চাকরি নেই, চাকরিও থাকছে না
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়ে দিনের পর দিন চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজছেন। আরেকজন শ্রমিক, বহু বছর একটি কারখানায় কাজ করার পর হঠাৎ হাতে পাচ্ছেন ছাঁটাইয়ের চিঠি। দুজনের গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের উৎকণ্ঠার জায়গাটি একই—কাজ নেই, কিংবা কাজ থাকলেও তার নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বর্তমান বাস্তবতা যেন এই দুই বিপরীত চিত্রকে একই ফ্রেমে এনে দাঁড় করিয়েছে।
একদিকে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে, বিনিয়োগ স্থবির হচ্ছে এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানও সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কসংকেত আর কী হতে পারে?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধের ফলে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।
এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। ৬১ হাজার ৮৮১টি পরিবারের জীবনে এর অর্থ হলো আয় কমে যাওয়া, সন্তানের পড়াশোনা অনিশ্চিত হওয়া, বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু শ্রমিকের চাকরিই যায় না; তার ওপর নির্ভরশীল দোকানদার, পরিবহনকর্মী, খাবারের দোকান, ভাড়াবাড়ির মালিক থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতির বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। কর্মসংস্থান হারানোর অভিঘাত তাই সরাসরি চাকরির সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এই কর্মসংস্থান সংকোচন ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষিত; আরেক অংশ কারিগরি বা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁদের প্রত্যাশা—একটি সম্মানজনক কাজ। কিন্তু অর্থনীতি যদি নতুন কাজ সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে জনমিতিক সুবিধা ধীরে ধীরে জনমিতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
সিপিডির তথ্য বলছে, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।
এসব সূচকের প্রতিটিই আসলে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিল্পে নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন কারখানা হবে না; নতুন কারখানা না হলে নতুন চাকরিও তৈরি হবে না। বিদ্যমান শিল্পে উৎপাদন কমলে মালিকপক্ষ খরচ কমানোর পথ খুঁজবে। আর সেই খরচ কমানোর প্রথম আঘাত অনেক সময় গিয়ে পড়ে শ্রমিকের ওপর।