গাজী নজরুল এমপি আছেন, এমপি নেই
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এখনও এমপি আছেন কি না—সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। কেননা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলাম আইনত এখনও সংসদ সদস্য থাকলেও, এখানে নৈতিকতার প্রশ্নটি মূল হয়ে সামনে আসছে। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বাকি ২৪৮ জনের মতো পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু সংসদ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে তিনি তার নির্বাচনি এলাকায় এমপি হিসেবে কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন না; বরং তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।
গত ২০ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনও তিনি সংসদে উপস্থিত হননি এবং ভোট দেননি। অথচ তিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই জামায়াত মনোনীত প্রার্থীও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সংসদে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও এখনও প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি অংশ নিচ্ছেন। অর্থাৎ বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রশ্ন করছেন—যেগুলো সংসদের নিয়ম অনুযায়ী লিপিবদ্ধ হচ্ছে। তার মানে তিনি সংসদে আছেন, আবার নেই। সর্বশেষ সোমবার সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের সুপারিশে জাতীয় সংসদের একটি সংসদীয় কমিটি থেকেও তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এখন যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো—গাজী নজরুল আইনত সংসদে থাকলেও নৈতিকভাবে তিনি আর এমপি আছেন কি না? আইনতই বা তিনি কতদিন এমপি থাকতে পারবেন এবং তার ব্যাপারে সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত?
নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার সুযোগ কতখানি? জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের অভিযোগ উঠলে বা প্রমাণিত হলে জনগণ তার শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে কি না? জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট দল তাকে বহিষ্কার করলেও জনগণ তার ব্যাপারে কোনো রায় দিতে পারে কি না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেভাবে ‘রিকল’ সিস্টেম চালু আছে, বাংলাদেশে কেন সেই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই—বর্তমানে এরকম নানান প্রশ্ন উঠেছে।
প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে সামাজিক মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপনের পর এ নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা, দল থেকে তার বহিষ্কার এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক হয়। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতার পরামর্শে তাকে বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
গাজী নজরুল যে কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, সেটি কোনো ফৌজদারি দণ্ডনীয় অপরাধ নয়; বরং সামাজিক দৃষ্টিতে নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। আবার নারীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেরকম ঘটনা আরও অনেকে করলেও সবার ঘটনার ভিডিও সামনে আসে না বা থাকলেও সেগুলো প্রচার হয় না বলে তাদের নিয়ে আলোচনা হয় না। তাদের নৈতিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। তার মানে গাজী নজরুল যাই করুন না কেন, ভিডিও ভাইরাল না হলে দল হয়তো তাকে বহিষ্কার করত না।
তাছাড়া শুরুর দিকে ওই ভিডিও বানানো বা ভুয়া—এমন দাবিও করা হয়েছিল। কিন্তু যখন প্রমাণিত হলো যে এটি ভুয়া ভিডিও নয়, তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে জামায়াত তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু আইনত তিনি এমপি পদে বহাল আছেন। কারণ যেসব কারণে কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়, তার মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার কোনো কারণ নয়।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদে কেউ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কী হবে, সেটি স্পষ্ট নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংসদ সদস্য পদ
- নৈতিক স্খলন