩৫ হাজার কিউসেকের একটি ব্যবস্থা রয়েছে। মার্চের দ্বিতীয় ১০ দিন থেকে পালাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারত ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। অর্থাৎ এক দেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পেলে অন্য দেশ বাকিটা পাবে। এতে দেখা যায়, ভারত যখন ৩৫ হাজার কিউসেক পায়, বাংলাদেশের প্রবাহ অনেক কম, এমনকি ২০ হাজার কিউসেকের কাছাকাছি হয়। এ রকম অবস্থা পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য সংকটাপন্ন হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় আগের চুক্তিটি নবায়ন, নাকি নতুন চুক্তি সম্পাদন—বাংলাদেশের জন্য কোন পথে যাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ এ হোসেন: গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন গঙ্গা চুক্তি করলে আমাদের জন্য ভালো হবে। নতুন চুক্তি না করতে পারলে বর্তমান চুক্তিটি নবায়ন করতে হবে। বর্তমান চুক্তিতে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করার সুযোগ আছে। প্রথমে চুক্তিটি নবায়ন করে পরবর্তী সময়ে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
গঙ্গা ছাড়াও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আমরা দেখছি যে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের নদীগুলো পানি পাচ্ছে না, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, জীবিকা পানির ওপর নির্ভরশীল। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে পানিবণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কতটা জরুরি? সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
মোহাম্মদ এ হোসেন: গঙ্গা ছাড়াও অন্য নদীগুলোর পানিচুক্তি করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের দেশের মোট আন্তসীমান্ত অববাহিকার ৫০ শতাংশ চুক্তির আওতায় আনতে হবে। পানিচুক্তি হলে আমরা আমাদের নদীগুলোর জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে পারি। চুক্তি না হওয়ার কারণে আমরা পানি ব্যবহারের সর্বোত্তম পরিকল্পনা করতে পারছি না। পানিচুক্তি করার জন্য আমাদের সরকারের কিছু কৌশল ও পরিকল্পনা রয়েছে। এই কৌশল ও পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের কাজ করতে হবে।
ভারতের সঙ্গে পানি নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ বারবার দ্বিপক্ষীয় সমাধানের ওপর নির্ভর করেছে। বহুপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার কাঠামো ব্যবহার করে কি বাংলাদেশ আরও কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে পারে?
মোহাম্মদ এ হোসেন: ভারতের নীতি হচ্ছে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। তাই বহুপক্ষীয় আলোচনায় ভারত রাজি নয়। তবে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নদী অববাহিকার সব দেশ একসঙ্গে পরিকল্পনা করলে নদী থেকে সর্বোত্তম সুবিধা ভোগ করা সম্ভব। ভারতকে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা সুবিধা বোঝাতে হবে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের যদি বোঝানো যায় যে বহুপক্ষীয় আলোচনায় তারা লাভবান হবে, তবে তারা আগ্রহী হবে।
শুধু ভারত নয়, চীনের সঙ্গেও আমাদের অভিন্ন নদী রয়েছে। অনেকে মনে করেন, উজানের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
মোহাম্মদ এ হোসেন: চীন, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশ যদি ব্রহ্মপুত্র নদী বেসিন কমিশন গঠন করে, তবে নদী ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হবে, নদী থেকে সর্বোচ্চ সুফল অর্জন করা যাবে। যৌথ পরিকল্পনা করলে অনেক সমস্যা সমাধান হয়। পৃথিবীতে মোট ১০১টি এ রকম নদী কমিশন রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো কমিশন নেই। এ রকম কমিশন থাকলে নদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। আমরা যদি নদী থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। আমাদের অবশ্যই নদী অববাহিকা সংস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আপনি অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কথা বলছিলেন। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
মোহাম্মদ এ হোসেন: নদী অববাহিকার দেশগুলো যৌথভাবে পরিকল্পনা করে নদীর পানি ও অন্যান্য সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়ার চেষ্টা করাই হলো নদী অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। এটি একটি উভয় পক্ষের জন্য উইন উইন সমাধান। এখানে দুই পক্ষই লাভবান হয়, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। নদী অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, মৎস্য, নৌ চলাচল, পরিবেশগত সুফলসহ নদী থেকে পাওয়া সামগ্রিক সুবিধা সর্বোচ্চ করা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গঙ্গার পানির হিস্যা