কেমনে গাঁথে কালচারেরও মালা
‘শোন গো রূপসী কন্যা গো, কার লাগিয়া গাঁথো ফুলের মালা?’ আবদুল আলীমের এই মিঠা গান শুনতে শুনতে মাথায় অনেক প্রশ্ন এলো। সেই প্রশ্নগুলোর সূত্র ধরে সামনে হাঁটতে হাঁটতে আমি কালচার আর হেজিমনির আরও অনেক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। আজকের লেখায় সেই প্রশ্নগুলো নিয়েই একটু হাঁটাহাঁটি করি।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবদুল আলীম, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়-তারা কিন্তু মোটামুটি একই সময়ের শিল্পী। একই দুনিয়ার মানুষ, প্রায় একই সময়ে গ্রামোফোনে রেকর্ড করছেন, রেডিওতে গাইছেন। এমনকি আবদুল আলীম আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জন্মও একই বছর, ১৯৩১ সালে। অথচ আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস একজনকে মনে রাখছে ‘লোকশিল্পী’ হিসাবে, আর আরেকজনকে ‘আধুনিক গানের শিল্পী’ হিসাবে।
কেন? শুধু সুরের কারণে? মানে একদল অনেক বছর ধরে চলে আসা সুর থেকে গান করেছেন এবং আরেক দল অধুনা তৈরি হওয়া সুর? সেটাও তো ঠিক মিলে না। তাহলে তো রাগাশ্রয়ী গান আরও অনাধুনিক, মানে আরও অনেক আগের।
এখানেই আমার প্রশ্নটা আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার। ‘আধুনিক’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থই তো অধুনা, কনটেম্পোরারি। যদি বিশ শতকে নতুন করে লেখা এবং নতুন করে সুর করা একটা গানকে আমরা ‘আধুনিক গান’ বলি, তাহলে একই সময়ে নতুন করে লেখা এবং সুর করা আরেকটা গান শুধু তার সুরের মধ্যে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া বা অন্য কোনো দেশজ সংগীতের ফ্লেভার আছে বলে ‘লোকগান’ হয়ে যায় কীভাবে?
বিশ শতকের অসংখ্য আধুনিক গানের মধ্যে রাগসংগীতের ইনফ্লুয়েন্স আছে। রাগ তো আরও বহু পুরোনো সংগীতধারা। কিন্তু একটা নতুন কম্পোজড সং রাগের মেলোডিক ভোকাবুলারি ব্যবহার করলে সে ‘আধুনিক’ই থাকে। তাহলে আরেকটা নতুন কম্পোজড সং ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়ার মেলোডিক ভোকাবুলারি ব্যবহার করলে সে কেন ‘লোকগান’ হয়ে যায়? এ জায়গায়ই আমার মনে হয় প্রশ্নটা শুধু সুরের থাকে না।
‘শোন গো রূপসী কন্যা গো, কার লাগিয়া গাঁথ ফুলের মালা’-এটা তো কোনো নাম না-জানা, শত শত বছর মুখে মুখে চলে আসা গানও নয়; একজন পেশাদার শিল্পী আবদুল আলীম গানটি রেকর্ড করছেন। তাহলে একে লোকগান বানাচ্ছে কে? ‘কার লাগিয়া’, ‘কইরা’, ‘আইল’-এই ভাষা? একই সুর রেখে যদি কথাগুলো হতো ‘কার জন্য’, ‘করে’, ‘এলো’, এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানটা গাইতেন, আমরা কি তখনো এটাকে লোকগান বলতাম?
আবার শচীন দেববর্মণের কথা ধরি। তার সুরের অনুপ্রেরণায় ভাটিয়ালি, ধামাইল এগুলো আছে। ভারতীয় রাগসংগীতের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের এই দেশজ সংগীতধারাগুলোর একটা ফিউশন কোথায় যেন টের পাওয়া যায়। তিনি সম্ভবত ফিউশনের পারফেক্ট এগজাম্পল। তাছাড়া ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির সুর দেশজ বলে যদি আবদুল আলীম বা আব্বাসউদ্দীন লোকশিল্পী হয়ে যান, তাহলে শচীন দেববর্মণের অসংখ্য গানে দেশজ বা লোকজ সুরের প্রভাব থাকার পরও তিনি কেন ‘আধুনিক’?
আবার দেখেন, গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’-এই গানের মধ্যে লালনের ‘মনের মানুষ’-এর ভাবজগতের একটা স্পষ্ট ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই। গগনের এ গানকে আমরা বলছি ফোক। অথচ এই গানের সুর নিয়েই রবীন্দ্রনাথ যখন ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখলেন, তখন সেটা আর ফোক থাকল না-সেটা রবীন্দ্রনাথের গান, রবীন্দ্রসংগীত, এবং পরে আমাদের জাতীয় সংগীত। একই সুর গগনের হাতে ফোক, রবীন্দ্রনাথের হাতে এসে মেইনস্ট্রিম বেঙ্গলি ক্যাননের অংশ। এ জায়গাটাই আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য