চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র: ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ঝুঁকি
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়ই একটি প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে, দেশটি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, নাকি অন্য কোনো শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকবে? প্রশ্নটি আকর্ষণীয়, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য খুব উপযোগী নয়। কারণ, আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থায়ী আনুগত্যের ওপর নয়, স্বার্থের নির্দিষ্ট বিনিময়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
একই রাষ্ট্র নিরাপত্তায় এক দেশের, প্রযুক্তিতে আরেক দেশের, বাণিজ্যে তৃতীয় দেশের এবং শ্রমবাজারে চতুর্থ দেশের অংশীদার হতে পারে। বাংলাদেশেরও এখন বন্ধু নির্বাচনের পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক অংশীদারত্বের মানচিত্র তৈরি করা দরকার।
এই প্রয়োজন আরও জরুরি হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। এ উত্তরণ মর্যাদার, কিন্তু একই সঙ্গে কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা, বিশেষ বাজার প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে।
দেশের রপ্তানি এখনো অল্প কয়েকটি বাজার ও তৈরি পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল বস্ত্রপণ্য, একই সময়ে পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ বাংলাদেশের কূটনীতির পরবর্তী পর্যায়ে বাজার, দক্ষতা, প্রযুক্তি, চলাচল ও জ্ঞান অর্জনের পরিমাপযোগ্য ফল থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ভারত, এটি আবেগের সিদ্ধান্ত নয়, ভূগোলের বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের স্থলসীমান্তের প্রায় পুরোটাই ভারতবেষ্টিত; নদী, সীমান্ত, বিদ্যুৎ, সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ এবং নেপাল-ভুটানে বাংলাদেশের প্রবেশ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারত অপরিহার্য।
কিন্তু সম্পর্ক মানে একমুখীনির্ভরতা নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে এমন কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে সহযোগিতার সুফল দৃশ্যমান ও পারস্পরিক হয়। অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো হতে পারে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্তে বেসামরিক প্রাণহানি বন্ধ, রেল ও নৌসংযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি–বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভিসা সহজীকরণ এবং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস।
দক্ষিণ এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ অঞ্চলটির নিজেদের মধ্যে হয়, অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমান ২৩ বিলিয়ন ডলারের আঞ্চলিক বাণিজ্য অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের ভারতমুখী রপ্তানিও বহুগুণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক সরকারগুলোর ঘনিষ্ঠতা দিয়ে বিচার না করে বাজার, পানি, সীমান্ত ও যোগাযোগে অর্জিত ফল দিয়ে পরিমাপ করতে হবে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া: উন্নয়ন-অর্থায়ন প্রযুক্তির অংশীদারত্ব
জাপান বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে কম বিতর্কিত এবং উচ্চ সম্ভাবনাময় কৌশলগত অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে জাপান অবকাঠামো, উন্নয়ন-অর্থায়ন, পরিবহন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। ২০২৫ সালে জাপান বাংলাদেশকে বাজেট–সহায়তা, রেল আধুনিকায়ন, শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল।
তবে সম্পর্ককে শুধু সেতু, বন্দর বা ঋণের মধ্যে আটকে রাখলে হয় না। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের পরবর্তী অংশীদারত্ব হওয়া উচিত শিল্পপ্রযুক্তি, মানসম্মত উৎপাদন, প্রকৌশলশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পরিচর্যাকারী দক্ষ কর্মী তৈরিতে। জাপানের শ্রমসংকট বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, কিন্তু অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো মডেলে নয়। ভাষা, পেশাগত সনদ, আচরণগত প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগের আগে দক্ষতা যাচাইয়ের যৌথ ব্যবস্থা গড়তে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োজন। কোরিয়া বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ করে, কিন্তু সম্পর্কের সম্ভাবনা শ্রমবাজারের চেয়ে অনেক বড়। ইলেকট্রনিকস, জাহাজ নির্মাণ, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, ব্যাটারি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। বড় কোরীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বাংলাদেশের বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য নয়, বাংলাদেশে উৎপাদন, গবেষণা ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ার জন্য আকৃষ্ট করতে হবে।