তাহলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হচ্ছে?
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী ওই নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন সংসদ সদস্যরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে যেহেতু জনগণ সরাসরি জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের মতো গোপন ব্যালটে ভোট দেয় না, বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যরাই ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করেন, তাই এটিকে বলা হয় ‘পরোক্ষ নির্বাচন’। উপরন্তু রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে ভোটারদের (সংসদ সদস্য) ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর করতে হয়। তার মানে কে কাকে ভোট দিয়েছেন সেটিও জানা সম্ভব। ফলে এটিকে ‘প্রকাশ্য ভোট’ও বলা হয়।
সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ অনুযায়ী, একাধিক প্রার্থী থাকলে সাড়ে তিনশো (৫০টি সংরক্ষিতসহ) সংসদ-সদস্য প্রকাশ্যে ভোট দেবেন। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। কাউন্টার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের নাম ও বিভক্তি সংখ্যা মুদ্রিত থাকবে এবং ভোটারের স্বাক্ষরের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের আউটার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের বিভক্তি সংখ্যা এবং রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থীদের নাম আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ক্রমানুসারে সরলরেখার মধ্যে পৃথকভাবে মুদ্রিত থাকবে এবং প্রত্যেক নামের বিপরীতে ভোটার কর্তৃক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকবে। প্রত্যেক ভোটার তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে নিজ নাম স্বাক্ষর করে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করবেন। এরপর সেটি আউটার ফয়েলে তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তার নামের বিপরীতে নির্দিষ্ট স্থানে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন এবং সেটি সংরক্ষিত ব্যালট বাক্সের ভেতরে রাখবেন।
যদিও ১৯৯১ সালের পরে আর কখনোই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের ভোট দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। কারণ প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল থেকে একজনকে মনোনীত করা হয়েছে এবং স্বতন্ত্র বা বিরোধী দল থেকে কোনো প্রার্থী না থাকায় তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। অর্থাৎ কখনোই একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটের আয়োজন করার প্রয়োজন পড়েনি। তার মানে ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিরা সাংবিধানিকভাবে সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হলেও কার্যত তারা প্রত্যেকেই ছিলেন দল কর্তৃক মনোনীত। অর্থাৎ সিলেকশন। কিন্তু এবার সম্ভবত ১৯৯১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। কেননা জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট থেকেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে একজনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যদি তার পক্ষে মনোনয়ন জমা দেয়া হয় এবং যাচাই-বাছাইয়ে টিকে যান; আর তিনি যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, অর্থাৎ যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন তাহলে নির্বাচন কমিশনকে সংসদ ভবনে ভোটের আয়োজন করতে হবে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করেছে, সেখানে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ১৩ আগস্ট, যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট, প্রত্যাহার ১৮ আগস্ট এবং একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ আগস্ট। কিন্তু এই মুহূর্তে সংসদের অধিবেশন চলছে না। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন ডাকতে হয়। সবশেষ বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে গত ১৫ জুলাই। সে হিসেবে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন ডাকতে হবে। বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পরে শোনা যাচ্ছিল যে, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু এবার যদি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণ করতে হয়, তাহলে ২০ আগস্ট বা তার আগেই সংসদের অধিবেশন ডাকতে হবে অথবা নির্বাচনের তফসিল পরিবর্তন করে ভোটগ্রহণের তারিখ পিছিয়ে দিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে সরাসরি নির্বাচিত ৩০০ জন এবং সংরক্ষিত আসনের ৫০ জনসহ মোট সাড়ে তিনশো এমপি ভোট দিতে পারেন। তবে এবার চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরীকে নিয়ে আইনি জটিলতা থাকায় তিনি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। ফলে এবার ভোটার সংখ্যা ৩৪৯। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম যেহেতু ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, ফলে তিনিও হয়তো ভোটদানে বিরত থাকবেন।
ধরা যাক সব ভোটার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে এলেন না। অংশগ্রহণকারী ভোটারদের মধ্যে দুজন প্রার্থীই সমান সংখ্যক ভোট পেলেন, তখন কী হবে? রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন বলছে, প্রার্থীগণের মধ্যে যিনি প্রদত্ত ভোটের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পাবেন, নির্বাচন কমিশন তাকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করবেন। তবে প্রার্থীরা সমান সংখ্যক ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবেন এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
এবার কেন ভোটগ্রহণের প্রশ্ন আসছে? কারণ সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়া না হলেও এরইমধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট থেকে অলি আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ যাচাই-বাছাইয়ে তিনি যদি টিকে যান এবং বিএনপির মনোনীত প্রার্থীও টিকে যান, তাহলে দুজন প্রার্থীর মধ্যে ভোট হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন