আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট জনসংখ্যা নাকি সুশাসন?
একসময় বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও দরিদ্র দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশ্লেষণে প্রায়ই বলা হতো, এত সীমিত ভূখণ্ডে এত বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিদেশি অর্থনীতিবিদদের অনেকেই জনসংখ্যাকে দেশের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলেছে। যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছিল, সেই দেশই আজ খাদ্য উৎপাদন, তৈরি পোশাকশিল্প, নারীর ক্ষমতায়ন, টিকাদান কর্মসূচি, ক্ষুদ্রঋণ এবং মানব উন্নয়নের নানা সূচকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জনসংখ্যা নিজে কখনো সংকট নয়; সংকট হলো সেই জনসংখ্যাকে দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করতে না পারা। আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই জনসংখ্যার আকার নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মান। আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সুশাসন নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সচেতনতা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশের মোট প্রজনন হার প্রতিস্থাপন-স্তরের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অর্থাৎ জনসংখ্যা বিস্ফোরণের যে আশঙ্কা একসময় ছিল, তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু একই সময়ে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে—দ্রুত নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
সুশাসন বলতে কেবল দুর্নীতির অনুপস্থিতিকে বোঝায় না। এটি একটি বিস্তৃত ধারণা, যার মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষ প্রশাসন, ন্যায়ভিত্তিক সেবা, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরে Worldwide Governance Indicators-এ যে ছয়টি সূচকের কথা বলছে—জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারি কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রণের মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—এসবই মূলত একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দারিদ্র্য হ্রাস, ডিজিটাল সেবা এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের গতি যত বাড়ছে, সুশাসনের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। কারণ উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। দুর্বল প্রতিষ্ঠান নিয়ে বড় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হলেও সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুশাসনের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায়। একজন মানুষ জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে ভূমি রেকর্ড, পুলিশি সেবা, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা, পৌরসেবা কিংবা কর প্রদান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। যদি এসব সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অসচ্ছতা, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্বব্যাংক এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের বিভিন্ন সূচক বহু বছর ধরে দেখিয়ে আসছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দুর্নীতি ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অন্যতম বড় বাধা। বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। দুর্নীতি শুধু অর্থের অপচয় ঘটায় না; এটি যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবকে প্রতিষ্ঠিত করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, সেবার মান কমায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংকট
- সুশাসন
- জনসংখ্যা বৃদ্ধি