১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে মিলতে পারে ৫ লাখ কোটি টাকার গ্যাস
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে পেট্রোলিয়াম জিওফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন। বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকটের কারণ, সংকট থেকে উত্তরণের উপায়, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়ন, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো: গ্যাস না থাকায় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গোটা অর্থনীতি ও জনজীবনে জ্বালানিসংকটের ধাক্কা এসে লেগেছে। এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো?
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বর্তমান জ্বালানিসংকটের প্রধান কারণ হলো, আমাদের গ্যাসের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানির ক্ষেত্রেও কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ২টি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি সমস্যা দেখা গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের যে পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা, সেই অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের গ্যাসের উৎপাদন কেন কমে গেল? এখানে একটা বিষয় বলা প্রয়োজন যে, সীমিত সম্পদ ও সীমিত জনবল সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, ২০০০ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদনের যে ধারাবাহিকতা ছিল, সেটি ধরে রাখা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও আগেই ভয়াবহ হতে পারত। তবে আমরা ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজ করতে পারিনি; অর্থাৎ দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, সে ক্ষেত্রে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
প্রথম আলো: একটা সময় শোনা যেত, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। কেউ কেউ পাইপলাইনে করে গ্যাস রপ্তানির কথাও বলেছিলেন। অথচ বর্তমান যে জ্বালানিসংকট, তার মূলে রয়েছে গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা। এই আমদানিনির্ভরতার বিকল্প কী ছিল না?
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: বিকল্প অবশ্যই ছিল। সবচেয়ে বড় বিকল্প ছিল দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান আরও বাড়ানো এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
তবে ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’—এ ধরনের মন্তব্যকে আমি বাস্তবসম্মত মনে করি না। কোনো ভূতত্ত্ববিদ তথ্য-উপাত্ত, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বাস্তবভিত্তিক মডেলিং ছাড়া এমন মন্তব্য করবেন বলে আমার মনে হয় না। কেননা, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি অসংখ্য অনিশ্চয়তায় ভরা। এটা মোকাবিলা করেই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
বাংলাদেশে যেসব গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফল। আমাদের দেশ আয়তনে খুব বড় নয়। তবে কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক কাজ হয়েছে, তবে আরও অনেক কিছু করার সুযোগও আছে। এখানে চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রথম আলো: আমরা দেখছি, ২০১৬-১৭ সাল থেকেই গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে। আমাদের গ্যাসের মজুত কি ফুরিয়ে আসছে?
আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া: গ্যাসের মজুত অসীম নয় এবং এটি নবায়নযোগ্যও নয়। ফলে একসময় এটি ফুরিয়ে যাবে—এটাই চিরন্তন সত্য।
আমরা এখন পর্যন্ত যতটুকু গ্যাস আবিষ্কার করেছি, সব মিলিয়ে তা প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি এবং আরও বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে গ্যাসের চাহিদাও ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এ কারণেই একটা নির্দিষ্ট সময় পর গ্যাসের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
তবে আমাদের আরও বেশি গ্যাস অনুসন্ধান করা দরকার ছিল। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান দেখলে, এখন প্রতি ৮ থেকে ১০টি কূপ খনন করে একটি কূপে সফলতা পাওয়ার হারকে মোটামুটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। বাংলাদেশে এই সফলতার হার প্রায় ৩:১। তাই ব্যর্থতার আশঙ্কায় গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
আমাদের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র ও এর আশপাশের এলাকা এবং সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে যত সিসমিক ডেটা, অন্যান্য ভূ-ভৌত তথ্য-উপাত্ত এবং আগে খনন করা কূপগুলোর তথ্য রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করা হয়েছে। এই কাজের সঙ্গে বাপেক্স, পেট্রোবাংলার আওতাধীন প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে কয়েক ধাপে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও এসে এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে। এর ভিত্তিতে নানা সময়ে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর র্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উত্তরণ
- জ্বালানি সংকট