শরীরের কথা নাকি ব্যক্তিগত গল্প : নীরবতা, ক্ষত, রক্ত ও প্রেমের ভাষা

প্রথম আলো আনুশেহ অনাদিল প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৬

এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছি। কিছু সত্য ব্যক্তিগত বলেই শুধু বলা কঠিন নয়; তাদের কাছে ফিরে গেলে বহু বছর আগের নিজেরই একটি ছোট্ট সংস্করণের মুখোমুখি বসতে হয়। আজও সেই শিশুটির কাছে ফিরে গেলে চোখে জল আসে। তবু লিখছি।


করুণা পাওয়ার জন্য নয়। লিখছি, কারণ পৃথিবীর অসংখ্য মেয়ে, ছেলে, নারী ও পুরুষের শরীরের ভেতর এমন না-বলা ইতিহাস আছে। শরীর, রক্ত, আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, নির্যাতন—সবকিছুর চারপাশে আমরা এত ‘চুপ’ বসিয়ে দিয়েছি যে যার সঙ্গে অন্যায়টি ঘটে, অনেক সময় সে-ই জানে না তার অভিজ্ঞতার ভাষা কী।


এই ব্যথার কথা আমি বাইরে থেকে শুনিনি। ঠিক কত বছর বয়স ছিল মনে নেই—ছয় কি সাত। শুধু জানি, এতটাই ছোট ছিলাম যে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সম্মতি—এসব শব্দ তখনও আমার পৃথিবীতে জন্মায়নি।


ঘটনাটি জাপানে। একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মানুষ, যাঁকে কোনো কারণে আমার পরিবার বিশ্বাস করেছিল। ঘরটি মনে নেই। দিনটি মনে নেই। কীভাবে তাঁর সঙ্গে একা হয়েছিলাম, তাও মনে নেই। কখনো মনে হয়, হয়তো কোনো চলন্ত বাসে ছিলাম; স্মৃতির ভেতর আজও চারপাশ দ্রুত ছুটে যাওয়ার একটি অনুভূতি আছে। সত্যিই কি কিছু চলছিল, নাকি আতঙ্কে আমার ছোট্ট পৃথিবীটাই দুলছিল—জানি না।


আর মনে আছে সালফারের মতো তীব্র, অচেনা একটি গন্ধ। স্মৃতি অদ্ভুত। সে পুরো ঘটনা রেখে দেয় না। সময় মুছে দেয়, স্থান মুছে দেয়, দৃশ্য হারিয়ে ফেলে—অথচ রেখে দেয় একটি গন্ধ, একটু গতি, কিছু অনুভূতি। কিন্তু ভয়টা মনে আছে। মনে আছে, তিনি আমার চুল শক্ত করে ধরে আমাকে এমন একটি যৌন কাজে বাধ্য করেছিলেন, যা আমি চাইনি, বুঝিনি—যা কোনো শিশুর জীবনে আসারই কথা নয়।


তারপর মনে আছে বমি। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। ছোট্ট শরীরজুড়ে এমন এক ব্যথা, যার অর্থ বোঝার বয়স আমার ছিল না। যে ঘটনার অর্থ বোঝার ভাষা আমার ছিল না, তার ব্যথা আমার শরীর ততক্ষণে শিখে ফেলেছিল। শিশুমন তখনও জানত না কী ঘটেছে; শরীর তার আগেই জেনে গিয়েছিল—কেউ তার সীমানা ভেঙে গেছে।


এর পরের অংশ ঝাপসা। হয়তো বাবা-মাকে বলেছিলাম শরীর ভালো লাগছে না। হয়তো তাঁদের সামনেও বমি করেছিলাম। জানি না। সেই ‘মনে নেই’-টুকুও আমার স্মৃতির সত্য। মনে আছে, আমাকে বলা হয়েছিল—বাবা-মাকে যেন না বলি। আমি সম্ভবত বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দুটি ভয় পাশাপাশি জন্ম নিয়েছিল। বললে বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবেন—আমি তাঁদের কষ্ট দিতে চাইনি। আবার তাঁরা যদি সেই মানুষটিকে প্রশ্ন করেন? যদি তিনি জেনে যান আমি বলে দিয়েছি? যদি ফিরে এসে আরও আঘাত করেন?


শিশুর ভয় যুক্তির ব্যাকরণ জানে না। তাই চুপ করেছিলাম। যে শিশুটির ছুটে গিয়ে কারও কোলে আশ্রয় নেওয়ার কথা, সে উল্টো ভাবছিল কীভাবে নিজেকে এবং বাবা-মাকে রক্ষা করবে। কোনো শিশুর এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাওয়ার কথা নয়। আমি আমার বাবা-মাকে দোষ দিই না। তাঁরা আমাকে ভালোবাসতেন। তাঁদের প্রজন্মের অনেক বাবা-মায়ের মতো হয়তো তাঁরাও জানতেন না—শিশুকে তার শরীরের ভাষা শেখানোও ভালোবাসার একটি উপায়।


শুধু ‘কিছু হলে আমাকে বলবে’ যথেষ্ট নয়। একটি শিশুকে জানতে হবে—তোমার শরীর তোমার। কেউ তার সীমানা ভাঙলে দোষ তোমার নয়। আমি তোমাকে শুনব, বিশ্বাস করব, নিরাপদ রাখব। আমাকে রক্ষা করা তোমার কাজ নয়; তোমাকে রক্ষা করা আমার কাজ। আমরা নিষ্পাপতার সঙ্গে অজ্ঞতাকে গুলিয়ে ফেলেছি। অথচ শরীরের সহজ, সুন্দর, সত্য ভাষাটি না শেখানোই কখনো শিশুকে অন্যের বিকৃত ভাষার সামনে অসহায় করে দেয়।


শৈশবের সেই অসহায়তা আমার ভেতরে আরেকটি জিনিসেরও জন্ম দিয়েছিল, প্রতিরোধ। কৈশোরে একা চলতে গিয়ে একাধিকবার পুরুষের যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছি। এমন মুহূর্ত এসেছে যখন চিৎকার করেও সাহায্য পাইনি। আমাকে বাঁচতে হয়েছে নিজের গলার সমস্ত শব্দ দিয়ে, দাঁত দিয়ে, হাতের কাছে যা পেয়েছি তা দিয়ে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও