আগে কোনটা চাই, বিনিয়োগ নাকি আর্থিক সাক্ষরতা
আগে ব্যাংকে টাকা জমাতে হবে, নাকি বিনিয়োগ করতে হবে—এই আলোচনা জোরালো হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি যে সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা নীরবে ক্ষয় করে দেয়, আর নিছক টাকা জমানো যে সম্পদ বৃদ্ধির যথেষ্ট কৌশল নয়—এই বার্তা সময়োপযোগী এবং অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও আধুনিক মুদ্রা অর্থনীতির অন্যতম পথিকৃৎ ইরভিং ফিশার, নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান কিংবা আধুনিক অর্থনীতির জনক হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত অ্যাডাম স্মিথের তত্ত্বের আলোকে যুক্তি সাজালে বিনিয়োগের বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে নিখুঁত মনে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি বিনিয়োগের কথা বলার আগের ধাপটি; অর্থাৎ আর্থিক সাক্ষরতার ধাপটি পার হয়ে এসেছি?
আর্থিক শিক্ষার ধারণা নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষদের অন্যতম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ১৭৩৭ সালে তাঁর বার্ষিক পঞ্জিকা পুওর রিচার্ডস অ্যালমানাক-এ ‘যাঁরা ধনী হতে চান, তাঁদের জন্য কিছু পরামর্শ’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।
সেখানে তিনি লেখেন, এক পয়সা বাঁচানো মানে দুই পয়সা লাভ; প্রতিদিন সামান্য খরচ বাঁচালে বছর শেষে তা জমে হয় বড়।
সেই সময় স্কুলে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার কোনো পাঠ ছিল না, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও ছিল না কোনো কাঠামোবদ্ধ আর্থিক শিক্ষা।
অথচ তারও প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে, ১৪০১ সালে বার্সেলোনা নগর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন পাবলিক ব্যাংক ‘তাউলা দে কানভি’ বা ‘ব্যাংক অব বার্সেলোনা’—যা আধুনিক ব্যাংকিং কাঠামোর সূচনা বিন্দুগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঊনবিংশ শতকে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয় ও ঋণের ধারণা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ গ্লোবাল ফিনডেক্স জরিপ বলছে, বিশ্বের ৭৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এখন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট আছে—যা ২০১১ সালে ছিল মাত্র ৫১ শতাংশ।
বৈশ্বিকভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে এক বিস্ময়কর অগ্রগতি। কিন্তু হিসাব থাকা আর সেই হিসাব বুঝে ব্যবহার করতে পারা এককথা নয়।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো–অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক জরিপে মাত্র ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিজেদের আর্থিক জ্ঞানকে ‘উচ্চমানের’ বলে জানিয়েছেন।
অ্যাকাউন্ট খোলা আর আর্থিক সাক্ষরতা অর্জন করা—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান তাই বৈশ্বিকভাবেই এখনো বিশাল।
সংখ্যাগুলো যা বলে
বাংলাদেশের চিত্র এই বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি তীব্রতর রূপ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের ৫৩ শতাংশের বেশি মানুষের ব্যাংক হিসাব থাকলেও প্রায় ৩ কোটি মানুষ আজও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, দেশের সাধারণ সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭ হলেও আর্থিক সাক্ষরতা মাত্র ২৮ শতাংশ; অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ এখনো মৌলিক আর্থিক ধারণা থেকেই দূরে।
দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতেও এই সংখ্যা হতাশাজনক—ভারত ২৭ শতাংশ, পাকিস্তান ২৬ শতাংশ আর শ্রীলঙ্কা এগিয়ে আছে ৫৭ দশমিক ৯ শতাংশে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো এই সূচকে সবচেয়ে এগিয়ে—প্রায় ৭১ শতাংশ নিয়ে, যা দেখিয়ে দেয় ব্যবধানটি ঠিক কতটা গভীর।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিনিয়োগ
- আর্থিক সাক্ষরতা