ঢাকার পাঠ: রাজপথের শক্তি, সংসদের সমাধান
প্রায় ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশ এমন একধরনের শাসনের অধীনে ছিল, যা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলেছিল। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ায় সংসদ তার বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে প্রাণশক্তি হারিয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রতিনিধিত্ব যুক্তিনির্ভর আলোচনাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। ফলে যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রটিতে ভিন্নমত প্রকাশ ও সমন্বয় হওয়ার কথা, সেটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
একটি বিশ্বাসযোগ্য সংসদের অনুপস্থিতিতে নাগরিকদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকেনি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে ভিন্নমতের কোনো জায়গা না থাকায়, তা প্রকাশের জন্য অন্য পথ খুঁজতে হয়েছে। ফলে রাজপথ কোনো বিকল্প নয়, বরং এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়।
কিন্তু এই ক্ষেত্রটিও ছিল সীমাবদ্ধ। জনসমাবেশ প্রায়ই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহায়তার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগে বেশি জোর দিয়েছে। চাপ শুধু শারীরিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—গুম, নির্বিচার আটক এবং হেফাজতে নির্যাতন এক সর্বব্যাপী ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রথম দিকে মতপ্রকাশের আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত ডিজিটাল পরিসরও নজরদারির আওতায় আসে। অনলাইন যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলো আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্বনিয়ন্ত্রণের একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এর সামগ্রিক প্রভাব ছিল গভীর।
এটি একটি গভীরতর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। যখন সংসদ ও রাজপথ—উভয়ই মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যর্থ হয়, তখন গণতন্ত্র তার মৌলিক সত্তা হারায়। নাগরিকদের সামনে দেশের গতিপথে প্রভাব বিস্তারের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উপায় থাকে না। এর ফল হয় হয়তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা, অথবা বিপরীত প্রান্তে গিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন বিস্ফোরণ।
বাংলাদেশের প্রতিবাদগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্নমতের প্রয়োজনীয়তা যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও উন্মোচিত করেছে। এগুলো দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে দেখিয়েছে যে এ ধরনের আন্দোলনকে সহজে কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দেওয়া যায় না। এ কারণেই ভিন্নমতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।