দলবাজ আর দলদাসের মধ্যে পার্থক্যটা সূক্ষ্ম
বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে বৈচিত্র্য আছে। অনেক শব্দ আমরা অহরহ ব্যবহার করি। আবার কিছু শব্দ ব্যবহার করি কালেভদ্রে। তবে ব্যবহারিক জীবনে নতুন শব্দের অন্বেষণ শেষ হয়নি। আমরা প্রায়ই একাধিক শব্দের মেলবন্ধন ঘটিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করি। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। একেকটি ঘটনা আমাদের শব্দভান্ডারে কিছু নতুন শব্দ ঢুকিয়ে দেয়। শব্দগুলো প্রকৃত অর্থে নতুন নয়। হয়তো অন্যভাবে ব্যবহার করা হতো। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেটি নতুন অর্থ নিয়ে আমাদের সামনে আসে।
আমরা একটা উদাহরণ দিতে পারি। আঠারো শতকে মীর জাফর আলী খান নামের এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সুবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মীয় এবং সেনাপতি। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নবাবকে গদিচ্যুত ও হত্যা করান। ইতিহাসে তিনি ‘বেইমান’ বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে পরিচিত। এর পর থেকে ‘মীরজাফর’ শব্দটি বিশ্বাসঘাতকের সমার্থক হয়ে যায়। বর্তমান ইরাকে ‘কারবালা’ নামে একটা জায়গা আছে। সপ্তম শতাব্দীতে এখানে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। অনেক মানুষ নিহত হয়েছিলেন। ঘটনাটি বিয়োগান্ত ও বেদনাদায়ক। আমরা এখনো এ ধরনের কিছু ঘটলে বলি—কারবালা হয়ে গেছে।
রাজনীতির মাঠে অনেক শব্দ চালু আছে। আমরা জানি ‘দল’ বলে একটি শব্দ আছে। কিছু লোক রাষ্ট্র নিয়ে ভাবেন। তাঁরা কিছু লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, কথা বলেন। আমরা তাদের বলি রাজনৈতিক দল। দল-সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে কিছু শব্দ চালু আছে, যেমন দলবাজ। দলের নেতা বা কর্মীর একটা অর্থ ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ‘দলবাজ’ শব্দটির আছে আলাদা মোজেজা।
দল করাটা খারাপ নয়। কিন্তু দলবাজি খারাপ অর্থেই ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি কোনো দলের সঙ্গে থাকেন ও কাজ করেন, আমরা তাঁকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিনি। তিনি পরিচিত হন ‘দলীয় লোক’ হিসেবে। কিন্তু ‘দলবাজ’ বলতে আমরা বুঝি দলের নাম ভাঙিয়ে ধান্দা করে বেড়ানো কিছু মানুষ, যারা না বোঝে রাজনীতি, না বোঝে দল।
দলবাজি যখন জেঁকে বসে, তখন দল আর দল থাকে না। এটি পরিণত হয় একটি সিন্ডিকেটে, যার কাজ হলো রাজনীতির নামে মানুষ পেটানো, চাঁদাবাজি, অন্যের সম্পদ দখল ইত্যাদি। কয়েক মাস আগে পরিবহন সেক্টরে চাঁদা তোলার ব্যাপারটিকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে একজন মন্ত্রী এর একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ওই মন্ত্রীর কথায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল—চাঁদাবাজি আছে, কিন্তু সেটি মন্দ নয়; ভালো, স্বেচ্ছামূলক।