কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাক্ষরতা দিবসের গুরুত্ব প্রসঙ্গে
অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিকভাবে চরম ভারসাম্যহীন পৃথিবীর বুকে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ পালিত হয়। এ বছরও অন্তর্ভুক্তকরণ, টেকসই ভবিষ্যৎ, মানুষের জীবনধারণের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করাকে গুরুত্ব দিয়ে গোটা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে আরো এক ধাপ অগ্রসরমাণ প্রযুক্তি, যা এআই নামে পরিচিত বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। মানুষ এখন চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে যে কাজ বা চাকরি নামে পরিচিত অদূরভবিষ্যতে সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না। কারণ মানুষেরই সৃষ্ট এই প্রযুক্তি এরই মধ্যে তাদের জায়গা দখল করে বসেছে। কোনো বিষয় জানার জন্য কোনো বইয়ের দরকার হচ্ছে না, রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য মনুষ্য পুলিশ দরকার হচ্ছে না, বিশেষ কিছু খোঁজার প্রয়োজন নেই।
কারণ এই আইকে বলে দিলেই হলো। দুনিয়া সার্চ করে আপনার সামনে সমাধান নিয়ে হাজির হবে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি আর অগ্রসরমাণ জ্ঞানের ধারা মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে, আর সেখানে সাক্ষরতা বলতে যা বোঝায় তার সংজ্ঞা কী হবে বা হওয়া উচিত এবং এ নিয়ে আমাদের কাজ কী, কতটা কী করতে হবে, সেই বিতর্ক সামনে আসছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতি, আর মানবতা ও মনুষ্যত্বের চরম অবনতির যুগে কী ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, কী করতে হবে, সেটি কে বা কারা নির্ধারণ করবে? যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষার মানকেও এই দিবসটির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শুধু অক্ষর চিনতে পারা আর নিজের নাম লিখতে পারার নাম যে সাক্ষরতা দিবস নয়, তা বহু বছর আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিক্ষার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে যে মানহীন শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, সেটিকে রুখতে পারাও এই সংজ্ঞার মধ্যে ফেলতে হবে! শুধু খাতা ভর্তি করে দাগিয়ে এলেই যেখানে পাস ধরা হয়, সেটি সাক্ষরতার কোন পর্যায়ে পড়ে, সেটির ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন এই দিবসটিতে।
ডিজিটাল যুগের সঙ্গে লিটারেসির সম্পর্ক কী, সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। লিটারেসি দিবস পালনের ধারণা শুরু হয় সেই ১৯৬৫ সালে। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনের ১৪তম অধিবেশনে ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়, কিন্তু পালন শুরু হয় সেই ১৯৬৭ সালে।
জনসাধারণকে আরো শিক্ষিত, ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ এবং টেকসই সমাজ গঠনের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপট, শিক্ষাসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি, আবার মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং গণতান্ত্রিক সমাজের পরিবর্তে দেশে দেশে স্বৈরতন্ত্রের উত্থান, অনুশীলন ও চর্চা, বাণিজ্য অবরোধ, মারণাস্ত্রের প্রসার এবং নিরীহ মানুষের জীবনহানি লিটারেসির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা এগিয়েছে, কতটা সামঞ্জস্যের কাছে গেছে, সেই হিসাব কষতে হবে। এই জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের হিসাব কষতে হচ্ছে লিটারেসির অবস্থান, সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা ও কর্মপদ্ধতি।
ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৭৩.৯ কোটি কিশোর, যুবা ও প্রাপ্তবয়স্ক মৌলিক সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত, যাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী। বিদ্যালয়ে যায় না বা শিক্ষার আলো পায় না বিশ্বের কোটি কোটি শিশু, না খেয়ে ঘুমাতে যায় এবং মারা যায় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। আর এক দেশের মানুষকে হত্যার করার জন্য, পঙ্গু করার জন্য আরেক দেশ তৈরি করছে কোটি কোটি বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আর যুদ্ধবিমান! এর সঙ্গে কী সম্পর্ক এই সাক্ষরতার?
সাক্ষরতা সবার মৌলিক অধিকার, কিন্তু যে সমাজ আমরা সৃষ্টি করেছি, যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি, তাতে সাক্ষরতা ও শিক্ষা, বিশেষ করে প্রকৃত শিক্ষা, মানসম্পন্ন শিক্ষা পেছনের সারিতে অবস্থান করছে। সমতার কথা, মানবিক অধিকারের কথা, মানবতার কথাও চলে আসে সাক্ষরতার সঙ্গে। সেই দৃষ্টিকোণ দিয়ে গোটা পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা অধিকারহীনতা, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মানুষের রক্তদান, আত্মাহুতি আর জীবন-মরণ সংগ্রামই দেখতে পাচ্ছি। সেখানে লিটারেসি, ডিজিটাল লিটারেসির জায়গা কোথায়? পৃথিবীর প্রায় ৭৭৫ মিলিয়ন অধিবাসীর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞানের অভাব রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি পাঁচজনের মধ্যে এখনো একজন শিক্ষিত নন এবং এই জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই নারী। বিশ্বের প্রায় ৬০.৭ মিলিয়ন শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং আরো অনেকে অনিয়মিত বা শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বে মানবজাতির জন্য যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তার মোটামুটি সুষম বণ্টন হলেও কি বিশ্বে সাক্ষরতা তথা শিক্ষিতের এই হাল হতো? গোটা বিশ্বে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে যেসব দিবস পালন করা হচ্ছে এবং সেখানে যেসব আলোচনা হয় বা পদক্ষেপের কথা বলা হয়, তা সবই আটকে যায় ওই জায়গাটিতে। কাজেই এখন কথা বলতে হবে এগুলো নিয়ে, তা না হলে যুগ যুগ ধরে আমরা আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করে যাব, আর বিশ্বের তাবৎ অর্থনীতি যাঁরা ডিল করেন, যাঁরা মানুষ মারার মারণাস্ত্র বানিয়ে গোটা মানবজাতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেন, তাঁরা এসব জায়গায়ই বিনিয়োগ বেশি বেশি করতে থাকবেন। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ শিশুরা যখন মা-বাবা, বাড়িঘর সব হারিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে তার কাছে কেউ নেই, তার সামনে-পেছনে ঘন অন্ধকার, ক্ষুধার জ্বালায় হাড্ডির সঙ্গে চামড়া লেগে গেছে, সেই অবস্থায় ত্রাণের জন্য কারোর সঙ্গে গিয়ে গুলি খেয়ে আসতে হয়, সেই গ্রহে কিসের লিটারেসি, কাদের লিটারেসি, কেন লিটারেসি, এই লিটারেসির মানে কী, সেই উত্তর আমাদের বের করতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস